সিলিকোসিস ঝুঁকিতে আরো বহু শ্রমিক by তৌফিক মারুফ

শুধু বুড়িমারী সীমান্তে নয়, মরণব্যাধি সিলিকোসিস রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথর কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোজাইক, সিরামিক, টাইলস, সাদা সিমেন্ট নিয়ে কাজ করা কারখানা শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক ও শিল-পাটা শ্রমিক, এমনকি সিলিকন ডাই-অক্সাইড উপাদাননির্ভর ওষুধ কারখানা ও প্রসাধন কারখানার শ্রমিকরা এই রোগের ঝুঁকির মধ্যে আছে।


এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. রুহুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বক্ষব্যাধির যে দল পর্যবেক্ষণে গিয়েছিল, ওই দলের সদস্যরা সরকারি প্রতিষ্ঠানেই দায়িত্ব পালন করছেন। তাই এ বিষয়ে নিশ্চয়ই আমার কাছে তাঁদের পর্যবেক্ষণের প্রতিবেদন দেবেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করণীয় ঠিক করা হবে। প্রয়োজনে এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।' ঢাকার বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ও বুড়িমারী এলাকায় পর্যবেক্ষণ দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য ডা. খন্দকার হাফিজুর রহমান নিয়ন কালের কণ্ঠকে বলেন, যে পাথরের কণা থেকে সিলিকোসিস হয়ে থাকে তা কেবল বুড়িমারীতেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। বরং দেশের যেখানেই এ উপাদান নিয়ে অনিরাপদভাবে বহুল ব্যবহার হবে সেখানকার শ্রমিকদের মধ্যেই এ রোগ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, আপাতত কেবল দেশের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এ রোগের প্রকোপ দেখা গেছে। অন্য কোথাও এখন পযর্ন্ত এ নিয়ে কাজ হয়নি। তবে এখন দেশের অন্যান্য এলাকায় এটা নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করা দরকার। তিনি জানান, বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের পরিচালক এখন দেশের বাইরে আছেন। তিনি দেশে ফিরলে পর্যবেক্ষণের প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
একই দলের আরেক সদস্য বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সিলিকোসিস নিয়ে গবেষণার কাজে যুক্ত ডা. ফজলে রাব্বী বলেন, সিলিকোসিস কোনো সংক্রমিত রোগ নয়। তাই সাধারণভাবে এ রোগ একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে সংক্রমণ ঘটায় না। তবে কর্মক্ষেত্র অনুসারে দেশে এ রোগের প্রকোপ সারা দেশেই থাকার আশঙ্কা রয়েছে। হতে পারে অনেক ক্ষেত্রেই এ রোগ ধরতে না পেরে চিকিৎসকরা কেবল যক্ষ্মা হিসেবে শনাক্ত করে যক্ষ্মার চিকিৎসা করে আসছেন। বিশেষ করে সিলকা ক্রিস্টাল ও সিলিকন ডাই-অক্সাইড থেকেই সিলিকোসিস হয়ে থাকে।
ডা. রাব্বী বলেন, সিলিকোসিসের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী কোয়ার্টজ পাথরের কণা। এতে শতকরা ৭০ ভাগ সিলিকা থাকে। এর পরই রয়েছে চুনা পাথরের অবস্থান। আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সূত্র অনুসারে প্রতি ঘনমিটারে দশমিক ২ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সিলিকা মানবদেহের জন্য সহনীয়। তবে চুনাপাথরে এর মাত্রা রয়েছে প্রতি ঘনমিটারে ১০ মিলিগ্রামের উপরে। আর বাংলাদেশে এই চুনাপাথর ব্যাপকহারে ব্যবহার হয়ে থাকে বিভিন্ন কাজে। এ ছাড়া ডলোমাইটসহ আরো কিছু পাথর এ জন্য দায়ী। বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন মোজাইক, সিরামিক, টাইলস, সাদা সিমেন্ট নিয়ে কাজ করা কারখানা শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক ও শিল-পাটা শ্রমিক, এমনকি সিলিকন ডাই-অক্সাইড উপাদাননির্ভর ওষুধ কারখানা ও প্রসাধন কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে এটা থাকতে পারে। কারণ এসব কারখানায় বা কর্মস্থলে উপযুক্ত নিরাপদ ব্যবস্থা সাধারণত থাকে না বলে নাক-মুখ দিয়ে পাথরের কণা উড়ে ফুসফুসে ঢুকে যায়। তাই এসব শিল্পের কর্মক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ জরুরি।
লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বুড়িমারীতে প্রথম দিকে যক্ষ্মা সন্দেহে অনেককে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ভালো হচ্ছে না দেখে তাদের আমরা ঢাকায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে পাঠাই। এর পরই শনাক্ত হয় ওই রোগীরা সিলিকোসিসে আক্রান্ত। তাই দেশের অন্যান্য এলাকায়ও এমনটা ঘটতে পারে। ফলে নির্মাণ-শ্রমিক বা পাথর গুঁড়া নাক-মুখ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে এমন কোনো কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলের শ্রমিকদের মধ্যে যারা যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছে তাদের জরুরি ভিত্তিতে সিলিকোসিস শনাক্ত করণের পরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
গবেষক ডা. ফজলে রাব্বী বলেন, সিলিকোসিসে আক্রান্ত রোগীদের যক্ষ্মা প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না, ফলে তাদের মধ্যে যক্ষ্মার প্রকোপ অনেক সহজ হয়ে পড়ে। এ জন্যই যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীদের অনেকের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করে সিলিকোসিস পাওয়া যায়।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের পরির্দশক (মেডিক্যাল) ডা. সৈয়দ এহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'পাথর ভাঙা বা পাথরের গুঁড়া নিয়ে যেসব কারখানা বা কর্মস্থলে কাজ হয়, সেগুলোকে এখন পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা দরকার। আমরা এ বিষয়ে এখন থেকে বিশেষ গুরুত্ব দেব, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মস্থল শ্রমিকদের কাজের জন্য নিরাপদ করে তোলে। এজন্য আইনও রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিশ্বে যক্ষ্মাপ্রবণ ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। ২০১১ সালে সারা দেশে মোট এক লাখ ৪৮ হাজার ১৯৬ জন যক্ষ্মারোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সরকারের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কমসূচির (এনটিপি) সঙ্গে মোট ৪৩টি প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজি-৬ অনুযায়ী যক্ষ্মার প্রকোপ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এ কার্যক্রমের আওতায় বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ২০১১ সালে যক্ষ্মারোগী কমেছে। ২০০৯ সালে কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মারোগীদের ৭৪ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭০ শতাংশ শনাক্ত হয়। ২০১১ সালে এ হার ৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা বলেন, যেখানে যক্ষ্মার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা হয়, সেখানে সিলিকোসিস পরীক্ষার কিছু যন্ত্রপাতি সংযোগ করা গেলে এবং স্থানীয় চিকিৎসকদের বিশেষ কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে স্থানীয়ভাবেই সিলিকোসিস শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে এ জন্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে উদ্যোগ নিতে হবে। টিবি অ্যান্ড ল্যাপ্রসি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশজুড়ে ৮৫০টি ডটস কর্নার ও এক হাজার ৫০টি ল্যাবে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে যক্ষ্মা শনাক্তকরণ সুবিধা রয়েছে। সেখান থেকে বিনা মূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের আওতায় আলাদা স্থায়ী টিবি ক্লিনিক রয়েছে বিভিন্ন এলাকায়।

No comments

Powered by Blogger.