জাতিসংঘে ওবামা-ফিলিস্তিন: আবু মাজেনের শেষ জুয়ার দান by ইউরি আভনেরি

দারুণ এক বক্তৃতা, সুন্দর সব কথা। ভাষায় ফুটে উঠছিল সব। ভঙ্গি ছিল অভিজাত। যুক্তিগুলো পরিষ্কার ও প্রভাবশালী। উচ্চারণও নির্ভুল। বক্তৃতা হিসেবে সেরা অথচ কী নিকৃষ্ট স্বার্থপরতা। যেন শিল্প কিন্তু শিল্পটা মিথ্যার। তাঁর বলা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল নিয়ে প্রতিটি কথাই ছিল ডাহা মিথ্যা: বক্তা নিজেও তা জানেন, শ্রোতারাও বোঝেন।


নীতিবান হতেন যদি, তিনি জানতেন, আগামীবার নির্বাচিত হতে হলে তাঁকে এটাই করতে হবে। আরেকবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাধে আমেরিকার জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিলেন। কাজটা ভালো হলো না, কিন্তু এটাই তো রাজনীতি, তাই না?
ওবামা দুই পক্ষকে এমনভাবে দেখিয়েছেন যেন তারা সমান প্রতিপক্ষ—ইসরায়েলি আর ফিলিস্তিনি, ফিলিস্তিনি আর ইসরায়েলি। কিন্তু দুজনের মধ্যে ইসরায়েলিরাই, একমাত্র ইসরায়েলিরাই—বেশি দুর্ভোগ সয়েছে এবং সইতে হচ্ছে। শাস্তি পেয়েছে, নির্বাসিত হয়েছে এবং হয়েছে হলোকস্টের হত্যাযজ্ঞের শিকার। ইসরায়েলি শিশুরা বেড়ে ওঠে রকেট-হুমকির মধ্যে। তাদের ঘিরে আছে আরব শিশুদের ঘৃণা। হায় রে!
তাঁর লম্বাচওড়া বক্তৃতায় ইসরায়েলি জবরদখলি বসতির কথা নেই, নেই জুন, ১৯৬৭ সালের সীমান্ত। নেই ফিলিস্তিনিদের দেশ-হারানো নাকবা দিবসের কথা। যেন কোনো ফিলিস্তিনি শিশু খুন হয়নি বা বেড়ে ওঠেনি ভয়ংকর ভয়ের পরিবেশে। ওবামার মুখ দিয়ে সেদিন কথা বলেছে ডানপন্থী ইসরায়েলি প্রচারণা-মেশিন। সেই যুক্তি, সেই ভাষা, সেই আখ্যান, সেই সংগীত।
ফিলিস্তিনিদের অবশ্যই একটা রাষ্ট্র থাকা উচিত ছিল। আলবত, আলবত। কিন্তু তাদের এত অস্থির হলে চলবে না। কী দরকার জাতিসংঘকে বিব্রত করার? তাদের জাতিসংঘে আসা উচিত হয়নি। বিবেচনাসম্পন্ন মানুষের মতো তাদের ইসরায়েলিদের সঙ্গেই আলোচনায় বসা উচিত ছিল, তাদের সঙ্গেই মিটমাট করার দরকার ছিল। বিবেচক ভেড়ার উচিত ছিল বিবেচক নেকড়ের সঙ্গে বসে রাতের খাবার কী হবে, সেটা ঠিক করা! বাইরের কারও উচিত নয় সেখানে হস্তক্ষেপ করা। যদি নেকড়ে ভেড়াকে খেয়েও ফেলে, সেটা তাদের ব্যাপার।
চূড়ান্ত সেবাই দিলেন ওবামা। সাধারণত এ ধরনের সেবার জন্য অগ্রিম বেতন দেওয়া হয়। ওবামা এক ঘণ্টার মধ্যেই তা পেলেনও। ক্যামেরার সামনে ওবামার পাশে বসে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট বিস্তর প্রশংসা করলেন তাঁর। এত প্রশংসা কয়েক নির্বাচনের প্রচারেও ফুরানোর নয়। এই ঘটনার ট্র্যাজিক বীর হলেন মাহমুদ আব্বাস। ট্র্যাজিক হলেও তিনিই বীর।
অনেকেই হতবাক হয়ে গেছেন যে এ কোন মাহমুদ আব্বাস? ইসরায়েল-ভীত সেই ব্যক্তিটি কোন সাহসে শক্তিমান আমেরিকাকে মোকাবিলার জন্য উঠে দাঁড়ালেন? অ্যারিয়েল শ্যারন যদি কোমা থেকে উঠে এ ঘটনা দেখতেন, তাহলে ঘটনার অভিনবতা দেখে সঙ্গে সঙ্গে মূর্ছা যেতেন। তিনিই তো বলেছিলেন, মাহমুদ আব্বাস এক ‘চামড়া-ছেলা মুরগি’।
তাহলেও সত্য যে কয়েক দিন ধরে আব্বাসই ছিলেন বৈশ্বিক মনোযোগের নিশানায়। তাঁকে কীভাবে সামলাবেন তা ভেবে বিশ্বনেতারা হয়রান হয়ে যাচ্ছিলেন। বিশ্লেষকেরা পেরেশান হয়ে যাচ্ছিলেন যে কী হবে তাঁর পরের পদক্ষেপ? জাতিসংঘে তাঁর বক্তৃতাকে এমন ‘অ্যাকশন’ ভাবা হচ্ছিল, যা সৃষ্টি করবে উত্তেজনা। মুরগির জন্য এটা কম কী? বিশেষ করে, যার আছে গা-ভরা পালক?
