মে দিবস-রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন চাই by শহীদুল্লাহ চৌধুরী

মে দিবসে এখন এ প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে_ প্রকৃত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কবে গড়ে উঠবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাইলে এর বিকল্প কিন্তু নেই। আমরা চাই সচেতন শ্রমিকশ্রেণী এবং আপসহীন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। তারা যেমন শ্রমিকদের স্বার্থে কাজ করবে, তেমনি দেশকেও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ায় ভূমিকা রাখবে


বাংলাদেশ ভূখণ্ডে শ্রমঘন শিল্পকে কেন্দ্র করে ষাটের দশকে যথেষ্ট শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন গড়ে ওঠে। পাট, সুতা, প্রকৌশল_ এসব শিল্পের কারখানা ছিল হাতেগোনা, শ্রমিকসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ছিল না। এখন তো তৈরি পোশাক শিল্পেই শ্রমিক রয়েছে ৩০ লাখের বেশি। কিন্তু ষাটের দশকে ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন কারখানায় নিয়মিত সিবিএ বা যৌথ দর কষাকষি সংস্থার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। সে সময়ে স্বাধিকার আন্দোলন বেগবান হতে থাকে এবং শ্রমিকরা তাতে সক্রিয়ভাবে শামিল হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই পাট ও বস্ত্রশিল্প এবং ব্যাংক-বীমা প্রভৃতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকারি পরিচালনাধীনে আনা হয়। ট্রেড ইউনিয়নকেও নতুন পরিস্থিতিতে পাল্টাতে হয় কাজের ধারা। ব্যক্তিমালিকের পরিবর্তে শ্রমিকরা মুখোমুখি হয় সরকারের।
আশির দশকের শুরুতে আমরা দেখতে পাই ব্যক্তি খাত ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ দশকের মাঝামাঝি এইচএম এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল গণআন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিক-কর্মচারীরাও স্কপের নেতৃত্বে নিজস্ব দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে আসেন। বেতন-ভাতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে পরিচালিত এ আন্দোলনের প্রতি দেশজুড়ে অভাবিত সমর্থন দেখা যায়। তবে আন্দোলনের দুর্বলতা ছিল নেতৃত্বে শ্রমিক-কর্মচারীদের পরিবর্তে মধ্যবিত্তদের প্রাধান্য। তারপরও আন্দোলনে শ্রমজীবীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটে এবং এর মধ্য দিয়ে এ শক্তির সম্ভাবনার প্রকাশ ঘটে। অন্যদিকে, কলকারখানার মালিকদের অনেকের মধ্যেই এ আন্দোলন নতুন শঙ্কা সৃষ্টি করে। তাদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়নকে সাইজ করার চিন্তা কাজ করতে শুরু করে। সরকারের মধ্যেও এ চিন্তার লোক ছিল। রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেও কেউ কেউ ছিল যারা শ্রমজীবীদের এ সক্রিয়তাকে ভালো চোখে দেখেনি। এ বহুমুখী তৎপরতার কারণে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে ভাঙন ধরে। এর পেছনে শ্রমিকদের স্বার্থের কর্মসূচি কিংবা কৌশল নয়, বরং মূল বিষয় ছিল রাজনৈতিক। তাছাড়াও ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টির জন্য পরিকল্পিত চেষ্টা চলে। বিশেষ করে সরকার পরিচালিত ব্যাংক ও অন্যান্য কিছু খাতে কিছু চেনা মুখ দিয়ে এমন সব কর্মকাণ্ড আমরা সংঘটিত হতে দেখি, যা ট্রেড ইউনিয়ন সম্পর্কেই নেতিবাচক ধারণা গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখে। এর পাশাপাশি আরও একটি প্রবণতা দেখা দেয়_ ট্রেড ইউনিয়নগুলো স্বাধীন অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে থাকে এবং তারা সরাসরি রাজনৈতিক দলগুলোর অধীন ইউনিটে পরিণত হয়। রাজনৈনিক দলের নেতৃত্ব তাদের যেভাবে পরিচালিত করতে চেয়েছে সেভাবেই তাদের নীতি ও কর্মকৌশল নির্ধারিত হয়। কলকারখানায় সিবিএ নির্বাচন কমে যেতে থাকে। এর পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকরা অনেকটা দলীয় ব্যানারে সংগঠিত হতে থাকে।
