দুনিয়াজুড়ে খাদ্যঘাটতি ও মূল্য বিস্ফোরণ by শামসুল আরেফিন খান

'আই অ্যাম হাংরি মম'_এই ইংরেজি বাক্যের শুদ্ধ বঙ্গানুবাদ শিষ্টাচারে হওয়া উচিত, মা আমার খিদে পেয়েছে। কিন্তু যে বর্ধিষ্ণু শিশু পেটের তাগিদে কর্মক্ষেত্রে ঘাম ঝরিয়ে ক্ষুধায় কাতর হয়ে ডেরায় ফেরে, তার ভাষায় সেটা হবে, মা ভাত দে।


আবার কাঠফাটা জমিচেরা রোদে লাঙ্গল ঠেলে ক্ষুধার অঙ্গার নিয়ে ঘরে ফেরে বাংলার যে কৃষক সে পড়ন্ত দুপুরে পুকুরে ডুব দিয়ে এসেই চুলায় হাঁড়ি চড়ুক, না চড়ুক, চড়া মেজাজে হাঁক দিয়ে বলবে_বৌ ভাত দে। বাংলাদেশে এমনটাই চলে আসছে।
১৯৯৬ সালে ফাও-এর উদ্যোগে রোমে বিশ্ব খাদ্য শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রাক্কালে লন্ডনের বিশ্বখ্যাত 'ইকোনমিস্ট' পত্রিকা লিখেছিল, মানুষ ক্ষুধার্ত, কারণ তারা দরিদ্র। মানুষ ক্ষুধার্ত তার কারণ ওই নয় যে পৃথিবীর খাদ্যভাণ্ডার শূন্য হয়ে পড়েছে... এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যের সংকট মোচনের জন্য রাজনীতির পরিবর্তন হওয়া খুব দরকার (দি ইকোনমিক, লন্ডন, ১৬ নভেম্বর, ১৯৯৬)। সে সময় ফাও-এর তৈরি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতিমূলক দলিলে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তিন কোটি লোক একেবারেই ভূমিহীন হয়ে পড়েছে এবং ১৩ কোটি ৮০ লাখ (১৩৮ মিলিয়ন) মানুষ রয়েছে প্রান্তিক অবস্থানে। উন্নয়নশীল বিশ্বজুড়ে প্রান্তিক ভূমিহীনদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। পল্লী অঞ্চলে যারা ভূমিহীন এবং প্রায় ভূমিহীন তাদের জন্যই খাদ্য নিরাপত্তার বাতাবরণ গড়ে তোলা দরকার।
পৃথিবীজুড়ে ক্ষুধার বিস্তৃতি এখন ব্যাপক। ক্ষুধার্ত মানুষের ৮০ শতাংশই হচ্ছে ভূমিহীন অথবা আধাভূমিহীন (৫০ শতাংশ প্রান্তিক, ২০ শতাংশ ভূমিহীন এবং ১০ শতাংশ মৎস্যজীবী ও বিবিধ পেশার মানুষ)। বাকি ২০ শতাংশ শহরাঞ্চলের গরিব মানুষ, যাদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। খাদ্য ঘাটতিজনিত সংকট বৃদ্ধি তার অন্যতম কারণ। একমাত্র কারণ নয়। ভূমি এবং অন্য সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার ভূমিকাই এ ক্ষেত্রে বেশি। ভূমিহীনতা এবং দারিদ্র্য পৃথিবীর অনেক প্রাচীন সমস্যা। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সে সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে কৃষি উন্নয়ন এবং বাণিজ্য নীতি নির্ধারণে বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ এবং জাতীয় সরকারগুলোর ভূমিকার কারণে। বিশেষজ্ঞরা এমনটাই মনে করছেন। সমগ্র বিশ্বে চলমান সময় খাদ্যমূল্য বেড়েই চলেছে এবং তা ক্রমেই বিপজ্জনক অবস্থার দিকে এগোচ্ছে। অতিসম্প্রতি বিশ্বব্যাংক এই মর্মে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। বিশ্বজুড়ে বিস্ময়করভাবে ২৯ শতাংশ হারে খাদ্যমূল্য বেড়েছে। রাশিয়ার অনলপ্রবাহ ও অস্ট্রেলিয়ায় মহাপ্লাবন গমের মূল্য গত অর্থবছরের তুলনায় ২৯ শতাংশ বৃদ্ধির কারণ হয়েছে। এদিকে ব্যাপক বন্যা এবং তার পিছে পিছে ধেয়ে আসা খরার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এক বছরে ভুট্টার দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশ। তার ফলে শুধু যে মানুষের খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে তাই নয়, পশুখাদ্যেরও উদ্বেগজনক ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাপক মূল্যস্ফীতি ঘটেছে।
