স্মরণ-স্মৃতির আয়নায় শহীদ ময়েজউদ্দিন by আরহাম সিদ্দিকী

সম্ভবত ১৯৬৪ সালের দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে যোগদানের সময় আমার সঙ্গে মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিনের পরিচয় ঘটে প্রথমবারের মতো। পুরানা পল্টন চৌরাস্তায় বর্তমান ইব্রাহীম ম্যানসনের পেছনে ছিল ছোট সড়ক; সেই রাস্তার পাশেই ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ অফিস।


ষাট দশকের মধ্যভাগে সামরিক শাসক আইয়ুব খাঁর স্বৈরাচারী শাসন-জুলুমের রাজত্বে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কারাগারে, অন্য একাংশ জেল-জুলুমের ভয়ে পালিয়ে বেড়াত অর্থাৎ আন্ডারগ্রাউন্ডে। আওয়ামী লীগ অফিসে যাঁরা আসতেন, তাঁদের বেশির ভাগই অল্প সময়ের মধ্যে খোঁজখবর নিয়ে চলে যেতেন, কেউ বেশিক্ষণ থাকতে সাহসী হতেন না। সেই সব আতঙ্কের দিনে দলীয় কার্যালয়ে আমি ও বন্ধু মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন দীর্ঘ সময় কাটাতাম, দলীয় কর্মতৎপরতায় অংশ নিতাম।
আমরা উভয়েই ঢাকা জেলার অধিবাসী ছিলাম—ময়েজউদ্দিন কালীগঞ্জের (বর্তমানে গাজীপুর জেলাধীন) আর আমি কালিয়াকৈরের। ঢাকা জেলার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আমাদের দুজনের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্ত এবং আমাদের দুজনের অজ্ঞাতে এই জেলায় কোনো বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়া সম্ভব ছিল না। অবশ্যই জেলা আওয়ামী লীগে আরও নেতা ছিলেন। তার পরও আমার আর ময়েজউদ্দিনের সক্রিয় সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ ছাড়া ষাট দশকে, সত্তর দশকে ঢাকা জেলার আওয়ামী লীগের রাজনীতি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, সাফল্যের পথে কোনো আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল না।
বন্ধু ময়েজউদ্দিন বয়সে বছর খানেক ছোট ছিলেন। এখন বেঁচে থাকলে ৭২ বছর চলত তাঁর। আমরা একজন আরেকজনকে ‘বস’ সম্বোধন করতাম। ষাট দশকের মধ্যভাগে মুজিব ভাই (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) জেলের বাইরে থাকলে প্রায় প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা খেয়েই আমরা একজন আরেকজনকে টেলিফোন করতাম। প্রায় নিয়মিতভাবেই মুজিব ভাইয়ের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে হাজির হতাম। মাসে ২৫ দিন বা তারও বেশি দিন প্রতিদিন ময়েজউদ্দিন ও আমি মুজিব ভাইয়ের ধানমন্ডির বাড়িতে গিয়েছি দলীয় সাংগঠনিক কাজে।
আমাদের নেতা মুজিব ভাই (শেখ মুজিবুর রহমান) দলের সাংগঠনিক তৎপরতার ব্যাপারে কিছু নির্দেশ দিতেন। আমরা সেসব নির্দেশ পালনের জন্য প্রায়ই আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার মধ্যে বেরিয়ে পড়তাম দলীয় কর্মীদের বিভিন্ন আস্তানায় এবং দলীয় অফিসে তা পৌঁছে দিতাম। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের ছোট-মাঝারি নানা আকারের পরামর্শসভা করতাম আমরা। আমরা মুজিব ভাইয়ের নির্দেশে দলের অনেক লিফলেট, অনেক বক্তব্য, সাংগঠনিক পেপারওয়ার্ক ড্রাফট করতাম। আমি ও ময়েজউদ্দিন এসব কাজে খুবই সক্রিয় ছিলাম। কারণও ছিল। দুজনই আমরা লেখাপড়ায় ভালো ছিলাম এবং দুজনই আইনজীবী ছিলাম।
বন্ধু মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন নিজের ঢাকা জেলার লোকদের যে কারও যেকোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করতেন: বিশেষভাবে কালীগঞ্জের মানুষ হলে তো আর কথাই নেই। কালীগঞ্জের প্রায় প্রতিটি পরিবারের মানুষের সুখ-দুঃখের খবর তিনি রাখতেন। তাঁর সাধ্যমতো সব দুঃখ-কষ্টে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন।
আমাদের ষাট দশকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনপ্রিয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ এবং আবদুল মোমেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে আমাদের যথেষ্ট সৎ পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিতেন। ময়েজউদ্দিন এবং আমি তাঁদের খুবই ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকে বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছি। মুজিব ভাইয়ের নির্দেশেই তাজউদ্দীন সাহেবের পরিচালনায়, মোমেন সাহেবের পরামর্শে আমি ও মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়েছি।
মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন ছিলেন সত্যবাদী ও নিষ্ঠাবান, সরল, উদারচেতা; আবার অন্যদিকে নির্ভীক ও দুর্দান্ত সাহসী; সত্য উচ্চারণে; যথাসময়ে সৎ সাহসের ভূমিকা রাখতে তিনি ছিলেন নজিরবিহীন বলিষ্ঠ চরিত্রের।
ইতিহাসের পাঠকমাত্রই জানেন, ১৯৭১ সালে খন্দকার মোশতাক আহমেদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে সরিয়ে দিয়ে তাঁর জায়গা দখল এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রধান অবস্থানে এসে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর নেতৃত্বের সঙ্গে আপস করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে সরে এসে সবকিছু ভণ্ডুল করতে চেয়েছিল। খন্দকার মোশতাক দলের তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সভা আয়োজন করেন কলকাতার থিয়েটার রোডের মুজিবনগর সরকারের সচিবালয় ভবনের ছাদে। সেই সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের ভোটাভুটির জন্য ডিভিশন চাওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তখন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সত্তরের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন চিৎকার করে বক্তৃতা দিলেন, ‘কোনো ডিভিশন নয়, কিসের ডিভিশন, মুক্তিযুদ্ধে যেকোনো মূল্যে, দলের অবস্থান যা আছে তা-ই থাকবে, কোনো নতুন নেতৃত্বের প্রশ্নই ওঠে না।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে খুনিচক্র খন্দকার মোশতাককে ক্ষমতায় বসায়। এরপর মোশতাক সংসদ সদস্যদের সভা ডেকে ঘাতকদের সব অপকর্মের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই সভায়ও সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন সবাইকে হতবাক করে চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘খন্দকার মোশতাক আহমেদ অবৈধ প্রেসিডেন্ট, তার কোনো নেতৃত্ব মানি না, সে খুনি, ষড়যন্ত্রকারী। আওয়ামী লীগ তার কোনো কর্তৃত্ব মানতে পারে না।’
ময়েজউদ্দিনের এই ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৮৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিরোধী দলের হরতাল চলাকালে তাঁর নিজের এলাকা কালীগঞ্জে এরশাদের লেলিয়ে দেওয়া ঘাতকেরা ময়েজউদ্দিন আহমদকে হত্যা করে।
আরহাম সিদ্দিকী: আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা।

No comments

Powered by Blogger.