স্বল্পোন্নত দেশ সম্মেলন-নতুন অংশীদারিত্ব অথবা পুরনো আনুষ্ঠানিকতা? by জিয়াউল হক মুক্তা

একদিকে ক্ষমতাধর ও উন্নত দেশ, অন্যদিকে এশিয়ায় ভারত ও চায়না কিংবা আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা আমেরিকা মহাদেশে ব্রাজিল ও মেক্সিকোর মতো দেশের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আলোচনায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ খুবই কঠিন;


কিন্তু বিকল্প অনুসন্ধানের
বিকল্প নেই


স্বল্পোন্নত দেশ বিষয়ে চতুর্থ জাতিসংঘ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৯-১৩ মে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে। প্রতি দশকে একবার অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলন বাংলাদেশসহ ৪৮টি স্বল্পোন্নত দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে বহুপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে প্রণয়ন ও গ্রহণ করা হয় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ কর্মসূচি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্তত ৫০ জন রাষ্ট্রপ্রধান এ সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন।
জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় আয়োজিত এবারের সম্মেলনের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যগুলো হলো : ২০০১ সালে ব্রাসেলসে স্বল্পোন্নত দেশ ও তাদের উন্নয়ন অংশীদারদের গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়নের সামগ্রিক মূল্যায়ন করা; সম্পাদিত ভালো কাজ ও এগুলোর শিক্ষা জানা এবং বাধা ও প্রতিবন্ধকতা উতরানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাজ চিহ্নিত করা; স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা এবং এগুলো কার্যকরভাবে মোকাবেলায় জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কাজ চিহ্নিত করা; স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বিশেষ প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিভিন্ন জাতিসংঘ সম্মেলনে গৃহীত অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা; এসব অঙ্গীকার পূরণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সহায়তামূলক পদক্ষেপ ও কাজগুলো সংগঠিত করা; এবং স্বল্পোন্নত দেশ ও তাদের উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে একটি নবতর অংশীদারিত্ব প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠা করা।
খসড়া কর্মসূচির ভূমিকায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর দুর্দশার বহুমুখী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ৪৮টি স্বল্পোন্নত দেশের ৮৮ কোটি জনগণের ৭৫ শতাংশ দরিদ্র মানুষ গঠন করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্বল অংশটি। দারিদ্র্য ও বিপন্নতার এ ধরনের অমানবিক অমর্যাদাকর পরিস্থিতি একুশ শতকে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ অবস্থা মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দেওয়া সহযোগিতা খুবই অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়েছে। বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত সম্পদ ও অধিকতর কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। ভূমিকায় বিদ্যমান সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি ও খাদ্যমূল্যের অস্থিতিশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নতুন চ্যালেঞ্জেরও উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে ব্রাসেলস কর্মসূচির পর্যালোচনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হলেও এটা পরিষ্কারভাবে বের হয়ে এসেছে যে 'কর্মসূচির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কার্যক্রমগুলো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি'। বলা হয়েছে 'অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসট্যান্স' কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধি পায়নি।
খসড়া কর্মসূচির তৃতীয় অধ্যায়ে অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় 'পলিসি স্পেস' ও 'পলিসি কোহেরেন্স' নিশ্চিত করার বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো আপত্তি করছে। উন্নত দেশগুলো সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের বদলে এবং জোরদার সহযোগিতার বদলে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপরাপর বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ব্রাসেলস কর্মসূচিতে জিডিপি বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হয়েছিল। খসড়া ইস্তাম্বুল কর্মসূচিতে অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সাতটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে : উৎপাদন ক্ষমতা, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রাম উন্নয়ন, পণ্য ও বাণিজ্য, মানব ও সমাজ উন্নয়ন, জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন, বহুমুখী সংকট ও নতুন চ্যালেঞ্জ, উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আর্থিক সম্পদ এবং সর্বস্তরে সুশাসন।
