ড. ইউনূসকেই প্রমাণ করতে হবে ... by মুহম্মদ শফিকুর রহমান

প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূস যেদিন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন সেদিন উল্লসিত হননি কিংবা তাঁকে প্রকাশ্যে বা মনে মনে অভিনন্দন জানাননি এমন মানুষ বাংলাদেশে কেউ ছিলেন না। কিন্তু বিধির কি অমোঘ বিধান নোবেল বিজয়ী বীর অসলো (সুইডেন) থেকে ফিরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখার পরপরই মানুষকে হতাশায় নিমজ্জিত করতে শুরু করেন।


দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের যে অহঙ্কার আজও তার মূলে রয়েছেন রাজনীতিকরা। রাজনীতিকরা যেমন জননন্দিত হয়েছেন তেমনি কখনো কখনো সমলোচিতও হয়েছেন। কিন্তু সবকিছুকে ছাড়িয়ে আমাদের সর্বশেষ ঠিকানা রাজনীতিকরাই। দু’একজন রাজনীতিক কখনো কখনো পথভ্রষ্ট হতে পারেন, কিন্তু আবার নিজেদের সংশোধনও করেন। যাঁরা অরাজনৈতিক ব্যক্তি এবং বিত্ত, বৈভব বা সামরিক মই বেয়ে রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন তাঁদের কথা আলাদা। তাঁরা একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন, উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেলে কেটে পড়েন। আমাদের নোবেল লরেট প্রফেসর ইউনূস এই দুই গ্রুপকেই এক করে ফেলেছেন। রাজনীতিক আর সামরিক মই বেয়ে কোন দলের মাথায় বসা স্বার্থান্বেষীদের এক কাতারে দাঁড় করিয়ে ফেললেন। রাজনীতিকরা ‘দুর্নীতিবাজ’ কাজেই তাদের বিকল্প দাঁড় করাতে হবে। আমাদের তথাকথিত সিভিল সোসাইটির মোটামুটি একটি বড় অংশকেই তিনি পেয়ে গেলেন। এই যেমন প্রফেসর রেহমান সোবহান, বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, ড. কামাল হোসেন, মতিউর রহমান, মাহফুজ আনাম, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রমুখ (উইকিপিডিয়া)।
অথচ প্রফেসর ইউনূসের রাজনীতিতে আসার খায়েশ কেন হলো বিষয়টি আজও রহস্যাবৃত। কেননা এই মানুষটি কেবল যে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তাই নয়। তিনি র‌্যামন ম্যাগসাসাই, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ থেকে শুরু করে ১১৩টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার, বিশ্বের ২০টি দেশ থেকে ৫০টি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রীতে ভূষিত হন। বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত প্রফেসর হিসেবে লেকচার দেন। এমনকি বাংলাদেশ সরকারও তাঁর প্রতি সম্মানসূচক ডাক টিকেট পর্যন্ত প্রকাশ করে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূস নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন এ জন্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ, সিপিবিসহ সকল প্রগতিশীল দল ও নেতৃত্ব তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মনে পড়ে বেশ আগে আওয়ামী লীগের একটি কাউন্সিল হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পাশে বিশাল প্যান্ডেল পেতে। প্যান্ডেলের বাইরেও নেতা-কর্মীদের ভিড় উপচে পড়ছিল। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সেই কাউন্সিল অধিবেশনে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি ছিলেন এই নোবেল লরেট প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূস এবং তিনি কাউন্সিলে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। প্রবন্ধটি ছিল তথ্যবহুল এবং দিকনির্দেশনামূলক (দুর্ভাগ্যবশত প্রবন্ধটি আমি হারিয়ে ফেলেছি)।
এরপরও প্রফেসর ইউনূসের মাথায় কেন যে রাজনীতির পোকা ঢুকল কিছুতেই মেলাতে পারছি না। যে মানুষটি বঙ্গসন্তান হয়ে বিশ্বের দেশে দেশে বিপুলভাবে সম্মানিত হলেন তাঁর কেন যে আমাদের মতো একটা ছোট্ট গরিব দেশে এসে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হবার বাসনা জাগল তা কিছুতেই মিলছে না।
বিশ্ব কাঁপানো তথ্য সংস্থা উইকিপিডিয়ার ভাষা : In early 2006 Yunus along with other members of the civil society including Professor Rehman sobhan, Justice Habibur Rahman, Dr. Kamal Hossain, Matiur Rahman, Mahfuz Anam and Debapriya Bhattcharia, participated in a campaign for honest and clean candidates in National Election. He considered entering politics in the later part of the year. On 11 February 2007, Yunus wrote an open letter, published in the Bangladeshi News Paper Daily Star, where he asked citizens for views on his plan to float a political Party to establish political goodwill, proper leadership and good governance. In the letter, he called on everyone to briefly outline how he should go about the task and how they can contribute to it.
