জাতীয় স্বার্থ ও পদ্মা সেতু by তারেক শামসুর রেহমান

একটি দেশ তার জাতীয় স্বার্থ সামনে রেখে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখেই বড় বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পদ্মা সেতু সে রকমই একটি প্রকল্প, যার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি জড়িত।


জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি মাথায় রেখেই আওয়ামী লীগ সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ হাতে নিয়েছিল। তাদের নির্বাচনী ওয়াদার অন্যতম ছিল এই পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি। কিন্তু পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি একটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে এখন। এডিবি ও জাইকা এখন ঋণচুক্তির মেয়াদ যথাক্রমে আরো এক মাস ও তিন সপ্তাহ বাড়িয়েছে। এর অর্থ এ সময়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংককে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে ফিরে আসতে হবে। বাংলাদেশকে এখন সেই সময়টুকু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপর বিশ্বব্যাংক যদি ফিরে না আসে, তাহলে বাংলাদেশ বিকল্প মালয়েশীয় প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারে। এখানেই এসে যায় মূল প্রশ্নটি- মালয়েশিয়ার প্রস্তাবটি আদৌ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না। আর চুলচেরা বিশ্লেষণে মালয়েশিয়ার প্রস্তাবটি যদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে না পারে, তাহলে প্রস্তাবটি বাতিল করে দেওয়াই মঙ্গল। পদ্মা সেতু আমাদের প্রয়োজন, সন্দেহ নেই তাতে। এই সেতুটি দেশের অর্থনৈতিক চিত্র পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা এই সেতু নির্মাণের পর সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে, এটা যেমন সত্য; তেমনি এটাও সত্য, এই সেতু জিডিপিতেও অবদান রাখবে। এখন তুলনামূলক বিচারে যে প্রস্তাব আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে বেশি, আমরা সে প্রস্তাবই গ্রহণ করব। তুলনামূলক বিচারে বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবটি ভালো। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় এবং এর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক অর্থায়নের ব্যাপারে কোনো 'পজিটিভ' সাড়া দেবে না। অনেকেই জানেন, কানাডার ওন্টারিও প্রদেশে এ-সংক্রান্ত একটি মামলা বিচারাধীন। দুই ব্যক্তি- যার একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, তাঁরা সেখানে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের বিচার চলছে। ২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। অভিযোগ উঠেছে, গ্রেপ্তার হওয়া ওই দুই ব্যক্তি কানাডার কম্পানি এসএনসি লাভালিনের পক্ষে 'ঘুষের বিনিময়ে' কাজ পাইয়ে দেওয়ার অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন। সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও মন্ত্রী তা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। এখন ওন্টারিওর আদালতে বিষয়টি ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। এডিবি ও জাইকা ঋণের মেয়াদ বাড়ালেও তা বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলবে না। বলা ভালো, প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৯০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি টাকায় ২৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার ওপর)। এখানে বিশ্ব্বব্যাংকের দেওয়ার কথা ১২০ কোটি ডলার। সেই সঙ্গে এডিবি ৬১ কোটি ৫০ লাখ ও জাইকা ৪০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা। ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক বা আইডিবির দেওয়ার কথা ১৪ কোটি ডলার। এখন বিশ্বব্যাংক যদি সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে এডিবি, জাইকা কিংবা আইডিবি সিদ্ধান্ত নিলেও তাতে কোনো কাজ হবে না।
এখন যে সিদ্ধান্তটি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত আমরা কত দিন অপেক্ষা করব? নাকি বিকল্প সিদ্ধান্ত আমরা নেব। বিকল্প সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দুটি প্রস্তাব আছে- এক. মালয়েশিয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করা, দুই. নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করা। তৃতীয়ত, আরেকটি প্রস্তাবও আমরা চিন্তা করতে পারি- আর তা হচ্ছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে পদ্মা সেতুর নির্মাণ পরিকল্পনা আপাতত পিছিয়ে দেওয়া। এই তিনটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। মালয়েশিয়ার প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের 'ফাঁদ'। এই ফাঁদে বাংলাদেশ যদি একবার পা দেয়, তা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ডেকে আনবে। যেখানে একনেকে সর্বোচ্চ ২.