বিশ্লেষকরা এখন মনে করছেন, চলতি সময় তিউনিসিয়া, মিসর, ইয়েমেন, লিবিয়া প্রভৃতি দেশে যে গণবিস্ফোফন ঘটে চলেছে, তার পেছনেও দ্রব্যমূল্য বিশেষত খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি একটা ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ সময় মানুষের আয়-উপার্জনের একটা বড় অংশই খাদ্য কিনতে বেরিয়ে যাচ্ছে। খাওয়া খরচ যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে ৭, যুক্তরাজ্য ৯ ও অস্ট্রেলিয়ায় ১১ শতাংশ সে ক্ষেত্রে একই খাতে পাকিস্তানে ৪৬, ইন্দোনেশিয়ায় ৪৩, মিসরে ৩৮, তিউনিসিয়ায় ৩৬, ভারতে ৩৫, বেলারুশে ৪৩, কেনিয়ায় ৪৫, নাইজেরিয়ায় ৪০, রাশিয়ায় ২৮, চীনে ৩৩, ব্রাজিলে ২৫ ও মেঙ্েিকায় ২৪ শতাংশ পারিবারিক রোজগার ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। সংসার চালাতে সব দেশের স্বল্পবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ হাবশে উঠেছে বা হিমশিম খাচ্ছে। সেই সঙ্গে বেকারত্বের অভিশাপ এবং মন্দার অভিঘাত তো আছেই। (তথ্য সূত্র : টাইম ম্যাগানিজ, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১১ সংখ্যা) বাণিজ্য উদারিকরণ এবং বিশ্বায়নের ফলশ্রুতি যে বিশ্ব সমৃদ্ধি, তার অপর পিঠেই লেখা রয়েছে ক্ষুধার ইতিবৃত্ত। ১৯৯৫ সালে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৮০ কেটি (৮০০ মিলিয়ন), ২০০৫ সালে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়াল ৮৫ কোটিতে (৮৫০ মিলিয়ন)। প্রতি বছর ৫০ লাখ করে বেড়েছে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা। একই হারে বেড়ে থাকলে ২০১০ সালে পৃথিবীতে খাদ্য সংকটকবলিত ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা আরো ২.৫০ (আড়াই) কোটি বেড়ে ৮৭.৫০ (সাড়ে সাতাশি) কোটিতে উপনীত হওয়ার কথা। এসবই সরকারি পরিসংখ্যান। বেসরকারি হিসাবে বিশ্বে এখন ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা শত কোটি ছুঁই ছুঁই অথবা ছাড়িয়ে গেছে। তার মানে পৃথিবীর প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ মানুষই ক্ষুধার্ত, যাদের ভরপেট খাওয়া জোটে না। খাদ্য আমদানি করতে দরিদ্র দেশগুলো হিশশিম খাচ্ছে। ১৪৯টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে ১০৫টি দেশ, খাদ্য আমদানি করছে। পৃথিবীর খাদ্য আমদানিকারক দেশের তালিকায় অর্ধেকজুড়ে রয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের স্থিতাবস্থান। খাদ্য রপ্তানি মূল্য লাগাতারভাবে বাড়ছে। তার ফলে শ্রীলংকা, আইভরিকোস্ট এবং বাংলাদেশে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। তার মানে ২০ টাকা কেজি চাল ১০ বছরে ৩২ টাকা হয়েছে। এটাও পুরনো তথ্য। হালনাগাদ মূল্যস্ফীতি আরো বেশি। রপ্তানিকারকদের পোয়াবারো। তাদের মুনাফার পাহাড় স্ফীত হচ্ছে। বেশির ভাগ উন্নত দেশ এবং লাতিন আমেরিকার কিছু সংখ্যক রপ্তানিকারক দেশ খাদ্য বাণিজ্যে প্রচুর মুনাফা লুটছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০৮ সালে ১০১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের খাদ্য রপ্তানি করে রেকর্ড করেছে। ২০০৭ সারের চেয়ে তাদের রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ২৭ শতাংশ। ২০০৮ সালের মার্চ মাসে নিউইয়র্ক টাইমসে এ তথ্য প্রকাশিত হয়।