‘’Yunus finally announced that he is willing to launch a political party tentatively called ‘CITIZENS POWER’ বা ‘নাগরিক শক্তি’ on 18 February 2007. There was speculation that the army supported a move by Yunus into politics.
‘’ on 3 may however, Yunus declared that he had decided to abandon his political plans following a meeting with the head of the government Fakhruddin Ahmed.”
উইকিপিডিয়ার এই বক্তব্যের সারমর্ম করলে দেখা যাবে প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূস উল্লিখিত ৫/৬ জন শীর্ষ সিভিল সোসাইটি সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে নিজের উদ্দেশ্য সাধন করতে চেয়েছিলেন। জাতীয় নির্বাচনে সৎ ও স্বচ্ছ প্রার্থী খোঁজার নামে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করবেন, সেই লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি নেন এবং এ ব্যাপারে ইংরেজী দৈনিক স্টার-এ একটি নিবন্ধও প্রকাশ করেন।
এক পর্যায়ে প্রফেসর ইউনূস তার দলের নামও ঘোষণা করেন - ঈওঞওতঊঘঝ চঅজঞণ বা নাগরিক শক্তি (২০০৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি)। তখন বাজারে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে যায় যে প্রফেসর ইউনূসের পেছনে মিলিটারী পাওয়ার রয়েছে।
তারপর আর তাঁর রাজনীতিতে অবতরণ বা দল গঠনের কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এক সময় শোনা গেছে ‘উেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম হবেন প্রস্তাবিত ‘নাগরিক শক্তি’ পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রফেসর ইউনূসের ভাই সাংবাদিক মুহম্মদ জাহাঙ্গীর প্রেস সেক্রেটারি। মুহম্মদ জাহাঙ্গীর তো প্রেস রিলিজ লেখা ও পত্রিকা অফিসে পাঠানোর জন্য রীতিমতো ২৪ ঘণ্টা কম্পিউটার নিয়ে চলাফেরা করতেন। তারপরও কেন হলো না রাজনীতি করা সেটাও এক রহস্য।
তবে সাম্প্রতিককালে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিলকে কেন্দ্র করে রহস্য উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। কথা উঠেছে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করার জন্য প্রফেসর ইউনূস বিদেশে লবিস্টের কাজ করেছেন। যেমন করে মীর কাশেম আলী যুদ্ধাপরাধ থেকে বাঁচার জন্য আড়াই কোটি ডলার দিয়ে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করেছে বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। অবশ্য প্রফেসর ইউনূসের এ জন্যে টাকা খরচ করার দরকার নেই। তাঁর বহু সমর্থক আছে এসব অপকর্ম করার জন্য এবং তারা নিজ দেশে যথেষ্ট ক্ষমতাবানও। এ কথা যদি সত্য না হয় তবে ড. ইউনূসকেই প্রমাণ করতে হবে তিনি পদ্মা সেতুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন না।
বিশেষ করে সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত দেশের ৫১ জন বিশিষ্ট নাগরিক তথা সিভিল সোসাইটির শীর্ষ সদস্য এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছেন :
“গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বর্তমান সরকার ও ড. ইউনূসের মধ্যে একটা মতপার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকারী চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী বয়সসীমা অতিক্রম করায় ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ায় তিনি মামলা করেন। ওই মামলায় দেশের উচ্চ আদালত সরকারের সিদ্ধান্তকে আইনানুগ বলে রায় প্রদান করে। এতে বিষয়টি একটি আইনী মীমাংসা সম্পন্ন হয়।”
