হৃদয়নন্দন বনে-ঈদ এলো ঈদ গেল by আলী যাকের

আমাদের এখানে প্রাচুর্য যত বাড়ছে, আমার ভয় হয়, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অজ্ঞতাও বোধহয় একই হারে বাড়ছে। অর্থাৎ অর্থ সমাগম হচ্ছে অপোগণ্ডের হাতে। সেদিন এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল দু'জন মেধাবী এবং সফল তরুণের সঙ্গে। তারা কিন্তু কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলল যে, যেসব সমাজে সামন্ততন্ত্র ভেঙে গিয়ে পুঁজিবাদের আগমন ঘটে সেখানে


শুরুতে এ রকম দেখা যায়। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। নব্য পুঁজিবাদীরা অর্থ, বৈভব এবং বিলাসব্যসন ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহী নন


এবারের ঈদের ছুটির শুরুতে দেশের বাইরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসেছি ঠিক ঈদের আগের দিন। জীবনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এসেছি ইতিমধ্যে। সেই বাল্যকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নানা বর্ণের, নানা স্বাদের ঈদের অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। এই বয়সে পেঁৗছেও ঈদ আসার আগে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে একটি একঘেয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আমাকে, 'ঈদের কোনো মধুর স্মৃতি বলুন আমাদের!' আমাদের বেশিরভাগ ঈদের স্মৃতিই মধুর হয়ে থাকে সাধারণত। এরই মাঝে কিছু কিছু দুঃখ ভারাক্রান্ত ঈদ যে পার করতে হয়নি, তা আমি বলব না। যেমন আমার জীবনে পরপর তিনটি ঈদ এসেছে বেদনাবহ পরিস্থিতির মধ্যে। সেই ঈদগুলোর কাছে-পিঠেই আমি একে একে হারিয়েছি আমার বাবা, মা এবং দিদিকে। সেই সময়ে ঈদ এসেছে, ঈদ গেছে। কিন্তু কখন এসেছে, কখন গেছে সেই সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন থেকেছি আমি। এই ধরনের বেদনা এবং আনন্দের সনি্নবেশ, আমি নিশ্চিত, আমার বয়সী সকলের জীবনেই ঘটেছে নিশ্চয়।
এবারে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সিঙ্গাপুর যেতে হয়েছিল। সেখানে হোটেল রুমে বসে ইন্টারনেটে দেশজ পত্রপত্রিকা পড়ার অবকাশ পেয়েছি এবং জানতে পেরেছি যে, এই ঈদে বাংলাদেশের অবস্থাপন্ন অনেকেই কাছে-পিঠের বিদেশগুলোতে ঈদের বাজার করতে গেছেন। তার মধ্যে যেমন মুম্বাই, কলকাতা ছিল, তেমনি ছিল ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুর। পড়ে অবাক হয়েছিলাম অবশ্যই। কেননা আমার এত বছরের অভিজ্ঞতায় আমি কখনও শুনিনি যে, ঈদের বাজার করতে কেউ এত পয়সা খরচ করে বিদেশে পাড়ি জমায়। বিয়ের বাজার করতে কলকাতা পর্যন্ত আমারই অনেক আত্মীয়স্বজন যায়, এটা অবশ্য জানতাম। যা হোক, খবরগুলো পড়ে আমার মনে হলো যে, আমাদের ক্ষুদ্র, দরিদ্র দেশটিতে অনেক অর্থ সমাগম হচ্ছে এবং এই ধরনের কর্মকাণ্ড সেই প্রাচুর্যেরই প্রতিচ্ছবি। এবারে সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার সময় গাঢ় নীল আকাশের মধ্য দিয়ে ভেসে এসেছি আমরা। বুঝতে পেরেছি শরৎ তার নানা বর্ণ নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের জীবনে এবার। দেশে গিয়েই দেখতে পাব মেঘ ভাঙা রোদ্দুরে ঝকমক করছে সবুজ বৃক্ষরাজি, কাশবনের প্রাচুর্য এবং মানুষের মনে আনন্দের প্রতিফলন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এক একটি বিশেষ ঋতু আমাদের জন্য এক আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। তা শরতের রোদেলা নীল আকাশই হোক কিংবা বর্ষার ঘন কালো মেঘ।
