হলমার্ক কেলেঙ্কারি-এক উপদেষ্টা ও এক প্রতিমন্ত্রীকে জেরা করবে দুদক

সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গতকাল পর্যন্ত ১৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এই জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে তদন্ত দল এই ব্যাপক জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সরকারের একজন উপদেষ্টা ও একজন প্রতিমন্ত্রীকেও জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।


ততবে কবে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে সরকারের ওই উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রী দুদকের মুখোমুখি হতে পারেন। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সবুজ সংকেত পেলেই তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
এদিকে সোনালী ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ঘটনার নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ রকম অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও পরীবিক্ষণে কলঙ্কময় দুর্বলতা।'
সূত্র জানিয়েছে, দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে জানিয়েছেন, সরকারের একজন উপদেষ্টা পুরো বিষয়ে হলমার্কের পক্ষে ব্যাংকের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা সরাসরি নাম উল্লেখ করে দুদককে জানিয়েছেন, সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলীকে তিনি সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় বেশ কয়েকবার দেখেছেন। ২০০৯ সাল থেকে উপদেষ্টাকে এই শাখায় যাতায়াত করতে দেখা গেছে। রূপসী বাংলা শাখায় সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার এক আত্মীয় আছেন- এ খবর বাংলা শাখাটির প্রায় সবাই জানে। হলমার্ককে ঋণ দিতে উপদেষ্টা ছাড়া একজন প্রতিমন্ত্রীও সোনালী ব্যাংকে মৌখিক সুপারিশ করেছেন এমন অভিযোগও উঠেছে।
দুদকের অনুসন্ধান টিমের কাছে রূপসী বাংলা শাখার কর্মকর্তাটি বলেন, ব্যাংক শাখাটিতে মোদাচ্ছের আলীর আত্মীয়ের নাম মেহেরুন নেসা মেরী। তিনি এখানে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত। ওই উপদেষ্টা হলমার্কের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যোগ দিতেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, অপরাধী যত বড় হোক অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে কাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে- এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। এখন এর চেয়ে বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না।
দুদক জানায়, সোনালী ব্যাংকের এমডি হুমায়ুন কবির, ডিএমডি মাইনুল হক ও এডিএমডি মো. সাইফুল হাসানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের কয়েকজনকে আগামী সপ্তাহে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এরইমধ্যে দুদকের তদন্ত দল ব্যাংকটির সাবেক এমডিকে হুমায়ুন কবীরকে নোটিশ না করে সরাসরি তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে বলে জানা গেছে। তাঁকে টেলিফোনে দুদকে হাজির হতে বলা হয়েছে। ঋণ কেলেঙ্কারির অন্যতম প্রধান হোতা হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ ও একই গ্রুপের চেয়ারম্যান তানভীরের স্ত্রী জেসমিন ইসলামকে ২ সেপ্টেম্বর জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদক। পর্যায়ক্রমে হলমার্কের সঙ্গে যুক্ত অপর পাঁচ প্রতিষ্ঠাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল (আগের শেরাটন হোটেল) শাখা থেকে ২০১০-১২ অর্থবছরে মোট তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপ একাই আত্মসাৎ করেছে দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া এই ব্যাংকের গুলশান ও আগারগাঁও শাখা থেকেও ১৪০ কোটি টাকা করে ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা তাদের ঋণসীমার অনেক বেশি।
দুদকের জ্যেষ্ঠ উপ-পরিচালক মীর জয়নুল আবেদিন শিবলির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের তদন্ত দল রূপসী বাংলা শাখার মহাজালিয়াতির বিষয়টি তদন্ত করছে। দুদকের তদন্ত দল মনে করছে, যে অভিনব কৌশলে হলমার্ক ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাট করে নেয় তা ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। সরকারের প্রভাবশালী মহলের চাপ ছাড়া দুর্নীতির মাধ্যমে এ পরিমাণ ঋণ পাওয়া সম্ভব নয়।
দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার অনেক স্তর থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়টি কারো নজরে আসেনি তা কোনোক্রমেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে বা সম্মতিতে জালিয়াতির মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.