ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-হঠাৎ আলোর ঝলকানিই তবে নিয়তি? by শেখ রোকন

এ আর নতুন কি যে মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ অবদানের জন্য শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতা পদক পাওয়ায় ক্যাম্পাসে আনন্দ র‌্যালি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন প্রাপ্তিতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা হবে; আর তাতে উপাচার্যের নেতৃত্বে উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার, সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য, বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেবেন, সেটাও স্বাভাবিক।


কিন্তু র‌্যালিপরবর্তী সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ঢাবি উপাচার্য, আমার প্রিয় শিক্ষক, ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক যা বললেন, সেটা ভাববার বিষয়। তিনি বলেন, 'শুধু সূচকের ভিত্তিতে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিমাপ করা যাবে না। গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দিক বিবেচনা করলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং সবার শীর্ষে থাকবে' (সমকাল, ১ এপ্রিল ২০১১)।
হ্যাঁ, তার সঙ্গে দ্বিমতের অবকাশ নেই যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অবদানের জন্য গর্ব করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাজে। আমার মতে, স্বাধীনতা পদক এই বিদ্যাপীঠের জন্য বলতে গেলে বিলম্বিত প্রাপ্তিই। স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার স্বাধীনতা পদক পাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। চার দশক বিলম্বই বরং বুকে বাজে। তারপরও এই পদক দেশের প্রাচীন ও প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিঃসন্দেহে আনন্দিত করেছে। বিষয়টি উদযাপনে মার্চের শেষ দিন র‌্যালি হয়েছে বটে; কিন্তু পদকপ্রাপ্তির আনন্দ ফেসবুকে টের পাওয়া গিয়েছিল ২৪ তারিখেই। ফেসবুকে তৎপর লোকজন জানেন, খবরটা প্রকাশ হওয়ার পর সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর অনেকেই এ সংক্রান্ত 'স্ট্যাটাস' দিয়েছেন। তাতে 'কমেন্ট' ঢলও নেমেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ক্ষোভ আছে, আফসোস আছে; কিন্তু ভালোবাসাও যে কম নয়, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তির পর তা আরেকবার স্পষ্ট হয়েছে।
বস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে গেলেও অনেকেরই ঘরে ফেরার অনুভূতি জাগে। আমার মতো আরও যারা একদা প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত এই বিদ্যাপীঠে জীবনের সোনালি সময় কাটিয়েছেন; এই বিদ্যাপীঠ নিজস্ব নিয়মে যাদের গড়ে তুলেছে; তাদের পক্ষে ছয়শ' একরের সবুজ ও প্রাণবন্ত ক্যাম্পাসটির প্রভাব কাটানো কঠিন। নানা সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের অনেকের আলমা মাতের। মার্চের গোড়ার দিকে ক্যাম্পাস থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে, শিশুপার্কের সামনের ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ানো বাসে বসে বোনা এমন ভাবনা ছিঁড়ে গিয়েছিল কাচ ভাঙার স্বতন্ত্র শব্দে। পড়িমরি করে নামতে দেখা গেল একদল মারমুখী শিক্ষার্থী লাঠিসোটা হাতে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে নির্বিচার ভাংচুর চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় সমানসংখ্যক সুসজ্জিত পুলিশ পাশে অবস্থিত শাহবাগ কন্ট্রোলরুম থেকে বেরিয়ে দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই যথারীতি বাসে আগুন_ দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। পুলিশও নড়েচড়ে ওঠে। তার পরের দৃশ্যও চিরাচরিত। শাহবাগ ও নীলক্ষেত মোড়ে পুলিশ-শিক্ষার্থী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ঢিল-পাল্টা ঢিল।
এমন দৃশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের কাছে অপরিচিত নয়। হতবিহ্বল যাত্রীদের সবাই পরে নিশ্চয়ই জেনেছে, মার্চের ওই ক্ষোভ ছিল আগের দিন মতিঝিল এলাকায় বাস শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে এক শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। যারা মেধাবী ছাত্রটির মূল্যবান প্রাণ কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার বদলে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় নির্বিচারে গাড়ি ভাংচুর কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্ন তো সর্বজনীন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এটাই স্বাতন্ত্র্য। এটাই বোধহয় স্টাইল। এ বিশ্ববিদ্যালয় জানে, কীভাবে জ্বলে উঠতে হয়। সন্দেহ নেই, গাড়ি ভাংচুর কিংবা জ্বালাও-পোড়াও কোনোভাবে সমর্থন করা যায় না; কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস তো আগুন ঝরানোর ইতিহাস। ভাষা, স্বাধিকার কিংবা স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা যদি নাও বলি, স্বাধীন বাংলাদেশে বারবার এই বিশ্ববিদ্যালয়ই কি বিস্ফোরিত হয়নি?