সম্প্রচার নীতিমালা-নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে আস্থা রাখুন by ফরিদ হোসেন

এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই যখন তথ্য অধিকার আইনটি সংসদে পাস করল, তখন আমরা সাধুবাদ জানিয়েছিলাম। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার তখন বেশ সাহস দেখিয়েছিল। এই আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্য তথ্য প্রাপ্তির অধিকারকে প্রথমবারের মতো আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হলো।


বড় কথা হলো, কোনো নাগরিক তথ্য চাইলে তাকে সেই তথ্য দিতে সরকারি, আধাসরকারি, এমনকি কতিপয় বেসরকারি সংস্থাও আইনগত বাধ্য এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তথ্য দিতে ব্যর্থ হলে শাস্তির বিধানও তথ্য অধিকার আইনে রাখা হয়েছে।
তথ্য অধিকার আইনের মূলকথা হলো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। সুশাসনের জন্য সরকারকে স্বচ্ছ হতে হবে। যদিও আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে গোপনীয়তার সংস্কৃতি প্রবল। নাগরিকের কাছ থেকে তথ্য গোপন রাখার সংস্কৃতি সেই ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই চলে আসছে। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অঙ্গীকার নিয়ে তথ্য অধিকার আইনটি পাস করল, তখন সরকারের প্রশংসা পাওনা ছিল এবং আমরা তা করেছি।
সেটা ছিল ২০০৯ সালের কথা। দুই বছর পার হতে না হতেই আমরা সরকারের নীতি ও কাজের মধ্যে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করছি। সেই একই সরকার যখন জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিল, তখন আমরা তাকে সাধুবাদ জানাতে পারছি না। এই নীতিমালা এখনো খসড়া পর্যায়ে আছে। খসড়া নীতিমালাটি সংসদের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর পর সেখান থেকে বিভিন্ন সূত্রে তা সাংবাদিকেরা জানতে পারেন। জানাজানি হওয়ার পর থেকেই খসড়া নীতিমালা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন মত প্রকাশে বিশ্বাসী সব মহলের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে। প্রশ্ন উঠেছে, যে সরকার তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তথ্য অধিকার আইন পাস করল, আবার সেই সরকারই কেন এমন একটি নীতিমালা তৈরি করতে যাচ্ছে, যার ফলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে? এমন কথাও বলা হচ্ছে যে এটা কোনো নীতিমালা নয়। আসলে এটা হবে একটি নিয়ন্ত্রণমালা।
জাতীয় সম্প্রচার নীতির লক্ষ্য মূলত বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও। দেখতে দেখতে বাংলাদেশে অনেকগুলো বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন ও শর্টওয়েভ রেডিও চালু হয়েছে। সরকারের উদার নীতির কল্যাণে আরও কয়েকটি টেলিভিশন কেন্দ্র পূর্ণাঙ্গ চালু হওয়ার অপেক্ষায়। বেসরকারি খাতে টেলিভিশন চালু করে সরকার-নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের একক আধিপত্য ভাঙার কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন শেখ হাসিনা। তাঁর প্রথম সরকারের আমলেই দেশে প্রথম টেরিস্ট্রিয়াল টেলিভিশন, একুশে টেলিভিশন বা ইটিভি চালু হয়। এরপর চারদলীয় জোট সরকার ইটিভি বন্ধ করে দিলেও বেসরকারি মালিকানায় আরও কয়েকটি টেলিভিশন কেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়। নতুন চ্যানেলগুলোর মধ্যে সিএসবি টেলিভিশন এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জরুরি আইনের সময় বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর জোট সরকারের সময় লাইসেন্সপ্রাপ্ত আরেকটি টেলিভিশন স্টেশন চ্যানেল ওয়ানও বন্ধ হয়ে যায়। নতুন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সরকার ও সরকারি দলের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিএনপি সরকারের সময় থেকে চলে আসা এই নীতি এখনো অব্যাহত আছে। দলীয় ব্যবসায়ীদের হাতে টেলিভিশন কেন্দ্র থাকলে সরকার অনেকটাই নিরাপদে থাকবে, এমন চিন্তা থেকেই রাজনৈতিক বিবেচনায় টেলিভিশন কেন্দ্র করার অনুমতি দেওয়া হয়। পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে নতুন বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশনগুলোও সমালোচনার সম্মুখীন হয়। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে এই সমালোচনা আরও তীব্র হয় ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের বিডিআর বিদ্রোহ ও বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, সেই সময় বেসরকারি চ্যানেলগুলোর বেশির ভাগই সংবাদ পরিবেশনে ও টক শোগুলোতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়। সদ্য ক্ষমতায় আসা সরকার তখন এই বিদ্রোহের আঘাতে অনেকটাই দিশেহারা। সাম্প্রতিককালে অধিকাংশ চ্যানেলের প্রতি সরকারের অসন্তুষ্টি আরও বেড়েছে।
