মানবাধিকার-গণবিরোধী ভূমিকায় পুলিশ! by শেখ হাফিজুর রহমান

পুলিশের বুটের তলায় পিষ্ট হয়েছেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান খুদে চাকুরে ইউসুফ আলী। ইউসুফ আলীর সঙ্গে সঙ্গে কি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সভ্যতাও দলিত-মথিত ও পিষ্ট হয়নি? নির্যাতিত ইউসুফ আলীকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত কোন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করলেন? কিছুদিন আগে পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আবদুল কাদেরকে ছিনতাইকারী সন্দেহে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গিয়েছিল।


সেখানে খিলগাঁও থানার ওসি চাপাতি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছিলেন কাদেরের শরীর। কাদের নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। ফিরে এসেছেন স্বজন ও বন্ধুদের মাঝে। শুরু করেছেন পড়াশোনা। তার শরীরের ক্ষত শুকিয়ে যাবে। কিন্তু মনে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তা কি সহজে শুকিয়ে যাবে?
ঢাকার উপকণ্ঠে আমিনবাজার-সংলগ্ন বড়দেশী গ্রামে পুলিশের সামনে শত শত গ্রামবাসী এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ছয়জন ছাত্রকে ডাকাত সন্দেহে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলল। কয়েক দিন আগে পুলিশের তদন্ত কমিটি বলেছে যে ওই ছাত্ররা ডাকাতি করতে গিয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। পুলিশের দায়িত্বহীনতার কথাও তদন্ত কমিটি স্বীকার করেছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট, পুলিশের দায়িত্বহীনতার স্বীকারোক্তি—কোনো কিছুই যারা চলে গেছে, তাদের আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না। স্বজনহারা মানুষ ও সন্তানহারা মাকে বুকের মধ্যে অথই শূন্যতা নিয়েই কাটাতে হবে বাকিটা জীবন। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে যা হয়েছিল, তাকে প্রাগৈতিহাসিক বর্বরতা বললেও কম বলা হয়। প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর, পুলিশের প্ররোচনায় পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে নির্মমভাবে হত্যার পর ১৬ বছরের কিশোর শামসুদ্দিন মিলনকে আবার পুলিশ ভ্যানে তুলে দেওয়া হয়। কি নির্মম, নিষ্ঠুর আর সাংঘাতিক! পুলিশের নিষ্ঠুরতা থেকে এ পর্যন্ত কেউ রেহাই পেয়েছে কি? যে বড় দুটি রাজনৈতিক দল পালাক্রমে ক্ষমতায় যাচ্ছে, তাদের নেতা-নেত্রীরাও কি রেহাই পেয়েছেন?
ওপরে যে ঘটনাগুলো উল্লেখ করলাম, সেগুলো হচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন এক রাষ্ট্রীয় ব্যাধির পৌনঃপুনিক প্রকাশ। রাষ্ট্রীয় এই ব্যাধির শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। রোগের কারণগুলো উৎপাটিত না করে রোগের বিস্তার ও ফলাফল নিয়ে কথা বললে লাভ হবে না। বাংলাদেশের বিদ্যমান পুলিশি ব্যবস্থাকে সংস্কার না করে শুধু পুলিশকে গালাগাল দিয়ে কাজের কাজ হবে না।
প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার এমন এক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়, যে পুলিশ বাহিনী সব আন্দোলন ও বিপ্লব দমন করে ব্রিটিশ-রাজকে নিরাপদ রাখবে। ব্রিটিশ কাঠামো ও ব্রিটিশ-রাজ প্রণীত আইনে পুলিশের ভূমিকা ছিল শাসকবান্ধব। বিপ্লবী, আন্দোলনকারী ও জনগণকে নির্যাতন করাই ছিল ব্রিটিশ আইন-নির্ধারিত পুলিশের ভূমিকা। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, নির্যাতক চরিত্রের এই পুলিশকেই কিন্তু আমরা এখনো রেখে দিয়েছি। পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের উদ্দেশ্যে এখানে কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলো:
প্রথমত, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও কমিয়ে আনার মতো পেশাগত বিষয়ে নজর না দিয়ে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন অনেক বেশি মনোযোগ দিয়েছে পুলিশের পাহারাদারি কর্মকাণ্ডের ওপর। আমাদের একটি নতুন পুলিশ আইন প্রয়োজন, যে আইন পুলিশের পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা, আধুনিক পুলিশি ব্যবস্থাপনা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক জননিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব প্রদান করবে। এই আইন পুলিশ বাহিনীকে একটি গণবান্ধব ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলবে, যে প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখবে জনতা ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত পরামর্শক কমিটি। (মুহম্মদ নুরুল হুদা, ডেইলি স্টার, ২৯ জুলাই, ২০০৬)
দ্বিতীয়ত, নিম্ন সারির পুলিশ কর্মকর্তা, নায়েক, সুবেদার ও কনস্টেবলরা পুলিশ বাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। কিন্তু তাদের শিক্ষাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতায় ঘাটতি থাকায় তারা জনগণের সঙ্গে এমন ব্যবহার করে যে তাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার অভাবে পুলিশ বাহিনীর অনেকেই জানে না যে তারা রাষ্ট্রের ভৃত্য, তাদের কাজ হচ্ছে জনগণকে সেবা দেওয়া। পুলিশ সদস্যদের এমন প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা জনগণের বন্ধু হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, পুলিশের কর্মকর্তারা অপরাধ দমন ও অপরাধ তদন্তের জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। জেলা পুলিশ স্টেশনের একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে প্রতি মাসে গড়ে ৭ দশমিক ৫টি মামলা তদন্ত করতে হয়, থানা পুলিশ স্টেশনের সাব-ইন্সপেক্টরকে করতে হয় চারটি। মেট্রোপলিটন শহরের পুলিশ ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ সময় ব্যয় করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার জন্য, ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ সময় ব্যয় করে ভিআইপিদের নিরাপত্তার জন্য এবং ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ সময় ব্যয় করে অপরাধমূলক মামলার জন্য। (পুলিশ স্টেশনের ওপর কার্যপ্রণালিপত্র, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, ৪ মার্চ, ২০০৪) প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, অপরাধ তদন্ত, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ তথা সার্বিক জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যে সময় পুলিশের প্রয়োজন, সেই সময় তারা পাচ্ছে না। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে আমরা মনে করি।
চতুর্থত, কেউ যেন পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে না পারে। পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করায় পুলিশের মধ্যে পেশাদারিত্ব গড়ে উঠতে পারেনি।
আধুনিক কোনো রাষ্ট্র পুলিশ বাহিনী ছাড়া কল্পনা করা যায় না। তবে সেই পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যদি হয় অমানুষ, বর্বর ও নির্যাতক, তাহলে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তাদের কেন পুষতে হবে? দিনবদলের রূপকল্প প্রদানকারী সরকার পুলিশ বাহিনীর সংস্কারে ওপরে উপস্থাপিত সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা রইল।
পাদটীকা: সভ্য ও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন যেকোনো মানুষই বুঝতে পারবেন যে জনবান্ধব ও ‘সার্ভিস ওরিয়েন্টেড’ পুলিশ বাহিনী ছাড়া গণতন্ত্র যেমন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পাবে না, তেমনি বিশ্বদরবারে সভ্য জাতির স্বীকৃতিও হবে সুদূর পরাহত। আর ভ্রাম্যমাণ আদালতকে অবশ্যই আমলা ম্যাজিস্ট্রেটদের কবল থেকে মুক্ত করে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদের পরিচালনায় নিয়ে আসতে হবে।
শেখ হাফিজুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.