মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর-নবীন প্রজন্মের ‘মুক্তির উৎসব’ by মাসুম আলী

বীন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা দেশের জন্য আত্মত্যাগকারী বীর শহীদদের স্মরণ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করল। শপথ নিল, সব ধর্ম ও জাতিসত্তার মানুষের সম-অধিকার নিশ্চিত করে উদার-অসাম্প্রদায়িক-মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে আজীবন কাজ করে যাওয়ার। একাত্তরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করার দাবির পাশাপাশি ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে কাজ করারও অঙ্গীকার করেছে তারা।


মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত ‘মুক্তির উৎসব ২০১২’ অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা গতকাল শুক্রবার এই শপথ নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র মাঠে দেশের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
তরুণ প্রজন্মকে স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ১৯৯৭ সাল থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আউটরিচ’ কর্মসূচির আয়োজন করে আসছে। শিক্ষার্থীরা ঐতিহাসিক স্থান, প্রামাণ্যচিত্র প্রভৃতি দেখার পর মুক্তির উৎসবে মিলিত হওয়ার মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ করে।
শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মাঠে হাজির হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। মূল প্রবেশ পথে নাম নিবন্ধনের পর ওরা আনন্দ-উল্লাসে পৌঁছে যায় মাঠের মাঝখানে তৈরি বিশাল মঞ্চ লক্ষ্য করে।
অনুষ্ঠান শুরু হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে স্কুল অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের শিক্ষার্থীরা। নৃত্য পরিবেশন করে মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমসের শিক্ষার্থীরা। এরপর স্বাগত বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি আক্কু চৌধুরী। শপথবাক্য পাঠ করান পরিকল্পনামন্ত্রী মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম, সাংসদ আসাদুজ্জামান নূর, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক লে. জে. (অব.) হারুন-অর-রশিদ, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান প্রমুখ।
আবৃত্তিশিল্পী রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেয় স্কুল অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ (সোডা), ভারতেশ্বরী হোমস, বধ্যভূমির সন্তান দল, ধ্রুপদ কলাকেন্দ্র, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, খুলনার ডুমুরিয়ার বান্দা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, স্পন্দন, ইউসেপ স্কুল ও দোলেশ্বর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়। শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে নৃত্য, গান, আবৃত্তি। এর মধ্যে দোলেশ্বর স্কুলের শিক্ষার্থীরা গেয়ে শোনায় ‘সূর্যদয়ে তুমি, সূর্যাস্তে তুমি’ ও ‘আমাদের দেশটা স্বপ্নকুঁড়ি’। ‘আকাশে বাতাসে চল সাথী উড়ে যাই’ গানের তালে নৃত্য পরিবেশন করে স্কুলটির শিক্ষার্থীরা। স্পন্দন ‘নাচ আমরা ময়ূরী’ ও ‘আমার খালি ইচ্ছে করি ছুঁই’ গানের তালে নৃত্য পরিবেশন করে। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী ফকির আলমগীরের নেতৃত্বে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী গেয়ে শোনায় ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’, ‘মায়ের এক ধার দুধের দাম’ ও ‘ভয় কী মরণের রাখিতে সন্তানে’। ‘ইউসেপ’-এর সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা গেয়ে শোনায় ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’ ও ‘উড়ে যা যা উড়ে যা পাখি’ গান দুটি। এরপর তারা নৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আবহমান বাংলার সংস্কৃতির নানা উপাদান, প্রেম-ভালোবাসা, বিয়ে ও মুক্তিযুদ্ধকে তুলে আনে। কণ্ঠশিল্পী পার্থ বড়ুয়া গেয়ে শোনান ‘বৃষ্টি দেখে অনেক কেঁদেছি’ ও ‘কেন এই নিঃসঙ্গতা’। হাসান আরিফের পরিচালনায় দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে বাকশিল্পাঙ্গন ও শ্রুতিঘর।
উৎসবে একপাশে ছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে ‘মুক্তিযুদ্ধের শেষ নাই, যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা নাই’—শীর্ষক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। বিশাল ক্যানভাসে শিল্পী নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্য, শেখ আফজাল এবং মনিরুজ্জামান তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং যুদ্বাপরাধীদের প্রতিকৃতি। সব শেষে ছিল র‌্যাফল ড্র।

No comments

Powered by Blogger.