মূলত এই উপলব্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে সরকার জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। বর্তমান সরকারই যে এ ধরনের উদ্যোগ প্রথম নিল, তা নয়। আমার মনে আছে, বিএনপি-জামায়াতের সরকারও এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতিবাদের মুখে সেই উদ্যোগ ভেস্তে গেছে।
জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা তৈরির সর্বশেষ উদ্যোগও ভেস্তে যেতে পারে। তথ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ইতিমধ্যেই তথ্য মন্ত্রণালয় প্রণীত খসড়াটি প্রত্যাখ্যান করেছে। স্থায়ী কমিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা হতে হবে তথ্য অধিকার আইন ও সংবিধানে প্রদত্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতার আলোকে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত তথ্য মন্ত্রণালয় মেনে নিয়েছে। তা নিতেই হবে। কারণ, নীতিমালার খসড়া তৈরিতে তথ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই যে ভুলগুলো করেছে, এখন সেগুলো সংশোধনের সুযোগ পাবে।
ভুলগুলো কী ছিল? এই খসড়া তৈরির আগেই তথ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল এই নীতিমালা যাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা। শুধু বেসরকারি সম্প্রচার কেন্দ্রগুলোর সঙ্গেই নয়, আলোচনার পরিধি আরও বৃদ্ধি করে সম্পাদক, সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা ও সুশীল সমাজের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। আরও উত্তম হতো যদি সরকার এই নীতিমালা প্রণয়নে আমলানির্ভর না হতো। যা করা প্রয়োজন তা হলো, প্রথমেই একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন জাতীয় সম্প্রচার কমিশন গঠন। সেই কমিশনের দায়িত্ব হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি নীতিমালা তৈরি করা। স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে কোনো নীতি বা নীতিমালা প্রণীত হলে সরকারের ওপর আমাদের আস্থা বাড়বে বই কমবে না।
খসড়া নীতিমালায় এখানে এমন কিছু প্রস্তাব এসেছে, যা আমাদের পেছনে টেনে নেবে। আমাদের কথা বলার স্বাধীনতাকে খর্ব করবে। খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব নষ্ট হতে পারে এমন কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করা যাবে না। এটা কি কোনো যুক্তিসংগত প্রস্তাব হলো? ধরা যাক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্কের কথা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘের ৬৬তম সাধারণ অধিবেশনে ভাষণে বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগে তার দেশ ভেটো দেবে। বাংলাদেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে। আমাদের জনগণ ও গণমাধ্যম ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ডের পক্ষে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে যে অবস্থান নিয়েছে তার সমালোচনা আমাদের গণমাধ্যম অবশ্যই করবে। এ ধরনের সমালোচনা করা কি অন্যায় হবে? আমরা কি তা করতে পারব না? প্রসঙ্গটি হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু হাস্যকর কোনো উদ্যোগ যদি কোনো সরকার নেয়, আমরা কী করতে পারি?
আগেও যেমন বলেছি, এখনো বলছি বেসরকারি টিভি চ্যানেল বা রেডিও যে ভুল করে না, তা নয়। এখানে পেশাগত অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতা দেখা যায়। পেশার নীতিমালা কখনো কখনো ভঙ্গ হয়। বস্তুনিষ্ঠতার ক্ষেত্রেও ঘাটতি দেখা যায় না কখনো, তা নয়।
তবে, এই ধরনের ভুলত্রুটি বা ব্যত্যয়ের কারণে কোনো চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। সরকারকে মনে রাখতে হবে, যারা ভুল করে তারা তাদের দর্শক, শ্রোতাদের দ্বারা সমালোচিত হয়। তারা নিজেরা ভুল সংশোধনের চেষ্টা করে।
কাজেই চ্যানেলগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে তাদের ওপর আস্থা রাখাটা জরুরি। পারস্পরিক এই আস্থা গড়ে উঠলে আমরা একটি সুস্থ, রুচিসম্মত সম্প্রচারমাধ্যম গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যেতে পারব। এ ক্ষেত্রে সবাইকে, বিশেষ করে, সরকারকে আরও সহনশীল হতে হবে।
ফরিদ হোসেন: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ঢাকা ব্যুরোপ্রধান।

No comments

Powered by Blogger.