অচলাবস্থা- বুয়েটে চলমান আন্দোলনের যৌক্তিকতা by এম এম শহিদুল হাসান

বুয়েট শিক্ষক সমিতি যখন প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে, তখন আন্দোলন থেকে আমি দূরে ছিলাম। হয়তো সমিতির কেউ ভিসি হতে চান বা কেউ প্রশাসন কর্তৃক ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তাঁরা সমিতিকে ব্যবহার করে ভিসিকে সরাতে চান।


পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আমার কথা হয়। শিক্ষকেরা বিশ্বাস করেন, বর্তমান বুয়েটের প্রশাসন ঐতিহ্য নষ্ট করতে উদ্যোগী হয়েছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটা বড় অংশও প্রশাসনের ওপর খ্যাপা। দলীয়করণ এখানে কাজ করেছে; বিশেষ দলের সমর্থকেরা প্রশাসন থেকে সুবিধা পাচ্ছেন বলে তাঁদের অভিযোগ। হঠাৎ করেই বিভিন্ন বিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে প্রশাসনিক ভবনে স্থানান্তর করে প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁদের প্রশাসনিক কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। কাজেই দীর্ঘদিন প্রশাসনিক দায়িত্বে কর্মরত কর্মকর্তারা এতে সংক্ষুব্ধ হন। ছাত্রদের অভিযোগ, প্রশাসন সাধারণ ছাত্রদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করে। শুরুতে শিক্ষক সমিতি এককভাবে আন্দোলন করে আসছিল। হঠাৎ করেই কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী আন্দোলনের নামে মিটিং-মিছিল করতে থাকেন; শিক্ষকদের নিয়ে নানা ধরনের কটূক্তি করতে থাকেন। দু-একজন শিক্ষকের অফিস রুমে তাঁরা তালা পর্যন্ত লাগিয়ে দেন। আমি ১৯৬৮ সালে বুয়েটে প্রথম বর্ষে ভর্তি হই এবং আমার শিক্ষকতার চাকরি আছে মাত্র তিন বছর। আমি জানি ছাত্র, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শিক্ষকদের অত্যন্ত সম্মান করে থাকেন। আমরা একটা পরিবারের মতো দীর্ঘদিন বসবাস করে আসছি। শিক্ষক সমিতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের সমস্যার সমাধান করে থাকে। আমি কল্পনা করতে পারি না যে বুয়েটের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শিক্ষকদের সম্পর্কে নোংরা কটূক্তি করতে পারেন। প্রশাসন তাঁদের এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখার উদ্যোগ নেয়নি। শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রশাসনের ইঙ্গিতে তাঁরা এ ধরনের ন্যক্কারজনক কাজ করতে সাহসী হয়েছেন।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রশাসন বুয়েটের ঐতিহ্য নষ্ট করতে চাইছে কেন? রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকেই এটা তারা করছে। এত দিন প্রতিটি সিলেকশন কমিটিতে সভাপতি হতেন একজন শিক্ষক। ভিসি ও প্রোভিসি বেশ কয়েকটি সিলেকশন কমিটিতে শিক্ষক রাখলেন না। দীর্ঘদিনের এ নিয়মটি পরিবর্তনের প্রয়োজন কেন হলো? শিক্ষকদের সন্দেহ, নিয়োগ-বাণিজ্য ও দলীয়করণ করার উদ্দেশ্যেই এসব করা হয়েছে। দারোয়ান নিয়োগ নিয়ে নিয়োগ-বাণিজ্য হয়েছে বলে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করেন এবং শিক্ষক সমিতি এ ব্যাপারে তদন্তের দাবি জানায়।
বুয়েটের শিক্ষকেরা সমাজ ও রাজনীতিসচেতন নন, এটা ভাবা ঠিক নয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে হত্যাযজ্ঞের ভিডিও করেছিলেন বুয়েটের একজন শিক্ষক। ২৫ মার্চের আগে বুয়েটের এক ছাত্রাবাসে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন বুয়েটের এক অসীম সাহসী ছাত্র খিজির খান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষকদের সংখ্যা অনেক। তবে আমরা রাজনীতির ব্যানারে নিজেদের পরিচয় দিতে চাই না। আমরা বুয়েটকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে চাই। আমাদের শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে কোনো দলের পরিচয়ে কেউ দাঁড়ান না। আমরা দেশ নিয়ে আলাপ করি, আমরা কোনো দলের সমর্থক, এমন পরিচয় দিই না। আমরা মনে করি, আমাদের পরিচয়ে দল প্রাধান্য পেলে