শরণার্থী-মিয়ানমারকে যে প্রশ্নটি করতে হবে by মোহাম্মদ আরজু

'নতুন মিয়ানমার'কে এই প্রশ্ন করতে হবে যে, নতুন এই শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া হলে তাদের যথাশিগগির ফিরিয়ে নেওয়ার নিশ্চয়তা, ফিরিয়ে নেওয়ার মতো অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তৈরি করতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং নৃতাত্তি্বক সংখ্যালঘু হিসেবে স্ট্যাটাস দেওয়ার নিশ্চয়তা দেশটি দেবে কি?


'মিয়ানমারে আদমশুমারি ও বাংলাদেশের জন্য শঙ্কা' শিরোনামে গত ২০ মে আমার লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল দৈনিক সমকাল। সেখানে একেবারে শেষের অনুচ্ছেদটি ছিল এমন, 'বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত দেওয়ার পথ সহজ রাখতে চায়, যদি অদূর ভবিষ্যতে আরাকান থেকে নতুন করে কক্সবাজারমুখী শরণার্থীর স্রোত দেখতে না চায়, তবে এখনই সময় তৎপর হওয়ার। এ বিষয়ে দ্রুত মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে।' কোন বিষয়ে? মিয়ানমারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সমর্থন নিয়ে সংঘটিত হতে যাওয়া আদমশুমারিতে জাতিগত রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের নাগরিক ও নৃতাত্তি্বক সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়ে। লেখা হয়েছিল, "বিশেষ করে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলকে জানাতে হবে যে, আদমশুমারির আগে যাতে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং মিয়ানমারের ভেতরের রোহিঙ্গাদের 'অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী' স্ট্যাটাস পরিবর্তন করা হয়। যাতে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে তাদের নাগরিকত্বের ও ন্যাশনাল রেস হিসেবে স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা হয়।" এবং "মিয়ানমার সরকার ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, ২০১৪ সালের শুমারি অবশ্যই শরণার্থী বিষয়ে ১৯৫৪ সালের এবং 'রাষ্ট্রহীন' মানুষ বিষয়ে ১৯৬১ সালের জাতিসংঘ কনভেনশনের সঙ্গে মিল রেখে হতে হবে।" যাতে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে তিন দশক ধরে আটকে থাকা রোহিঙ্গাদেরও শুমারিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
নিবন্ধটি পড়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এক সচিব ও আমার শ্রদ্ধাভাজন অগ্রজ ফেসবুকে আমাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন; 'সরকারের নিজের কর্মপদ্ধতি আছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরে ও বাইরে বিশেষায়িত দফতরগুলো এ ধরনের ঘটনাক্রমের সর্বশেষ পরিস্থিতির গতিবিধির ওপর নজর রাখে এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়। আমি নিশ্চিত, আমাদের তরফে খুবই পেশাদারিত্বের সঙ্গে কর্তব্য পালন করা হচ্ছে।' আমার শ্রদ্ধাভাজন কর্মকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা এটুকু আশ্বস্ত করার জন্য। ২০ মের ওই নিবন্ধটির ব্যাপারে নোট নিয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ডেস্ক। পিআইডি তাদের তৈরি করা দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর সারসংক্ষেপের 'উপসম্পাদকীয় ও নিবন্ধ' বিভাগে শুধু ওই লেখাটিই উপস্থাপন করেছিল সেদিন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এরপর গত এক মাসে এসব বিষয়ে মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বাংলাদেশের কোনো 'তৎপরতা'র খবর শুধু দেশের সংবাদমাধ্যম নয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও দিতে পারেনি।
আর এখন, গত এক সপ্তাহ ধরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার খবর আবারও আসছে। সবচেয়ে বড় কথা সরকার এবং রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো বর্তমান সহিংসতাকে স্রেফ 'সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা' বলে বর্ণনা করলে এখন আরাকানে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন বিকল্প সংবাদমাধ্যমে প্রমাণ মিলছে, সরকারের বিভিন্ন বাহিনী এতে সক্রিয়ভাবে সংখ্যালঘুদের দমনে অংশ নিয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া এক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বিষয়ে স্থানীয় পুলিশের একজন উপপরিদর্শক নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তি যে বুলেটে বিদ্ধ হয়েছে তা সাধারণত আইন প্রয়োগকারী বাহিনীগুলো ব্যবহার করে।
