মেট্রোরেল প্রকল্পও পিছিয়ে গেল-ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করেনি জাইকা

রাজধানীর বহুল প্রত্যাশিত মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করেনি জাইকা। ফলে পিছিয়ে গেল মেট্রোরেল প্রকল্পও। পদ্মা সেতুর পর এটি ছিল সরকারের বড় প্রকল্পগুলোর অন্যতম। ১৮ এপ্রিল জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) বোর্ড সভায় ১৮০ কোটি ডলারের এই ঋণপ্রস্তাবটি অনুমোদন লাভে ব্যর্থ হয়।


তবে সরকার আশা করছে, ঢাকার প্রস্তাবিত রেল অবকাঠামো প্রকল্পটিতে আর্থিক অনুমোদন দেবে জাইকা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, জাপানের উপপ্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ঢাকা সফরের সময় মেট্রোরেল প্রকল্পে দ্রুত অর্থ ছাড়ের অনুরোধ জানানো হবে। দুই দিনের সফরে আগামী ৩ মে ঢাকায় আসছেন জাপানের উপপ্রধানমন্ত্রী কাতসুইয়া ওকাদা।
পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং জাপানের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মেট্রোরেল করার ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে পুরোপুরি আস্থা পাচ্ছে না জাইকা। তাই সংস্থার সর্বশেষ বোর্ড সভায় মেট্রোরেলের আর্থিক অনুমোদন দেওয়া হয়নি। জাপানে অর্থবছর শুরু হয় এপ্রিলে। এবারকার বৈঠকে প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়ায় এখন এটি আগামী অর্থবছর পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে আগামী বছরের মাঝামাঝিতে সরকার মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ শুরুর যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।
জানতে চাইলে জাপানে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জীবন রঞ্জন মজুমদার গত রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত মঙ্গলবার জাইকার পরিচালক ইথিগুতির সঙ্গে বৈঠকে মেট্রোরেল প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছি। জাইকা এ প্রকল্পের কারিগরি দিক নিয়ে ফের সমীক্ষা চালানোর কথা জানিয়েছে। এ ব্যাপারে আগামী ২৮ এপ্রিল জাইকার সঙ্গে আবার বৈঠক হবে।’ কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রকল্পটি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে জাইকার আলোচনা চলছে।
জাইকার অসন্তুষ্টি: ঋণপ্রস্তাব বোর্ড সভায় অনুমোদনের পর এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে জাইকার ঋণ চুক্তি সই করার কথা ছিল। চুক্তি সইয়ের আগে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের শর্ত দিয়েছিল জাইকা। এ ছাড়া জাইকা মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য ঢাকা গণপরিবহন কোম্পানি (ডিএমটিসি) গঠনের প্রস্তাব করেছিল। পাশাপাশি ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ডকে (ডিটিসিবি) শক্তিশালী করে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) করারও শর্ত ছিল। বর্তমানে ডিটিসিবিতে প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও নির্বাহী মিলে আট-দশজন এবং কর্মচারী মিলে ৫০ জনের মতো। এত কম জনবল নিয়ে মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়—এই ভেবেও জাইকা ‘ধীরে চলো নীতি’ নিয়েছে বলে ডিটিসিবি সূত্র জানিয়েছে। ডিটিসিবিতে ৭০ জন কর্মকর্তাসহ আড়াই শ জনবলকাঠামোর কথা বলা হয়েছে।
বিমানবাহিনীর আপত্তির কারণে মেট্রোরেলের পথ বিজয় সরণির বদলে সংসদ ভবনের পাশ ঘেঁষে ঠিক করা হয়েছে। পথ পরিবর্তন নিয়েও জাইকা অখুশি ছিল।
প্রকল্পের আদ্যোপান্ত: রাজধানীর যানজট কমাতে সরকার গত বছর মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। গত বছর সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে জাইকাকে এ প্রকল্পে অর্থায়নের অনুরোধ জানায় সরকার।
এর আগে জাইকা মেট্রোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করে। জাইকার সমীক্ষায় বলা হয়েছে, মেট্রোরেল নির্মাণের পর এর মাধ্যমে ঘণ্টায় গড়ে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। উত্তরা থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত ২১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পথে স্টেশন থাকবে ১৬টি।
ঢাকার নতুন রেল অবকাঠামো তৈরির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ১৮০ কোটি ডলার ঋণ হিসেবে দেবে জাইকা। বাকি টাকা জোগাবে সরকার। জাইকার ঋণে সুদের হার হবে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য এক শতাংশ। এ ঋণ ৪০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে অতিরিক্ত সময় (গ্রেস পিরিয়ড) থাকবে ১০ বছর।
উপপ্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে প্রত্যাশা: জাপানের উপপ্রধানমন্ত্রী কাতসুইয়া ওকাদা ঢাকা সফরের সময় মেট্রোরেলে দ্রুত অর্থায়নের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দুই আলোচনাতেই গুরুত্ব পাবে মেট্রোরেল প্রসঙ্গটি। এ ছাড়া পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন, বাণিজ্য বিনিয়োগ পরিবেশসহ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।

No comments

Powered by Blogger.