বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে পরিসম্পদ বণ্টন কত দূর? by সৈয়দ ইমতিয়াজ ইসলাম

পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। সেদিন লাহোরে দ্বিতীয় ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে উভয় দেশ পারস্পরিক স্বীকৃতি বিনিময় করে। স্বীকৃতি বিনিময়ের পর বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য লাহোর সফর করেন।


এরপর নয়াদিল্লিতে ১৯৭৪ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির বিচার বাতিল করা হয়।
অতঃপর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭৪ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সফরে আসেন। কিন্তু বাংলাদেশ ও পাকিস্তান পরিসম্পদ বণ্টনের পদ্ধতি নির্ধারণে ব্যর্থ হওয়ায় কোনো ফলপ্রসূ পরিণতি ছাড়াই এ সফর শেষ হয়। বাংলাদেশ পাকিস্তানের প্রাক-১৯৭১ সম্পদের প্রায় অর্ধেক দাবি করে; কিন্তু ভুট্টো এ দাবিকে অবাস্তব আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দেন। বাংলাদেশ অবিভক্ত পাকিস্তানের পরিসম্পদের ন্যায্য হিস্যা হিসেবে ৪.৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধের জন্য পাকিস্তানের কাছে দাবি জানায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিদুর্গতদের জন্য বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর প্রদত্ত সাহায্যের ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ফেরত দেওয়ার জন্যও বাংলাদেশ পাকিস্তান সরকারের কাছে দাবি জানায়। ১৯৭০ সালের নভেম্বর থেকে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঢাকা অফিসে জমা থাকা এই অর্থ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওই ব্যাংকের লাহোর শাখায় স্থানান্তর করা হয়।
১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের পাকিস্তান সফরের সময় সিদ্ধান্ত হয় যে দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবরা পরিসম্পদ বণ্টনের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখবেন। ১৯৮০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে স্থির হয় যে দুই পক্ষের আন্তমন্ত্রণালয় প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ ইসলামাবাদে বৈঠকে মিলিত হয়ে বিষয়টি সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করে নিজ নিজ পররাষ্ট্রসচিবের কাছে প্রতিবেদন পেশ করবে। কিন্তু সেই সময় থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান অদ্যাবধি কখনোই সেই বৈঠক আহ্বান করেনি। পাকিস্তানের পরিসম্পদের ওপর বাংলাদেশের কোনো আইনগত অধিকার আছে- এটা স্বীকার না করে বিষয়টি কেবল আলোচনা করতে রাজি পাকিস্তান।
১৯৮৯ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ পরিসম্পদ বণ্টনের বিষয়টি উত্থাপন করে। বাংলাদেশ ১৯৪৭ সালের পার্টিশন কাউন্সিলের অনুরূপ একটি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করে। বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আরবিট্রেশনেরও প্রস্তাব করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে প্রকাশিত যুক্ত বিবৃতিতে বলা হয় যে উভয় পক্ষ 'এই দীর্ঘস্থায়ী বিষয়টির' সন্তোষজনক মীমাংসার জন্য ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণে সম্মত হয়েছে।
পরিসম্পদ বণ্টনের অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে ১৯৯২ সালের আগস্টে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পাকিস্তান সফরের সময়। দুই প্রধানমন্ত্রী একমত হন যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে পরিসম্পদ বণ্টন ইস্যুর আশু সমাধান অত্যাবশ্যক। কিন্তু এ ব্যাপারে এ পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি এবং অবস্থা যেখানে ছিল, সেখানেই আছে।
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাকিস্তান সফরের সময় তাঁর প্রতিপক্ষের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সময় যখন বিষয়টি আবার উত্থাপন করা হয়, তখন পাকিস্তানি পররাষ্ট্রসচিব শামশাদ আহমদ অশোভন হস্তক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশের এই ধরনের দাবি পাকিস্তানে বন্ধুসুলভ কাজ বলে গণ্য হবে না। ২০০৪ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকালে এবং প্রতিবছর পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের আলোচনাকালে পাকিস্তানের কাছে বিষয়টি উত্থাপন অব্যাহত রাখে বাংলাদেশ। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বড়জোর বাংলাদেশের উদ্বেগ সম্পর্কে অবহিত হয়েছে; কিন্তু তা নিরসনের কোনো অঙ্গীকার করেনি।
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.