উড়োজাহাজে বসে নীল আকাশ দেখতে দেখতে আবারও আমার মনে এলো যে এবারের ঈদে অবস্থাপন্ন অনেক বাঙালি বিদেশ গেছে বাজার করতে। এও মনে হলো যে, তাদের সকলেরই বাস ঢাকা শহরের বিলাসবহুল আবাসিক এলাকাগুলোতে। যেমন বারিধারা, গুলশান, বনানী এবং ধানমণ্ডি। এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল সেদিন আমার পুত্রের সঙ্গে। বস্তুতপক্ষে সে-ই আমায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, এসব এলাকায় সচরাচর কোনো বইয়ের দোকান দেখতে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু সেসব দোকান অচিরেই উঠে গেছে ব্যবসার অধোগতির কারণে। একটি ভালো এবং পাঠযোগ্য বই পেতে হলে এখন নিউমার্কেটের আর কোনো বিকল্প নেই। হঠাৎ একটি চুটকির কথা মনে পড়ে গেল। যদিও পাঠকরা অনেকেই এই কৌতুকটি হয়তো শুনেছেন বহুবার, তবুও আলোচনার প্রসঙ্গে অনেক জুতসই বলে আবারও উল্লেখ করছি।
অবস্থাপন্ন কোনো এক গৃহিণী গেছেন এক ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। উদ্দেশ্য, স্বামীর জন্মদিন উপলক্ষে একটি ভালো উপহার কেনা। দোকানি ব্যস্তসমস্ত হয়ে এটা দেখাচ্ছে, সেটা দেখাচ্ছে। প্রথমে টাই দেখাল। গৃহিণী বললেন, আমার স্বামীর হাজার হাজার টাই আছে বাসায়। অন্য কিছু দেখান। দোকানি শার্ট দেখাল। গৃহিণী বললেন, তাও আছে প্রচুর। অবশেষে আমদানিকৃত সুট। তাতেও মন ভরল না গৃহিণীর। অবশেষে বইয়ের বিভাগে নিয়ে গিয়ে দোকানি বলল, হয়তো এখান থেকে আপনি একটা জুতসই উপহার কিনতে পারবেন আপনার স্বামীর জন্য। প্রচুর নতুন বই এসেছে আমাদের কাছে। জবাবে গৃহিণী বললেন যে, 'না, দরকার নেই। আমাদের বাড়িতে বইও একটা আছে।'
আমাদের এখানে প্রাচুর্য যত বাড়ছে, আমার ভয় হয়, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অজ্ঞতাও বোধহয় একই হারে বাড়ছে। অর্থাৎ অর্থ সমাগম হচ্ছে অপোগণ্ডের হাতে। সেদিন এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল দু'জন মেধাবী এবং সফল তরুণের সঙ্গে। তারা কিন্তু কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলল যে, যেসব সমাজে সামন্ততন্ত্র ভেঙে গিয়ে পুঁজিবাদের আগমন ঘটে সেখানে শুরুতে এ রকম দেখা যায়। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। নব্য পুঁজিবাদীরা অর্থ, বৈভব এবং বিলাসব্যসন ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহী নন। অতএব, বুদ্ধিবৃত্তির যে কোনো কর্মকাণ্ডে এক ধরনের ধস নামে। মূল্যবোধের এই ধসকে ঈড়ষষধঃবৎধষ উধসধমব হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তবে চিন্তা করার কিছু নেই। এই নব্য ধনী প্রজন্মের সন্তানরা কিংবা তাদের সন্তানরা যখন শিক্ষা এবং সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত হয়ে তাদের পিতৃপুরুষের ব্যবসার হাল ধরবে তখন অবস্থার উন্নতি হবে। এটা নাকি যে কোনো পুঁজিবাদী সমাজের ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায়। হতেই পারে। আমি নিশ্চিত যে, আজকের নব্য ধনীদের নাতি-নাতনিরা হয়তো তাদের পূর্ব প্রজন্ম থেকে বেশি আলোকিত হবেন এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়ন তখনই হবে আমাদের এই দেশে।
আলোচনা-সমালোচনা সেদিনের মতো ঐখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপর আমরা যে যার পথে নিজের নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। খুব হৃষ্টচিত্তে রওনা দিতে পারিনি। কেননা সবসময়ই আমার মাথার ভেতরে খেলা করছিল এই চিন্তা যে, আজকের তারা আর ভবিষ্যতের তারা_ এর মাঝে প্রায় কুড়ি থেকে ত্রিশ বছরের একটা ব্যবধান যে সৃষ্টি হবে, এই সময়টায় কী ঘটবে আমাদের এই অবক্ষয়ী সমাজে! যদি সত্যিকার অর্থে এই রকম অধোগতিই হয় এই সমাজের, তাহলে বিদ্যা-বুদ্ধিহীন, অন্ধকারাচ্ছন্ন যে গহ্বরে গোটা জাতি পতিত হবে সেখান থেকে উদ্ধারের কোনো পথ কি আমরা আদৌ খুঁজে পাব কোনোদিন?

আলী যাকের : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

No comments

Powered by Blogger.