শ নি বা রে র বিশেষ প্রতিবেদন-‘হামালা’য় দিনবদল by হরি কিশোর চাকমা

উটকে বলা হয় মরুভূমির জাহাজ। মধ্যপ্রাচ্যে শৌখিন উটের মালিকেরা নানা নকশা করা কাপড় দিয়ে উট সাজান। অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা থেকে উটকে রক্ষা করতে বিশেষ কাপড় ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া উটের বাচ্চাকে মায়ের দুধ পুরোপুরি খেতে বাধা দিতে মা উটের দুধের বাঁট ঢেকে রাখতেও এ ধরনের কাপড় ব্যবহার করা হয়।


সংযুক্ত আরব আমিরাতে এসব কাপড় কোথাও ‘হামালা’ আবার কোথাও ‘আটাব’ নামে পরিচিত।
বেশ কয়েক বছর ধরে সেই হামালা বা আটাবের কাপড় তৈরি করছেন রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক আদিবাসী নারী। সেই হামালা যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ঝরনা খীসার নেতৃত্বে আদিবাসী নারীরা এই কাজ করছেন।
বেইন (কোমর-তাঁত) ব্যবহার করে এসব কাপড় তৈরি করা হচ্ছে। এ কাজ করে নগদ কিছু টাকার মুখ দেখছেন আদিবাসী এই নারীরা। এতে তাঁদের সংসারে যেমন সচ্ছলতা এসেছে, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশে তৈরি হামালার কাপড়ের বাজার সৃষ্টি হয়েছে।
যেভাবে শুরু: ২০০৮ সালে রাঙামাটি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেলে অনেকের সঙ্গে বেকার হয়ে পড়েন নারী শ্রমিক ঝরনা খীসা। তাঁর স্বামীও একই কারখানায় কাজ করতেন। একসঙ্গে দুজন বেকার হয়ে চরম অভাবে পড়েন। এ সময় নোয়াখালীর চরজব্বার এলাকার মাসুদ রানার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। মাসুদের বাবা আবুল কাশেম দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে ছিলেন। মাসুদ এখনো সেখানে আছেন। ঝরনা জানালেন, ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে হামালার একটি নমুনা নিয়ে মাসুদ রাঙামাটির ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পসহ বিভিন্ন আদিবাসী বস্ত্র বুনন কারখানায় যোগাযোগ করে তা তৈরি করতে চান। কিন্তু সবাই তাঁকে হতাশ করেন। কারণ, হামালার জন্য যে মোটা ও শক্ত কাপড় প্রয়োজন, তা তৈরি করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে হাল ছাড়েননি মাসুদ। তিনি ঘাগড়ায় তাঁর এক আত্মীয়ের কাছে যান। আত্মীয়কে বিষয়টি জানালে তিনি ঝরনা খীসার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। ঝরনার সঙ্গে দেখা হয় মাসুদের। তিনি ঝরনাকে হামালার নমুনা দেখান। প্রথমে একটু ভয়ই পেয়েছিলেন ঝরনা। কারণ, এমন শক্ত ও মোটা কাপড় কোমর-তাঁতে তৈরি করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহে ছিলেন। কিন্তু হাতে তো কাজ নেই। তাই চেষ্টা করে দেখার কথা ভাবলেন। নমুনা দিয়ে চলে গেলেন মাসুদ। এরপর ঝরনা অনেক কষ্ট করে তৈরিও করে ফেললেন একটি হামালা। পরে মাসুদ এসে ‘ঠিক আছে’ জানালে ঝরনা যেন আশার আলো দেখেন। এরপর তিনি বেকার নারী শ্রমিকদের হামালার কাপড় তৈরি করা শেখান।
তবে অনেকে এত শক্ত কাপড় বুনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। হতাশ হয়ে ফিরে আসেন ঝরনার কাছে। ঝরনা তাঁদের বুঝিয়ে ও নতুন করে শিখিয়ে কাপড় বুনতে উৎসাহ দেন।
বর্তমানে ৪০ জন নিয়মিত এবং ১০ থেকে ১৫ জন নারী অনিয়মিতভাবে বেইনে হামালার জন্য কাপড় বুনছেন। প্রতিজন মাসে গড়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা আয় করছেন।
ঘাগড়ায় এক দিন: রাঙামাটি থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ঘাগড়া ইউনিয়নের মহাজনপাড়া, জুনুমাছড়াসহ কয়েকটি পাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারের নারীরা হামালার কাপড় তৈরি করেন।
মহাজনপাড়ায় গিয়ে দেখা গেল নিপা চাকমা (৪০), প্রভা চাকমা (৫০) ও রীতা চাকমা (২০) বাড়ির উঠানে কাপড় তৈরিতে ব্যস্ত। তাঁরা জানান, মাসে তিন থেকে চার সেট কাপড় তৈরি করতে পারেন। গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে ফাঁকেই তা করেন। প্রতি সেটের জন্য পান ৯০০ টাকা। সুতা সরবরাহ করেন মাসুদ রানা। তাঁরা জানালেন, এই কাজ করে তাঁদের পরিবারে বেশ সচ্ছলতা এসেছে।
