ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই। রবিবার তার প্রতিষ্ঠিত বার্দো ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি। অভিনয়জীবনে বার্দো ৫০টিরও বেশি ছবিতে কাজ করেছেন। এরপর তিনি নিজেকে প্রাণী অধিকার আন্দোলনে উৎসর্গ করেন। জীবনের পরবর্তী দশকগুলোতে তিনি চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী সম্প্রদায়, মুসলিম ও অভিবাসীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার কারণে বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে পাঁচবার দোষী সাব্যস্ত হন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ফ্রান্স ২৪।

এতে আরও বলা হয়, যৌবনে বার্দো ছিলেন নিরঙ্কুশ এক যৌন-প্রতীক। তার মোহময়ী শারীরিক আবেদন ও মুক্ত জীবনযাপন তৎকালীন ১৯৫০-এর দশকে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু খুব শিগগিরই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির সেই অবিরাম অনুসরণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং সবকিছু ছেড়ে দেন পশুদের জন্য কাজ করতে। শুরুর দিনে যখন তার বাঁকানো দেহরেখা, কাজল নয়ন আর অভিমানী ঠোঁট ফরাসি চলচ্চিত্রের পোস্টারজুড়ে ছড়িয়ে ছিল, তখন ‘বিবি’ নামে পরিচিত এই অভিনেত্রীকে প্রায়ই তুলনা করা হতো মেরিলিন মনরোর সঙ্গে। কিন্তু ১৯৭৩ সালে, হঠাৎ একদিন তিনি খ্যাতির সেই নীল জগতকে বিদায় জানান। অবহেলিত প্রাণীদের দেখভাল করার জন্য সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, তিনি ‘প্রতিদিন সুন্দর হতে হতে অসুস্থ’ হয়ে পড়েছিলেন। তার অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত অভিনয়জীবনে বার্দো একের পর এক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করলেও সমালোচকদের কাছ থেকে খুব বেশি প্রশংসা পাননি। তার পঞ্চাশটির বেশি চলচ্চিত্রের বেশির ভাগই ছিল মজাদার। তবে তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি, কেবল কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। ১৯৫৬ সালে ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’ ছবিতে তিনি ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। সেই তরুণীর প্রেম জড়িয়ে পড়ে এক ত্রিভুজ প্রেমে। ছবিটি পরিচালনা করেন তার তৎকালীন স্বামী রজার ভাদিম। ভাদিমের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, এই তরুণ নৃত্যশিল্পী হয়ে উঠবেন ‘সমস্ত বিবাহিত পুরুষের নাগালের বাইরে থাকা কল্পনার নারী’ এবং তার সেই কথাই সত্যি হয়। ছবিটির এক বিখ্যাত দৃশ্যে, কোমর পর্যন্ত চেরা স্কার্ট পরে মাম্বো নাচতে থাকা বার্দোর মুক্ত যৌনশক্তির প্রকাশ তাকে দেবীর মর্যাদা দেয়। যদিও তা একই সঙ্গে তা চলচ্চিত্র সেন্সরদের বিরক্তির কারণ হয়। সাত বছর পর জ্যঁ-লুক গদারের ‘কনটেম্পট’-এ এক হতাশ, নির্জীব স্ত্রী চরিত্রে তার অভিনয়ও পরিণত হয় চলচ্চিত্রকিংবদন্তির অংশে। প্রযোজক ও দর্শকদের নগ্নদৃশ্যের প্রত্যাশার সঙ্গে গদার এমনভাবে দৃশ্য নির্মাণ করেন যেখানে বিছানায় শুয়ে থাকা বার্দোর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কোলাজ তৈরি করা হয়। আর তিনি স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন, তার শরীরের কোন অংশটি তার সবচেয়ে প্রিয়।