গত কয়েক বছরে শ্রমিক সংখ্যা বেড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিপুলসংখ্যক কারখানা গড়ে ওঠে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ রফতানিমুখী। কিন্তু এগুলোতে আমরা কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন দেখি না। দেশে অন্তত পাঁচ হাজার আধুনিক রাইস মিল গড়ে উঠেছে। এগুলোতে কাজ করে লক্ষাধিক শ্রমিক। তারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে। মে দিবসের মূল দাবি দিনে আট ঘণ্টা কাজ তাদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। কিন্তু তাদের মজুরি কম। অন্য সুবিধাও কম। রোদ-বৃষ্টি তাদের গায়ে মাখাতে নেই। রাতের নিস্তব্ধতাও তাদের কাজ থেকে বিরতি দিতে পারে না। মিলগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিক রয়েছে। তাদের এমনকি মাতৃত্ব ছুটি দিতেও আপত্তি। অথচ এসব মিলের মালিকরাই এখন দেশের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। কৃষক-মজুররা শ্রমে-ঘামে যে ধান উৎপন্ন করে তা কী দামে বিক্রি হবে তার নির্ধারক হয়ে ওঠে এসব মালিক। তারা যে দামে বিক্রি করতে ইচ্ছা করে ক্রেতারা সে দামেই বাজার থেকে চাল কেনে। জাহাজ ভাঙার কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের দুর্দশার কথাও আমাদের জানা রয়েছে। এখানে যারা কঠোর পরিশ্রম করে, তাদের ভাগ্যে কিছুই জোটে না। এমনকি তাদের দাবি জানানোরও সুযোগ নেই। ইউনিয়ন গঠন তো দূরের কথা, কেউ টুঁ শব্দটি করলে মালিকদের হাতে তাকে ঠাণ্ডা করার উপায় রয়েছে। সরকারও এদের কিছু বলার ক্ষমতা রাখে বলে মনে হয় না।
আমাদের রাজধানীতে শিল্পের ছড়াছড়ি। আবাসিক এলাকায়ও গড়ে উঠছে কারখানা। শিল্পাঞ্চল যেমন নেই, তেমনি শ্রমিকদের আবাসন এলাকা বা কলোনিও নেই। এটাও শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠার পথে বড় বাধা। কিন্তু এমনকি দেশের পুঁজিবাদী বিকাশ চাইলেও শ্রমিকদের সংগঠিত থাকা দরকার। শুধু বেতন-ভাতার দর কষাকষির জন্য নয়, শিল্পে যেন অরাজক অবস্থার সৃষ্টি না হয় সেটা নিশ্চিত করতেও এর প্রয়োজন রয়েছে। পোশাক শিল্পে বিশেষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য সরকার ওর্ মািলকরা উদ্যোগী হয়েছে। কারখানা ভাংচুর হলেও অনেক ক্ষতি হয়। এর তুলনায় বরং কম খরচেই মেটানো যায় শ্রমিকদের দাবি। মালিকদের এটা বুঝতেই হবে। আর শ্রমিকদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার জন্য সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হচ্ছে ট্রেড ইউনিয়ন। কিছু লোক ট্রেড ইউনিয়নের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে বলেই ট্রেড ইউনিয়নকে শিল্প খাতের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনার দরকার নেই।
পহেলা মে এখন রাষ্ট্রীয় ছুটি। সরকারের তরফে এদিনে অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাজানো হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই এদিনে অনেক প্রতিষ্ঠান খোলা থাকে। সেখানে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্তদের পরিশ্রম করতে হয় জীবিকার জন্য। বলা যায়, তাদের উপায় থাকে না। কিন্তু এবারে সাপ্তাহিক ছুটির দু'দিনের সঙ্গে রোববার মিলিয়ে তিনদিনের ছুটি পেয়ে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবে সচিব-অতিরিক্ত সচিবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
মে দিবসে এখন এ প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে_ প্রকৃত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কবে গড়ে উঠবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাইলে এর বিকল্প কিন্তু নেই। আমরা চাই সচেতন শ্রমিকশ্রেণী এবং আপসহীন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। তারা যেমন শ্রমিকদের স্বার্থে কাজ করবে, তেমনি দেশকেও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ায় ভূমিকা রাখবে।

শহীদুল্লাহ চৌধুরী : ট্রেড ইউনিয়ন নেতা
 

No comments

Powered by Blogger.