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি সমালোচনা রয়েছে। দেশের সেরা শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশ কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এখানে ভর্তি হয় বটে, পরবর্তী সময়ে একাডেমিক পড়াশোনায় খুব ভালো করতে পারে না। এর কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টির ভৌত অবস্থান। রাজধানী এবং রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে থাকে বলে, শিক্ষার্থীদের বড় অংশ যতটা না প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, তার চেয়ে অনেক বেশি এক্সট্রা-কারিকুলাম তৎপরতায় জড়িয়ে যায়। ফলে সদ্য পা রাখা তরুণটি শিল্পী-সাহিত্যিক হয় বটে, শিক্ষার্থী হয় না। প্রশাসনিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার ফলে বৈষয়িক প্রতিষ্ঠা পড়াশোনার উচ্চতাকে ছাপিয়ে যায়। তবে যে ব্যাপারে তারা বরাবরই অতুলনীয়, তা বোধহয় রাজনৈতিক বোধ ও বিবেচনা। দেশে যতবারই রাজনৈতিক প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, আমরা দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই সবার আগে এগিয়ে এসেছে। রাজাকার, স্বৈরাচারদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো বরাবরের নিষিদ্ধ এলাকা।
আমাদের মনে আছে, দেশের প্রথম সামরিক শাসককে প্রথম ধাক্কা খেতে হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই। দ্বিতীয়জনও নানা কায়দা করেছেন, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেননি। স্বাধীনতাবিরোধী ও স্বৈরাচারের দোসর কয়েকজনের লাঞ্ছনার সাক্ষীও হয়ে আছে সবুজে ঢাকা গনগনে ক্যাম্পাস। রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর অবদান সত্ত্বেও আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রযোজিত, তা অস্বীকার করা যাবে? সর্বশেষ, ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী আধা-সামরিক সরকারের দোর্দণ্ড প্রতাপে যখন সবাই থরহরি কম্পমান, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত রাজনৈতিক মুখগুলোও অনুপস্থিত, তখন এই ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরাই কি মসনদ কাঁপিয়ে দেয়নি? এও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ক্যাম্পাসের এমনকি ঢাকার বাইরেও জাতীয় কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের স্বার্থসংক্রান্ত যেসব আন্দোলন-সংগ্রাম হয়, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবশ্যম্ভাবী। সন্দেহ নেই, চার দশক পার করেও, সংগ্রামে ও সংকটে এ দেশের মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহ্য কিংবা রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় হঠাৎ আলোর ঝলকানিই কি শেষ কথা? প্রশ্নটি শ্রদ্ধেয় উপাচার্যের কাছেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশ ও সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে সবার আগে সাড়া দেয়, সেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এখানকার শিক্ষার্থীরা একটু বেশি রাজনীতিসচেতন, সেটাও সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু তাদের মূল ব্রত প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাই হওয়া উচিত। আমরা জানি, সুকুমার বৃত্তি অনেক সময় আন্দোলন সংগ্রামের অন্তরায় হয়; কিন্তু একজন যথার্থ শিক্ষার্থীর মধ্যে সেই গুণেরই বিকাশ জরুরি। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে; কিন্তু এখানকার শিক্ষার্থীরা শিক্ষা, সুকুমার বৃত্তি, নৈতিকতার মানদণ্ডে ক্রমেই নিচের দিকে নামছে। এখানে এখনও বিস্তর আড্ডা হয়; কিন্তু গবেষণা নেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-ভবনের সংখ্যা বছর বছর বাড়ছে, পড়ে যাচ্ছে মান। এরই প্রতিফলন আমরা বিভিন্ন র‌্যাংকিংয়ে দেখি। সন্দেহ নেই, আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান আরও অনেকদিন কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই অক্ষুণ্ন থাকবে। এখন আসলে নজর দিতে হবে সেই সূচকগুলোর দিকেই, যার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং হয় এবং বিষয়টি সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকেই বুঝতে হবে।

শেখ রোকন : সাংবাদিক ও গবেষক
skrokon@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.