হাতির জন্য কান্না by পল্লব মোহাইমেন

নিথর বঙ্গ বাহাদুর। ছবি: শফিকুল ইসলাম
ভারতের আসাম থেকে ভেসে আসা বন্য হাতিটির মৃত্যু সত্যিই কাঁদিয়েছে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার মানুষকে।
‘হাতিটি যখন একেবারেই নিথর হয়ে গেল, তখন চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলাম।’ ১৮ আগস্ট ২০১৬ মুঠোফোনে যখন এ কথা বলছিলেন তখনো বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ ছিল সরিষাবাড়ীর দর্পণ থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আশরাফুল ইসলামের।

মো. মুকুল হোসেনের আবেগও থামে না। কামরাবাদ ইউনিয়নের সাবেক এই সদস্য বললেন, ‘মনে হলো আমার কোনো আত্মীয় মারা গেছে।’

ভারতের আসাম থেকে ভেসে আসা বন্য হাতিটির মৃত্যু সত্যিই কাঁদিয়েছে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার মানুষকে। মুকুল ও আশরাফের কথা তো আলাদাই। ১১ আগস্ট প্রথম দফা যখন হাতিটিকে অজ্ঞান করা হয়, তখন সেটি কয়রা গ্রামের ডোবায় নেমে গিয়েছিল। প্রায় অচেতন হাতিটি তলিয়ে যাচ্ছিল। ভেটেনারি চিকিৎসক তপন কুমার দে হ্যান্ডমাইকে আহ্বান জানান এলাকার মানুষজনকে। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে যান মুকুল ও আশরাফুল।

সেদিনের কথা বলতে থাকেন মুকুল হোসেন, ‘হাতিটা যখন পড়ে গেল পানিতে, তখন প্রথমে নৌকা নিয়ে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। তারপর কলার ভেলা। কিন্তু কচুরিপানার কারণে কাছাকাছি যেতে পারি না। এরপর পানিতে নেমে পড়ি।’

প্রায় একই সময় পানিতে ঝাঁপ দেন আশরাফুল ইসলামও। ‘হাতিটি তখন অচেতন হলেও শুঁড় নাড়াতে পারছিল। একটা বাঁশের লাঠির (স্থানীয়ভাবে কোটা নামে পরিচিত) আগায় বড়শির মতো লোহা লাগিয়ে আমরা হাতির কান টানতে থাকি। শুঁড় যেহেতু নাড়াছিল, তাই ভয়ও করছিল। তারপরও আমি ডুব দিয়ে হাতির পায়ের নিচ দিয়ে দড়ি ঢুকিয়ে বুক আটকে ফেলি।’ দড়ি হাতির পিঠের ওপর দিয়ে বাইরে পাঠানো হলে শতাধিক মানুষ হাতিকে ডাঙায় তুলে দড়ি টানা শুরু করে। একপর্যায়ে হাতিটিকে ডাঙায় তোলা হয়। এরপর আমগাছের সঙ্গে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা তখন হাতিটির নাম দেন ‘বঙ্গ বাহাদুর’।

পানিতে ডুব দিয়ে প্রায় অচেতন হাতিটির পায়ে রশি পরানোর কাজটা কিন্তু বেশ ঝুঁকিপূর্ণই ছিল। তারপরও কেন সেই ঝুঁকি নিলেন? আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘হাতিটির ওপর মায়া পড়ে গিয়েছিল। সরিষাবাড়ীতে ঢোকার পর থেকেই এই হাতির পেছনে রয়েছি। যখন দেখলাম হাতিটি তলিয়ে যাচ্ছে তখন আমি আর আমার মধ্যে ছিলাম না। আমি আর মুকুল মেম্বার সাঁতার দিলাম। ভয় ছিল শুঁড় দিয়ে যদি পানির নিচে জড়িয়ে ধরে! তারপরও আমাদের মনে হয়েছে যে করেই হোক হাতিটাকে বাঁচাতে হবে।’

শেষ পর্যন্ত অবশ্য মুকুল-আশরাফুলসহ শত শত গ্রামবাসী এবং বন বিভাগের উদ্ধারকর্মীরা মিলেও বাঁচাতে পারেনি বঙ্গ বাহাদুরকে। ১৬ আগস্ট ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে মারা যায় হাতিটি। প্রথম আলোর সরিষাবাড়ী প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম জানান, সেদিন সত্যিই শোকের গ্রামে পরিণত হয়েছিল কয়রা এলাকাটা। বরকত হাজী নামে এক ব্যক্তির জমিতে পড়েছিল, সেখানেই সমাহিত করা হয়েছে হাতিটিকে।

কিছুটা আক্ষেপের সুরে মুকুল হোসেন বললেন, ‘আমাদের কথা তো কেউ শোনে না। হাতির দুই পা একসঙ্গে চেপে বাঁধতে না করেছিলাম। আর ডিপ টিউবওয়েল থেকে পানি ছিটাতে চেয়েছিলাম হাতির ওপর।’ আশরাফুল বলেন, ‘বন বিভাগের কর্মকর্তাদের চেষ্টা ছিল, আন্তরিকতাও ছিল কিন্তু তাঁদের দক্ষতার অভাবটাই ছিল বেশি।’

২৮ জুন এই বুনো হাতিটি ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে ভেসে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। এরপর ২৭ জুলাই হাতিটি সরিষাবাড়ী উপজেলায় আসে। ৮ আগস্ট ঢাকায় ভারতীয় প্রতিনিধিদল ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা হাতিটিকে চেতনানাশক প্রয়োগ করে উদ্ধারের উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেন। ৯ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছিল উদ্ধার অভিযান। প্রায় ২০ দিন বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করায়, স্থানীয় মানুষদের মনে দাগ কেটেছিল বঙ্গ বাহাদুর। জীবন বাজি ধরে হাতি উদ্ধারেও নেমেছিলেন মুকুল-আশরাফুলের মতো মানুষেরা। আর তাই আজ হাতির জন্য কান্না এলাকাজুড়েই।
>>>২০ আগস্ট ২০১৬