আমরা বুয়েটের ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে পারব না। আমরা আন্তরিকভাবে এটা বিশ্বাস করি। বেশ কয়েক বছর আগের একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। সে সময়ের ভিসির ছেলে বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় ভালো না করায় বুয়েটে ভর্তি হতে পারেনি। তিনি ছেলেকে ভর্তি করানোর জন্য ভর্তি কমিটিকে প্রভাবিত করেননি। সে সময় আমি তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল অনুষদের ডিন ছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ছেলে বুয়েটে পড়তে না পারায় তিনি কষ্ট পেয়েছেন। তবে এটা শাপে বর হয়েছে। তাঁর নিজের ছেলে ভর্তি হতে পারেনি এই অজুহাত দেখিয়ে তিনি কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য সন্তানদের ভর্তি করানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছিলেন। আমাদের অনেক শিক্ষকের সন্তান ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করতে পারেনি বলে বুয়েটে ভর্তি হতে পারেনি। বুয়েটে ভর্তির ক্ষেত্রে পোষ্য কোটার প্রস্তাব শিক্ষকেরা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। শিক্ষকদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে ভবিষ্যতে ভর্তি পরীক্ষা ও শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
উচ্চ আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েট শিক্ষক সমিতি এখন আর কোনো আন্দোলন পরিচালনা করছে না। তবে শিক্ষকেরা তাঁদের বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে তাঁদের করণীয় ঠিক করছেন। সম্প্রতি ‘বুয়েট পরিবার’ নামে প্রচারিত একটি লিফলেট আমাদের হাতে এসেছে। লিফলেটে সরকার পতনের জন্য আন্দোলন করার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষক সমিতির ২৭ আগস্টের বৈঠতে বিষয়টি নিয়ে আলাপ হয়েছে। শিক্ষকেরা মনে করেন, আমাদের আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার জন্য এ ধরনের নোংরা আহ্বান জানানো হয়েছে। শুরু থেকেই একটি চক্র বুয়েটের শিক্ষকদের একটি জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর সমর্থক বলে অপপ্রচার চালিয়েছে এবং আমার মনে হয়, এখন ওই চক্রটি সরকারকে এটা বোঝাতে চেষ্টা করছে যে শিক্ষকেরা সরকারবিরোধী। আমি সরকারকে সবিনয় অনুরোধ করছি, লিফলেটটি যারা প্রচার করেছে, তাদের শনাক্ত করুন। শিক্ষকেরা মনে করেন, ওই চক্রটি সরকারের সমর্থক সেজে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট। এরাই সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।
সত্যিকারের দেশপ্রেমিকদের রাস্তাঘাটে দেশপ্রেমের কথা বলার প্রয়োজন হয় না, কাজের মধ্য দিয়েই তাঁরা সেটার স্বাক্ষর রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষকদের বারবার অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় কেন? বুয়েটের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ছাত্ররা তাঁদের প্রাণপ্রিয় বুয়েটকে কলুষিত করা থেকে রক্ষা করতে চাইছেন। এটা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, নয় কোনো স্বার্থ উদ্ধারের আন্দোলন। এই আন্দোলন বিদেশে অবস্থানরত বুয়েটের প্রাক্তন ছাত্রদের আবেগতাড়িত করেছে; তারাও বুয়েটের ঐতিহ্য রক্ষার্থে আমাদের ন্যায়সংগত ও আবেগজড়িত আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, জনগণ আমাদের এই ব্যতিক্রমধর্মী আন্দোলনের যৌক্তিকতা বুঝবেন এবং সমর্থন দেবেন। আমরা অহিংস আন্দোলন করছি। এই আন্দোলন শুধু বুয়েটকে রক্ষার জন্য, বুয়েটের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ চরিতার্থের জন্য এ আন্দোলন নয়। তাই এ দেশে এটি একটি অনন্য আন্দোলন। আন্দোলন যদি ব্যর্থ হয়, তবে বুয়েট সমাজে তার গৌরবময় অবস্থান হারাবে। সরকার নিশ্চয় এটা হতে দেবে না।
এম এম শহিদুল হাসান: অধ্যাপক, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.