'আরচার ডানিয়েল মিডল্যান্ড' (এডিএম) যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহৎ খাদ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। ২০০৭ সালে তাদের মুনাফা বৃদ্ধি পায় ৬৭ শতাংশ। রেকর্ড সৃষ্টিকারী এই মুনাফার আর্থিক মূল্য ছিল ২.২ (দুই দশমিক দুই) বিলিয়ন ডলার। খাদ্যমূল্যের পাশাপাশি সারের দামও হু হু করে বেড়ে ২০০৭ সালে দ্বিগুণ হয়। বীজ এবং কীটনাশক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও দেদার মুনাফা লুটে নিচ্ছে। সারা দুনিয়ায় শস্যবীজের একচেটিয়া ব্যবসা করছে 'মানসান্টো'। ২০০৩ সালে তাদের ২৩ লাখ মার্কিন ডলার লোকসান হয়েছিল। ২০০৭ সালে একচোটেই তারা এক বিলিয়ন ডলার মুনাফা লুটে নেয়। ২০০৬ সালের তুলনায় সেবার তাদের মুনাফা বেড়েছিল ৪৪ শতাংশ। কীটনাশক ব্যবসার সবচেয়ে বড় বিশ্বমহাজন 'সিনজেনটিয়া'। বীজের বাণিজ্যে তারা তৃতীয় সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান। ২০০৭ সালে তাদের মুনাফা বেড়েছিল আগের চেয়ে ৭৫ ভাগ বেশি_অর্থমূল্যে ১.১ (এক দশমিক এক) বিলিয়ন ডলার। ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নেমে আসে মহামন্দা। সেই সঙ্গে সারাবিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শেয়ারবাজারে ধস নামতে শুরু করে। কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ। এর মধ্যেও পৃথিবীর সব দেশেই অসাধু কিছু লোক আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঘোষণা দিয়েছে ২০১০ সালের জুলাই মাসে এসে মন্দা থেমে গেছে। সত্যি সত্যি বিশ্বমন্দা থেমে গিয়ে থাকলেও গরিব দেশে এর সুফল পেঁৗছাতে আরো তিন বছর লাগবে।
খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ অনেক। সেগুলো নিয়ে আলোচনার যথার্থ ক্ষেত্র এটা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা সর্বজনবিদিত। সেই সঙ্গে আর একটা বিষয় শুধু জুড়তে চাই। বিশ্বব্যাংকের একটা গোপন প্রতিবেদনের কথা লন্ডনের গার্ডিয়ান ফাঁস করেছিল (বাংলাদেশের ইংরেজি 'ডেইলি স্টার', ১ মে, ২০০৮)। সেই গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, 'বায়োফুয়েল'-এর কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যমূল্য ৭৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। তার ফলে ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে গেছে। খাদ্য অধিকার বিষয়ে কার্যরত জাতিসংঘের একজন স্বাধীন বিশ্লেষকের নাম 'জিন জিগলার'। তিনি মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে খাদ্যশস্য থেকে 'বায়োফুয়েল' নামের তথাকথিত পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনকে 'ক্রাইম অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি' বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

No comments

Powered by Blogger.