জুনুমাছড়া গ্রামের মিকা দেওয়ান বললেন, টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বেকার হয়ে পড়েন। এ সময় হামালার জন্য কাপড় তৈরির কাজ পেয়ে অভাব অনেকটা দূর করতে পেরেছেন। একই গ্রামের গুম্পা রানী চাকমা বলেন, ‘হামালা তৈরির আয় থেকে আমি দুই ছেলেকে পড়াচ্ছি।’
তৈরির পদ্ধতি: হামালা তৈরির জন্য প্রথমে উলের সুতার চার নাল একসঙ্গে ১০ ফুট দুই ইঞ্চি দীর্ঘ ও প্রতিটি চার ইঞ্চি প্রস্থ করে আট স্তর করে টানা দিতে হয়। তারপর সেটি আট নাল সুতা দিয়ে বিশেষ কায়দায় কোমরে পেঁচিয়ে কাপড় বুনতে হয়। এরপর একইভাবে দুই ফুট এক ইঞ্চি দীর্ঘ ও আট ইঞ্চি প্রস্থ করে আরও একটি অংশে সাতটি কাপড় বুনতে হয়। বোনার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী উভয় অংশে সুতার মাঝখানে দিতে হয় জরি। তারপর সেগুলো কেটে বিশেষ কায়দায় সেলাই করে জোড়া দিতে হয়। এরপর কাপড়ে বসাতে হয় সুতার ফুল। কোমর-তাঁত বা বেইনে বোনার পর সেলাই করে জোড়া দেওয়া ও সুতার ফুল বসানোর কাজটা করেন অন্যরা।
হামালার ব্যবহার: চরজব্বারের আবুল কাশেম জানালেন, বেইনের মাধ্যমে বোনা কাপড়ের সঙ্গে বিশেষ কায়দায় আংটা লাগিয়ে উটের দুধের বাঁট বন্ধ করে রাখা হয়। উটের বাচ্চা যাতে ইচ্ছামতো দুধ খেতে না পারে, তাই এই ব্যবস্থা। একই সঙ্গে কাপড়গুলো বিভিন্ন কারুকাজের মাধ্যমে সাজানো হয়। তারপর সেগুলো উটের শরীরে পেঁচিয়ে উটকে সাজানো হয়।
আবুধাবি-প্রবাসী রাঙামাটির রণজ্যোতি চাকমা জানান, হামালা আবুধাবির ধনাঢ্য ব্যক্তিদের শৌখিনতার বিশেষ প্রকাশ। উটের পিঠে এগুলো জড়িয়ে রেখে শৌখিনতার পাশাপাশি ঠান্ডা বা গরম থেকে বাঁচানোর কাজও করে। প্রায় সব উটে এ ধরনের কাপড় জড়ানো থাকে।
সমস্যা ও সম্ভাবনা: আদিবাসী নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সাধারণ তাঁতে হামালার কাপড় তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। টেক্সটাইল মিলেও তৈরি করা সম্ভব নয়। আদিবাসী নারীরা প্রায় প্রত্যেকে বেইনে কাপড় বুননে পারদর্শী। এই নারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই কাপড় বোনা শেখানো যেতে পারে।
আবুল কাশেম জানান, আবুধাবিতে যাতায়াত করা লোকজনের মাধ্যমে বা অন্য পণ্য রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে বছর তিনেক ধরে তিনি এসব কাপড় ছেলে মাসুদের কাছে পাঠান। মাসুদ সেখানে বিভিন্ন দোকানে এসব বিক্রির জন্য দেন।
কাশেম জানান, উটের শরীরে ব্যবহারের জন্য এসব কাপড় আবুধাবিতে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের কাশ্মীরসহ কয়েকটি অঞ্চল থেকে। বাংলাদেশে তৈরি এসব কাপড় ভারতের চেয়ে কম দামে বিক্রি করা যায়। তাই খুব সহজে বাজার দখল করা সম্ভব। সরকার বৈধভাবে আমদানি করার সুযোগ দিলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
তাঁরা যা বলেন: ঝরনা বলেন, ‘মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শ্রমিকদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এখন সবার কিছুটা হলেও সচ্ছলতা এসেছে। এতে আমি খুশি।’ তিনি জানান, হামালার কাপড় বুনে তাঁরা বছরে গড়ে ১৮ লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন। কিন্তু বিষয়টি প্রচারমাধ্যমে না আসায় এর সম্ভাবনা অগোচরেই রয়ে গেছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য প্রশান্ত কুমার চাকমা বলেন, অনেকেই হামালা তৈরি করে সংসার চালাচ্ছেন। কিন্তু এতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। আলাপকালে কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনোয়ারা বেগম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।

No comments

Powered by Blogger.