১৯৫৮ সালে ফরাসি লেখিকা মার্গারিত দ্যুরাস লিখেছিলেন- ‘রানী বার্দো দাঁড়ায় সেখানেই, যেখানে নীতিনৈতিকতার শেষ সীমানা।’ এক বছর পর দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার মন্তব্য করেন, তিনি নিজের ইচ্ছামতো চলেন। আর এটাই মানুষকে বিচলিত করে।
কিন্তু ‘স্বাধীনচেতা নারী’ রূপে নিজের এই জন-ইমেজে আনন্দ খুঁজে পাননি বার্দো; বরং তিনি সংগ্রাম করেছেন বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টির বিরুদ্ধে। ১৯৬০ সালে ২৬তম জন্মদিনে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আর ১৯৭৩ সালে চল্লিশে পা দেয়ার আগে তিনি পুরোপুরি সরে দাঁড়ান আলো-ঝলমলে জীবন থেকে। ১৯৭৮ সালে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম আমার ক্যারিয়ার সম্পূর্ণভাবে আমার শরীরের ওপর দাঁড়িয়ে। তাই আমি সিনেমা ছেড়ে দিলাম। যেমন আমি সবসময় পুরুষদের ছেড়ে যাই, আগে।’

১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে জন্ম নেয়া বার্দো বেড়ে উঠেছিলেন সচ্ছল, ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিক পরিবারে। চারবার বিয়ে করা বার্দোর একমাত্র সন্তান নিকোলা। তার পিতা বার্দোর দ্বিতীয় স্বামী অভিনেতা জ্যাক শারিয়ের। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি সেন্ট-ট্রোপেজে প্রায় নির্জন জীবন বেছে নেন এবং এরপর থেকে প্রাণীঅধিকারই হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রধান পরিচয়। ১৯৮০-এর দশকে কানাডায় বার্ষিক সীলশাবক হত্যাযজ্ঞ দেখার অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। ২০১১ সালে ডব্লিউডব্লিউএফ’কে দেয়া এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘ওই দৃশ্যগুলো আমি কখনো ভুলতে পারি না। যন্ত্রণাভরা সেই আর্তচিৎকার এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু সেগুলোই আমাকে শক্তি দিয়েছে নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করার, প্রাণীর জীবনের পক্ষে।’

প্রাণী সুরক্ষার লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন। তিনি শিশু সীল, হাতি, পশুবলি প্রথা ও ঘোড়া জবাইখানা বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করেন। পরবর্তী জীবনে বার্দো ক্রমশ চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী, মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্যের কারণে তাকে পাঁচবার আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে। ২০০৩ সালের বই ‘এ ক্রাই ইন দ্য সাইলেন্স’-এ তিনি সতর্ক করেন ফ্রান্সের গোপন, বিপজ্জনক, নিয়ন্ত্রণহীন অনুপ্রবেশ সম্পর্কে। ২০১২ ও ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন দেন অতি ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেনকে । তিনি তাকে বলেন ‘২১শ শতকের জোয়ান অব আর্ক’।

ফ্যাশন ও চলচ্চিত্র জগত থেকে সরে যাওয়ার বহু বছর পরও বার্দো সেই জগতগুলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। পশমের পোশাক পরার বিরুদ্ধে ছিলেন সরব এবং গর্বের সঙ্গে এড়িয়ে গিয়েছেন প্লাস্টিক সার্জারি। ২০১৭ সালে হার্ভে  ওয়েনস্টিন কেলেঙ্কারির পর যখন মি-টু আন্দোলন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তখনও তিনি উল্টো স্রোতে হাঁটেন। ২০১৮ সালে প্যারিস ম্যাচ’কে তিনি বলেন, বেশিরভাগই ভণ্ডামি ও হাস্যকর আচরণ করছে। তার মতে, অনেক অভিনেত্রী প্রযোজকদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। আর পরে আলোচনায় আসার জন্য বলে বসে তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা যখন আমাকে সুন্দর বলত, বা বলত আমার নাকি সুন্দর পশ্চাৎদেশ- আমি সেটাকে আকর্ষণীয়ই মনে করতাম।’

mzamin

No comments

Powered by Blogger.