মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর জবাবদিহি কোথায়?-সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ যত শোনা যায়, বিচার ও শাস্তির কথা ততটা শোনা যায় না। সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগে দুর্নীতি জেঁকে বসার একটি প্রধান কারণ এই যে, দুর্নীতি করে পার পাওয়া যায়। দুর্নীতি যেখানে এক ধরনের অলিখিত নিয়ম বা রীতি হয়ে উঠেছে, সেখানে সাধারণ দুর্নীতির বিচার হওয়া অসাধারণ ঘটনা। ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশই থেকে যাচ্ছে।


বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস ও ১৯৮৯ সালের রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের পরিপত্র বলে, ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বা জামিন পাওয়া আসামি সরকারি কর্মচারীদের চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলাগুলো ফৌজদারি মামলা, তাই দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলার অভিযোগপত্রে নাম আছে এমন কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মামলা চলাকালে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখার সুযোগ নেই। কিন্তু এই পুরোনো বিধানটি বাস্তবে অকার্যকর। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, এই বিধানটি কোথাও মানা হচ্ছে না।
এর অর্থ, দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁদের অনৈতিক চর্চা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে কোনো রকমের বাধাই পাচ্ছেন না। আদালত থেকে জামিন নিয়ে নিজ নিজ দপ্তরে তাঁরা বহাল তবিয়তে কাজ করে চলেছেন। এ অবস্থা দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে উৎসাহব্যঞ্জক। সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, এ রকম পরিবেশে মানুষের মনে এমন ধারণার সৃষ্টি হয় যে অনিয়ম-দুর্নীতি করে পার পাওয়া যায়।
দুর্নীতিগ্রস্তদের সাজা না হলে দুর্নীতির বিস্তার রোধ করা যায় না। সরকারের পক্ষ থেকে যতই দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের কথা বলা হোক না কেন, বাস্তবে দুর্নীতির প্রসার চলতেই থাকে।
সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির মামলাসংক্রান্ত বিধানটি কার্যকর করার দায়িত্ব কার? বলাই বাহুল্য যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের। কিন্তু এত বছর ধরে তারা বিধানটি কার্যকর করছে না কেন? দুর্নীতি দমন কমিশনকে কেন এ জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে আবেদন-নিবেদন করতে হবে?
শুক্রবারের প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলাগুলোর অভিযোগপত্রে আছে, তাঁদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন করে এই নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন হলো কেন? মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো কি সার্ভিস রুল ও রাষ্ট্রপতির উল্লিখিত পরিপত্রের বিধানটি জানে না? মন্ত্রী ও সচিবদের কাছে প্রশ্ন তোলা উচিত, কেন দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়নি এবং হচ্ছে না? এ বিষয়ে তাঁদের জবাবদিহি কোথায়?
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশ প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যেন অবিলম্বে পালন করে, এটা নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের ব্যাপারে মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় পর্যায়ে কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানোর সুযোগ নেই, কারণ তার ফলে দুর্নীতির আরও প্রসার ঘটবে।

No comments

Powered by Blogger.