“ অতি সম্প্রতি সরকার গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশের ৩য় সংশোধনী এনেছেন, তাতে ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে আইনী লড়াই-এ হেরে গিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে বৃহৎ শক্তি ও দাতাগোষ্ঠীকে দিয়ে বাংলাদেশের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছেন, যা স্বাধীন দেশের কোন নাগরিকের মেনে নেয়া সম্ভব নয়।”

“৫১ জন বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, শিল্পী হাশেম খান, কামাল লোহানী, শামসুজ্জামান খান, বিচারপতি মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত প্রমুখ।
এই সব আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ড. ইউনূস দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করছেন। কেননা পদ্মা সেতু আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ও জাতীয় মর্যাদা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপার। যেমন করে বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন যমুনা সেতুর। তা হয়েছে। আজ পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এই পদ্মা সেতুও হবে। কোন ষড়যন্ত্রই এটাকে ঠেকাতে পারবে না। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করেছে সে জন্য বিএনপি খুবই খুশি। খালেদা জিয়া বলেছেন ক্ষমতায় গেলে দুইটা পদ্মা সেতু করবেন। যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি একটি বাঁশের সাঁকো দিয়েছেন? কী উত্তর দেবেন? পদ্মা সেতু নির্মিত হলে কেবল দেশের দক্ষিণাঞ্চল নয় বাংলাদেশ ছাড়িয়েও অনেক দেশের সাথে সড়ক-সংযোগের সৃষ্টি হবে। তাহলে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক নয় কি যে মানুষ বিদেশে তার যোগাযোগ বা সুনামের সুযোগে দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করছেন, তার এই কাজ, এই তৎপরতাকে কি বলা যাবে? যদি ‘দেশদ্রোহিতা’ বলা হয় তবে বেশি বলা হবে কি?
ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে আমি তেমন কিছু বলতে চাই না। শুধু একটা প্রশ্ন করতে চাই, আপনার বয়স এখন ৭২ বছর এবং আপনি উচ্চ আদালতে গিয়েও এই বয়সে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি হতে পারছেন না। উচ্চ আদালত সরকারের পদক্ষেপকে বৈধতা দিয়েছেন। তাহলে এখন আর লোক না হাসিয়ে নিজেই ঘোষণা করে দিন না আপনি এমডি হবেন না! আরেকটি প্রশ্ন : আজ এত বছর আপনি গ্রামীণ ব্যাংক চালালেন, ঋণ দিলেন, সুদ নিলেন, কত দিলেন, বিনিময়ে কত আয় হলো তার একটা হিসেব দেবেন কি? প্রত্যেক ঋণ গ্রহীতাই নাকি গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক, তাহলে বছরে কয়টা বৈঠক করেছেন, জানাবেন কি?
সর্বশেষ যে কথাটি বলতে চাই, ড. ইউনূস তাঁর প্রস্তাবিত রাজনৈতিক দল নাগরিক শক্তি গঠনের পেছনে মিলিটারি বাহিনীর সহযোগিতার যে কথা উঠেছে তাহলে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী আমাদের অহঙ্কার প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস আর মিলিটারি জিয়া, এরশাদের সাথে তার পার্থক্য থাকে কি?

ঢাকা-৩০ আগস্ট ২০১২
লেখক : ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.