সব পক্ষের যৌথ উদ্যোগ, স্বল্পোন্নত দেশের উদ্যোগ, উন্নয়ন অংশীদারদের উদ্যোগ এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা উদ্যোগ পরিচালনার মাধ্যমে উলি্লখিত ক্ষেত্রে কার্যক্রমগুলো সম্পাদনের কথা বলা হলেও এ অধ্যায়ের বিশ্লেষণ থেকে তিনটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব। প্রথমত, একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক কর্মসূচি প্রণয়নের কথা মুখে বলা হলেও সব দায়ভার চাপানো হয়েছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপরই। বিদ্যমান ব্যবস্থা ও নীতির সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রম করার বদলে সেগুলোই আবার নতুন করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলো সর্বত্র নিজেদের ভূমিকা অস্বীকার করছে; স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহযোগিতার বিষয়টিকে নিজেদের জন্য সমস্যা হিসেবে মনে করে আলোচনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তারা চেষ্টা করছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে যাতে সম্পদ ও সহযোগিতা কম আসে। দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার ক্ষেত্রে তারা সহযোগিতার অঙ্গীকার করছে না। তৃতীয়ত, উন্নত দেশগুলোও সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের বদলে নিজেদের দায়বদ্ধতা অপরাপর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য এটা খুবই দুঃখজনক যে সাম্প্রতিককালের বহুপক্ষীয় আলোচনার অর্জনগুলোও এখন অস্বীকার করা হচ্ছে।
পঞ্চম অধ্যায়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উত্তরণ ও রূপান্তরের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের বদলে চলমান প্রক্রিয়া, যেগুলো গত তিন দশকে কোনো কাজে আসেনি, সেগুলো বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে একটি 'অ্যাডহক ওয়ার্কিং গ্রুপ' গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে, যে বিষয়ে উন্নত দেশগুলো এখনও কোনো মতামত দেয়নি।
সর্বশেষ অধ্যায়ে বিভিন্ন বহুপক্ষীয় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে কর্মসূচির বাস্তবায়ন তদারকি ও পরিবীক্ষণের জন্য।
ইস্তাম্বুল কর্মসূচির খসড়া পাঠ দেখে মনে হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশের প্রতিনিধি নেপাল চলমান আলোচনায় কার্যকর নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে; বাংলাদেশসহ অপরাপর স্বল্পোন্নত দেশগুলোও দুঃখজনকভাবে নেপালের ব্যর্থতা উতরানোয় কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। বাংলাদেশের পক্ষে এ আলোচনায় এতদিন নেতৃত্ব দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি, যাদের এ ধরনের বহুপক্ষীয় আলোচনায় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা কোনোটিই নেই। উপরন্তু এ প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই জাতীয় স্বার্থ, উন্নয়নের জাতীয় মালিকানা ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বেলায় সীমাহীন ব্যর্থতার পরিচয়বাহী এবং কথিত দাতাগোষ্ঠীর স্বার্থের তল্পিবাহী। সূচিত আলোচনায় ইআরডি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে যথাসময়ে অন্তর্ভুক্ত না করে অতি সম্প্রতি সে উদ্যোগ নিয়েছে।
ইস্তাম্বুল কর্মসূচির খসড়ার বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি উতরিয়ে এ সম্মেলন থেকে আগামী ১০ বছরের জন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য ফলপ্রসূ কোনো কিছু অর্জন করা হবে খুবই কঠিন। তারপরও আশা করা যায় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরিবেশ ও বনমন্ত্রীসহ যে প্রতিনিধি দল ইস্তাম্বুল সম্মেলনে যোগ দেবেন এবং এক পর্যায়ে যে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী নিজে, তারা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে অন্তত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর যেসব বিষয় বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সেগুলোতে কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করবেন।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তিনটি বিশেষ বিষয় বিবেচনার অনুরোধ রাখা হচ্ছে। প্রথমত, আলোচনার শেষ মুহূর্তে যেহেতু অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের নেতৃত্ব বাতিল করা সম্ভব নয়, সেহেতু চলমান আলোচনায় পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ অপরাপর মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যকর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে আলোচনার বাকিটুকু পরিচালনা করা হোক। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বহুপক্ষীয় আলোচনায় দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ও ব্যক্তি খাতের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত ও তাদের কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেওয়া হোক। তৃতীয়ত, বর্তমান আলোচনাসহ সব বহুপক্ষীয় আলোচনায় 'জি-৭৭ ও চায়না' গ্রুপের নেতিবাচক ভূমিকা যথাযথভাবে পর্যালোচনা সাপেক্ষে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশের ভূমিকা নির্ধারণ করা হোক। উলেল্গখ্য, বিশ্ব বাণিজ্য আলোচনা, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক চলমান আলোচনা এবং সর্বশেষ স্বল্পোন্নত দেশ সম্মেলনের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতৃস্থানীয় দেশগুলো স্বল্পোন্নত দেশের স্বার্থের পরিপন্থী কার্যক্রম পরিচালনা করছে ধারাবাহিকভাবে।
এটা সত্যি যে, একদিকে ক্ষমতাধর ও উন্নত দেশ, অন্যদিকে এশিয়ায় ভারত ও চায়না কিংবা আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা আমেরিকা মহাদেশে ব্রাজিল ও মেক্সিকোর মতো দেশের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আলোচনায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ খুবই কঠিন; কিন্তু বিকল্প অনুসন্ধানের বিকল্প নেই। আশা করা যায় বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশের সরকারগুলো আগামী ১০ বছরের জন্য একটি জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।


জিয়াউল হক মুক্তা : কলাম লেখক

No comments

Powered by Blogger.