৯ বিলিয়ন ও বিশ্বব্যাংক ২.৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় প্রাক্কলন করেছিল, সেখানে মালয়েশিয়ার প্রস্তাব ৫.৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবের চেয়ে দ্বিগুণ ব্যয় প্রাক্কলন করেছে মালয়েশিয়া। শুধু তা-ই নয়, যেখানে বিশ্বব্যাংকের সুদ দশমিক ৭৫ ভাগ, সেখানে মালয়েশিয়াকে সুদ দিতে হবে ৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংককে সরল সুদে টাকা পরিশোধ করতে হবে, আর মালয়েশিয়াকে চক্রবৃদ্ধি হারে এই সুদ পরিশোধ করতে হবে। এখানে আরো যে প্রশ্নটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে সেতু নির্মাণের মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে। বিশ্বব্যাংক তার প্রতিটি প্রকল্পে (পদ্মা সেতুসহ) মান রক্ষা করে ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এই মান রক্ষা করা হয়। ফলে সেতুর দীর্ঘস্থায়িত্বের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে সেতুর মানের কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করলেও সেতুটির মালিকানা থাকবে বাংলাদেশের কাছে। কিন্তু মালয়েশিয়ার প্রস্তাবে মালিকানা থাকবে মালয়েশিয়ার হাতে। যেখানে তুলনামূলক বিচারে বিশ্বব্যাংক ২০ হাজার কোটি টাকা ফেরত নেবে, সেখানে মালয়েশিয়া ফেরত নেবে ৭০ হাজার কোটি টাকা। কোনো বিবেচনায়ই মালয়েশিয়ার প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য লাভজনক নয়। এমনকি এ থেকে দক্ষিণ বাংলার মানুষ যে আদৌ উপকৃত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। কেননা সেতু ব্যবহারকারীরা, অর্থাৎ যাঁরা গাড়ি ব্যবহার করে সেতু পারাপার হবেন (যাত্রী ও ব্যবসায়ী), তাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে টোল দেবেন। বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে যে টোল আদায় হবে, তা জমা হবে সরকারের কোষাগারে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া টোল আদায় করে নিজ দেশে নিয়ে যাবে। বিনিয়োগকৃত অর্থ দ্রুত তুলে নেওয়ার জন্য তারা অতিরিক্ত টোলও আদায় করবে। এতে করে যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা টোল ব্যবহারে নিরুৎসাহী হবেন। দক্ষিণ বাংলা থেকে যেসব পণ্য ঢাকায় আসবে, তার দামও বেড়ে যাবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সেতু ও হাইওয়ে নির্মাণে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট, বিশেষ করে কারিগরি সেবা, পরামর্শক সেবা ও মনিটরিং সেবা বিশ্বমানের। এসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনিয়মের আশঙ্কা কম। থাকেই না। নিয়মিত তারা মনিটর করে ও সদর দপ্তরে তা মূল্যায়ন করে। কিন্তু বিশ্বের কোথাও মালয়েশিয়া এ ধরনের বড় সেতু করেছে তার নজির নেই। সুতরাং মালয়েশিয়ার প্রস্তাব কোনো বিবেচনায়ই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার জেদের বশবর্তী হয়ে যদি শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করে, তাহলে তাতে করে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হবে না। জনসাধারণের ওপর এই ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে মাত্র। এতে করে দক্ষিণ বাংলার জনগণের উপকারের চেয়ে অপকারই হবে বেশি। বাংলাদেশ নিজেও পারবে- এমন একটি হাস্যাস্পদ সংবাদের জন্ম দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর কথার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীরাও জোরেশোরে বলতে শুরু করলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হবে। এমনকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে চাঁদাবাজি শুরু হয়ে গেল। এক ছাত্র মারাও গেল চাঁদার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে। চাঁদার বাক্স নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ছাত্রলীগের ছেলেদের চাঁদাবাজির ছবিও ছাপা হয়েছিল পত্রপত্রিকায়। আমাদের রাজনীতিবিদরা জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য অনেক কথা বলেন। এখন পদ্মা সেতু নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোই মঙ্গল। যে প্রস্তাবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না, সে প্রস্তাবে বাংলাদেশ যেতে পারে না। প্রয়োজনে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তাতে ক্ষতির কিছু নেই। বরং এতে করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে। মালয়েশিয়ার প্রস্তাবের ফাঁদে পা না দিয়ে আমরা যদি প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া পিছিয়ে দিই, তাতে আমাদের মঙ্গল নিহিত।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক
tsrahmanbd@yahoo.com
www.tsrahmanbd.blogspot.com

No comments

Powered by Blogger.