অন্যদিকে আরাকান (রাখাইন) প্রদেশের বুথিডংভিত্তিক এক ব্লগার বা সেইনের বরাতে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রথমবারের মতো গত মঙ্গলবার খবর এসেছে, দেশটির সেনাসহ অন্যান্য সরকারি বাহিনী রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের জনপদগুলোতে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে তাদের বিশেষ ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে। এএফপির বেশ কিছু ছবিতেও এমনটি দেখা যাচ্ছে। ২০১৪ সালের শুমারির আগে তাদের এভাবে বাস্তুচ্যুত করার মানে খুব অস্পষ্ট নয়। নিশ্চিতভাবেই 'অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী'তে (ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পিপল) পরিণত করা হচ্ছে তাদের।
তাদের মধ্যে অনেকে সহিংসতা ও ক্যাম্প দুটিই এড়িয়ে আবারও বাংলাদেশে আশ্রয়প্রার্থী হচ্ছে, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের বাধার মুখে শরণার্থীদের নৌকা ভাসছে টেকনাফ উপকূলে নাফ নদীতে, সেন্টমার্টিন দ্বীপের চারপাশে বঙ্গোপসাগরে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশ কোনো শরণার্থী গ্রহণ করবে না। অন্যদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা বাংলাদেশকে অনুরোধ করছে শরণার্থী গ্রহণ করার জন্য। বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন চট্টগ্রাম অঞ্চলে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার মতো অবস্থায় আছে কি?
দুটি দিক_ প্রথমত, নতুন করে শরণার্থী আশ্রয় দিলে পরে ওই এলাকায় যে ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে বাংলাদেশকে, তা কি বর্তমান সংকটের চেয়ে কোনো অংশে কম? দ্বিতীয়ত, আগেকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মতো তাদেরও যে দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশে ফেলে রাখবে না মিয়ানমার, সে নিশ্চয়তা দেশটি অথবা আন্তর্জাতিক মহল দিতে পারে?
১৯৭৮ সাল থেকে সামরিক শাসনাধীন মিয়ানমারে দমনাভিযানের শিকার হয়ে আসা দুই লাখের বেশি ইসলাম ধর্মাবলম্বী জাতিগত রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন চট্টগ্রামের যেসব এলাকার শিবিরগুলোতে আছে, তার কাছাকাছিই আছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জাতিগত রাখাইনদের বসতি_ যে সংখ্যাগুরু জাতিগোষ্ঠীর লোকদের হাতে রোহিঙ্গারা আরাকানে সহিংসতার শিকার হয়েছে। বাংলাদেশেও রাখাইন-রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা কম নয়। তাছাড়া পার্বত্য এলাকায় এ উত্তেজনা সবসময়ই নতুন মাত্রা নেয়, যখন জুম্ম জাতির লোকেরা রাখাইনদের এবং বাঙালি বসতি স্থাপনকারীরা রোহিঙ্গাদের পক্ষ নেয় কোনো অস্থিরতার সময়। সে সঙ্গে আছে শরণার্থী শিবিরের সুবিধাবঞ্চিত ও অভাবী জীবনে নূ্যনতম জীবন ধারণের জন্য আইন অমান্যের অপরিহার্যতা। তিন দশক ধরে শরণার্থী শিবির স্থায়ী হওয়ার কারণে ওই এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রায় সরকারের নাগালের বাইরে। এ পরিস্থিতি তুলে ধরে সহজেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ প্রশ্ন তুলতেই পারে যে, এত ঝুঁকির মধ্যে বাংলাদেশ ঠিক কেন নতুন করে শরণার্থী গ্রহণ করবে?
দুই. এমন সংকটের সময় শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু মিয়ানমারে এটা নতুন কোনো সংকট নয়, দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বাংলাদেশ শরণার্থী গ্রহণ করার মাধ্যমে আরাকানে সহিংসতার আশঙ্কা বন্ধ করতে পারবে না কিংবা সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমারকে তার দমনমূলক নীতি থেকেও সরাতে পারবে না। শরণার্থী গ্রহণ করা আপাত সংকট সমাধানে একটা আপাত ব্যবস্থা। দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সমাধানে নীতি ও কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে মিয়ানমারকেই, যাতে শরণার্থী তৈরি না হয়। পুরো দুনিয়া থেকে অর্ধশতাব্দীর বিচ্ছিন্নতা ও গোপনীয়তার পর এখন মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা বলছেন, তারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনছেন- 'নতুন মিয়ানমার' এখন 'ওপেন ফর বিজনেস'_ আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে তারা যোগসূত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান। 'নতুন মিয়ানমার'কে এই প্রশ্ন করতে হবে যে, নতুন এই শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া হলে তাদের যথাশিগগির ফিরিয়ে নেওয়ার নিশ্চয়তা, ফিরিয়ে নেওয়ার মতো অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তৈরি করতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং নৃতাত্তি্বক সংখ্যালঘু হিসেবে স্ট্যাটাস দেওয়ার নিশ্চয়তা দেশটি দেবে কি? এবং প্রিয় 'আন্তর্জাতিক মহল'! রোহিঙ্গা সংখ্যলঘুদের বিষয়ে বিদ্যমান নীতি বহাল রেখে মিয়ানমার কি সত্যিই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পুনরায় যোগসূত্র স্থাপন করতে চায়, যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারে বিশ্বাস করে?

মোহাম্মদ আরজু : সাংবাদিক
mohammadarju@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.