বিশ্বের মঞ্চে নেতা হিসেবে তাঁর এই উত্থান মনে করিয়ে দেয় মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের কথা। মিসরের জাতীয় নায়ক গামাল আবদেল নাসের হঠাৎ মারা গেলেন, মাত্র ৫২ বছর বয়সে। তাঁর দায়িত্ব নিলেন সাদাত। কিন্তু রাজনীতি-বিশেষজ্ঞরা ভ্রু কুঁচকালেন। তখন মিসরের শাসকদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। রগড় আর রগড়বাজের দেশ মিসরে তাঁকে নিয়ে অঢেল কৌতুক তৈরি হলো। তিনিই হঠাৎ ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেন এবং যা করলেন তা এক ইতিহাস। এই ‘পাত্তাহীন’ মানুষটা যুদ্ধ চলা অবস্থায় সোজা শত্রুরাষ্ট্রের রাজধানীতে হাজির হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করলেন।
ইয়াসির আরাফাতের অধীনে আব্বাসও সাদাতের মতোই তুচ্ছ ছিলেন। আব্বাস ছিলেন আরাফাতের চার-পাঁচজন উত্তরাধিকারের একজন। স্ত্রী-সন্তানদের সামনে ইসরায়েলি কমান্ডোরা হত্যা না করলে আবু জিহাদই হতেন আরাফাতের উত্তরসূরি। আরেক সম্ভাব্য উত্তরসূরিকে হত্যা করে ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসীরা। এভাবে আবু মাজেন (আব্বাসের রাজনৈতিক নাম) হয়ে উঠলেন সুযোগের বাছাই। বড় নেতার ছায়াতলে ঢাকা পড়া এ ধরনের নেতারা হয় আজীবন নম্বর দুই হয়ে থাকেন, অথবা হয়ে ওঠেন বিস্ময়কর নতুন নেতা। বাইবেলে দুই রকম উদাহরণ মেলে। রাজা সুলাইমানের পুত্র রেহোবোয়াম। তিনি তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, বাবা শাস্তি দিতেন চাবুক দিয়ে, আমি দেব কাঁকড়ার কামড় দিয়ে। অন্য ধরনটির নজির হলেন হজরত মুসার উত্তরাধিকার জোসুয়া। তিনি দ্বিতীয় মুসা ছিলেন না, কিন্তু নিজের যোগ্যতাবলে হয়ে উঠেছিলেন বিরাট বিজেতা।
আধুনিক ইতিহাসে দুই রকম নজির আছে। চার্চিলের পর দায়িত্ব নেন অ্যান্থনি ইডেন। চার্চিলের সমকক্ষ হয়ে ওঠার ইচ্ছা ছিল তাঁর, কিন্তু সুয়েজ খাল নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে ব্রিটেনকে ডোবান। দ্বিতীয় ধরনের নেতা হলেন হ্যারি ট্রুম্যান। জবরদস্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদ আব্বাসকে দেখে প্রথম ধরনের নেতাই মনে হতো, যাঁরা অকাজের। হঠাৎ দেখা গেল তিনি আসলে দ্বিতীয় ধরনের নেতা, যাঁদের উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। নতুন অর্জিত সমীহের চোখে তাঁকে দেখছে বিশ্ব। কর্মজীবনের শেষে তিনি খেললেন বিরাট এক জুয়া।
কিন্তু জাতিসংঘে স্বাধীন ফিলিস্তিনের স্বীকৃতির দাবি নিয়ে দাঁড়ানো কি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ছিল? সাহসী তো বটেই, কিন্তু বিজ্ঞচিত ছিল কি? আমার উত্তর হলো: হ্যাঁ, তিনি সঠিক ছিলেন।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নকে আব্বাস আবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে পূর্ণভাবে তুলতে পেরেছেন। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় সবার মনোযোগ ছিল ফিলিস্তিনের দিকে। বিশ্বের রাষ্ট্রনেতা-নেত্রী, এমনকি বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত রেখেছেন।
