সাগর-রুনী হত্যা ॥ র‌্যাবের সন্দেহের তীর এখন বিবিয়ানার দিকেই-কোন বিজনেস ম্যাগনেট জড়িত কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে by শংকর কুমার দে

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকা-ের নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে ‘থলের বিড়াল বেরিয়ে আসার’ উপক্রম হয়েছে। হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডের গোপন সুড়ঙ্গপথে বিকল্প পাইপলাইন স্থাপনের সঙ্গে আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত বিষয়াদি।


এই ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে সাংবাদিক দম্পতি কোন বিজনেস মাফিয়া ডনের পথের কাঁটা হয়েছিলেন কি? গোপন সুড়ঙ্গপথের পাইপ দিয়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের কোন যোগসূত্র আছে কিনা তা তদন্তের সামনে চলে আসছে। এ খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্র জানান, বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডের গোপন সুড়ঙ্গপথে বিকল্প পাইপলাইন স্থাপনের সঙ্গে জড়িত অনেক রাঘববোয়াল শ্রেণীর বিজনেস সিন্ডিকেট। এই রাঘববোয়াল বিজনেস সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনকারী কোন বিজনেস ম্যাগনেট আছে কিনা তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কারণ পেট্রোবাংলা কিংবা সরকারী কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ঠিকাদাররা বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডের একটি গোপন সুড়ঙ্গপথ থেকে বিকল্প একটি পাইপলাইন স্থাপন করার বিষয়টি খুব সহজ ব্যাপার নয়। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে কোথায় কিভাবে গ্যাস নেয়া হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ ধরনের রহস্যময় বিকল্প পাইপলাইন স্থাপন রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা তাও খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বিবিয়ানাকে কেন্দ্র করে দুটি কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন রুনী। এর জের হিসেবেই স্বামীসহ রুনী প্রভাবশালী মহলের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন কিনা এখন তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মেহেরুন রুনী হবিগঞ্জে বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড পরিদর্শন করে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করার মতো দুঃসাহসিক কাজে তাঁকে কে বা কারা উৎসাহ যুগিয়েছে তাও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো কোন প্রভাবশালী মহল থেকে ফাঁস করে দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে উৎসাহী করা হয়েছে। সাংবাদিক দম্পতি খুনের পর লুট হয়ে যাওয়া ডকুমেন্টসহ ল্যাপটপের ডকুমেন্টের সঙ্গে এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের তথ্য-উপাত্তের ভিডিও ফুটেজগুলো সম্প্রতি চুরি হওয়ার ঘটনার সঙ্গে কোন যোগসূত্র আছে কিনা সেটাই এখন তদন্তকারীদের কাছে প্রশ্ন। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার একটি দল বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড পরিদর্শন করে বিষয়টি তদন্ত করে দেখেছেন। সাংবাদিক দম্পতির হত্যারহস্য উদ্ঘাটনের ব্যাপারে অন্যান্য কারণের সঙ্গে র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তাদের সন্দেহের তীর এখন বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডের দিকেই। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়াদিও।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সরকারী ছুটির দিনেও র‌্যাবের তদন্তকারী দলের সদস্যরা সাংবাদিক দম্পতি খুনের ঘটনাস্থল রাজাবাজারের তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট পরিদর্শন করেছেন। নির্দিষ্ট ক্লু যাচাই করতে বার বার খুনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা অপরাধ বিশেষজ্ঞদের। কর্মকর্তারা খুনের স্থানটি আবারও খুব ভালভাবে প্রত্যক্ষ করে ইতোপূর্বে অঙ্কিত স্কেচের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তাঁরা ফ্ল্যাট এবং ভবনের চারদিক ঘুরে দেখেছেন। সাংবাদিক দম্পতিকে খুন করে ঘাতকরা কিভাবে গা ঢাকা দিয়েছে তা তদন্ত করে দেখাই উদ্দেশ্য। খুনের ঘটনাটির নেপথ্যে যে প্রভাবশালী মহল জড়িয়ে আছে তাতে কোনই সন্দেহ নেই। অন্যথায় এতদিনে এই খুনের ঘটনাটির রহস্য উদঘাটিত হয়ে যেত।
সূত্র জানিয়েছেন, র‌্যাবের কর্মকর্তারা গত সোমবার খুনের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে র‌্যাব সদর দফতরে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন রুনীর মা নূরুন্নাহার মির্জাকে। মামলার বাদী নওশের রোমানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সাগর-রুনীর একমাত্র সন্তান মেঘকে র‌্যাবের তদন্তকারীদের তত্ত্বাবধানে কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। মেঘকে কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানের সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডের গোপন সুড়ঙ্গপথে বিকল্প পাইপলাইন স্থাপনের বিষয়ের মতোই কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপে নর বিষয়টিও খুই স্পর্শকাতর। এই ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে সাংবাদিক দম্পতি খুনের শিকার হয়েছেন কিনা তা এখনও তদন্তের পর্যায়ে আছে। র‌্যাবের সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থাও বিবিয়ান গ্যাসফিল্ডের গোপন সুড়ঙ্গপথের বিকল্প পাইপলাইনের বিষয়ে তদন্ত করার জন্য সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি সকালে পশ্চিম রাজাবাজারের ফ্ল্যাট থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও তাঁর স্ত্রী এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রাতের শেষভাগে ফ্ল্যাটের বেডরুমে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন এই দম্পতি। ওই ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে শেরেবাংলানগর থানায় হত্যা মামলা করেন রুনীর ভাই নওশের রোমান। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আড়াই মাস তদন্ত শেষে তদন্তে নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করায় উচ্চ আদালত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই মামলার তদন্ত করার দায়িত্ব দেয় র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব)। র‌্যাবের এএসপি জাফর উল্লাহ তদন্তকারি অফিসার হিসাবে নিযুক্ত হয়েছেন। তাঁকে তদন্তের তদারকিতে সহায়তা করছেন সদর দফতরের তিন পরিচালক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিক দম্পতির খুনের মামলাটি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের উর্ধতন কর্মকর্তারা নিয়মিত মামলাটির তদন্তের মনিটারিং করছেন।

No comments

Powered by Blogger.