যেকোনো জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের জন্য এটা এক মাহেন্দ্রক্ষণ। কূটনারা বলবে: ‘কিন্তু এ থেকে তারা কী পেল?’ ছিদ্রান্বেষীরা ভুল। জাতীয় আন্দোলন যখন আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়, যখন গণমাধ্যমে তাদের সমস্যা আলোচিত হয়, যখন বিশ্বের বিবেকবান মানুষেরা জেগে ওঠে, তখন সেই আন্দোলন আরও বৈধতা এবং আরও শক্তি অর্জন করে। এর সুবাদে দেশের ভেতর নৈতিক শক্তি বলবান হয়, আর সাফল্য চলে আসে আরও একধাপ কাছে।
দখলদারি ফিলিস্তিনিদের আড়াল করে। দখল, বসতি স্থাপন, জাতিগত শুদ্ধি ঘটতে থাকে সেই আড়ালের অন্ধকারে। কিন্তু নিপীড়িতেরই সবচেয়ে দরকার দিনের আলোয় নিজেদের দেখানো। আব্বাসের পদক্ষেপ সেই আলোটাই অর্জন করেছে, অন্তত কিছু সময়ের জন্য।
বারাক ওবামার শোচনীয় কার্যকলাপ পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার কফিনে আরেকটি পেরেক ঠুকল। এটা কেবল মানবতার বিরুদ্ধেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও অপরাধ। আরব বসন্ত হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবস্থান পোক্ত করার শেষ সুযোগ। কিছুটা ইতস্তত করার পর ওবামা সেটা বুঝতে পেরেছেন। তিনি মোবারককে চলে যেতে বলেছেন, লিবিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন গাদ্দাফির বিরুদ্ধে আর সিরিয়ায় আসাদের বিরুদ্ধে হল্লাচিল্লা করেছেন। তিনি জানেন, আরবের সমীহ অর্জন করা তাঁর দরকার এবং এর মাধ্যমে দুনিয়ার সম্মানও।
কিন্তু ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চিরতরে সেই সুযোগ বরবাদ করলেন। অসহায় ফিলিস্তিনিদের পিঠে ছুরি মারার অপরাধে কোনো ইজ্জতওয়ালা আরব তাঁকে ক্ষমা করতে পারবে না। আরব বিশ্বে ও মুসলিম দুনিয়ায় আমেরিকার যা কিছু অবস্থান ছিল, এক তুড়িতে সব উড়ে গেল। সবই করলেন আরেকবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার খায়েশে।
কিন্তু এটা ছিল ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও অপরাধ। ইসরায়েলেরও শান্তি দরকার। ইসরায়েলেরও দরকার আরবের ভেতরে ফিলিস্তিনি জনগণের পাশাপাশি বসবাসের পরিবেশ। পতনশীল আমেরিকার নিঃশর্ত সমর্থনের ওপর ভর করে ইসরায়েল বেশি দিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।
ওবামা এসব ভালো করেই জানেন। নেতানিয়াহু না জানতে পারেন, ওবামা জানেন ইসরায়েলের কিসে মঙ্গল। সব জেনেশুনেও তিনি গাড়ির চাবি তুলে দিলেন এক মাতাল চালকের হাতে।
একদিন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কায়েম হবেই। এ সপ্তাহের ঘটনাবলিই প্রমাণ, এটা অপ্রতিরোধ্য। ওবামাকে মানুষ ভুলে যাবে, নেতানিয়াহুও স্মৃতির অতলে চাপা পড়বেন। কিন্তু মাহমুদ আব্বাস—ফিলিস্তিনিরা যাঁকে ডাকে আবু মাজেন বলে, তাঁর নাম টিকে থাকবে। সেই ‘পালকহীন মুরগি’ উড়বে আকাশের অনেক উঁচুতে।
কাউন্টারপাঞ্চ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ
ইউরি আভনেরি: ইসরায়েলি লেখক এবং শান্তি আন্দোলন গুশ সালোমের নেতা।

No comments

Powered by Blogger.