একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ-জবাবদিহিতার অনন্য দৃষ্টান্ত

স্বাধীনতার ৪০ বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনটি ঘটেনি। অভূতপূর্ব এই ঘটনাটি শুধু প্রচারমাধ্যমের জন্য নয়, দেশের সাধারণ জনগণের জন্যও ছিল বিস্ময়কর। সেনাবাহিনীর একটি অংশ সরকার উৎখাতের চেষ্টা করেছিল। আর তা প্রতিরোধও করেছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী সেই ঘটনাটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সর্বসাধারণকে অবহিত করেছে।


সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অবহিত করার এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। অথচ যে বিষয়কে কেন্দ্র করে এ ঘটনার অবতারণা, সফল অথবা ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টা, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেকবারই ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে সংবাদ সম্মেলনটি করেছে, তা বাংলাদেশের জন্য একেবারেই নতুন। সেনা সদরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা হয়েছিল। দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে নস্যাৎ করে সরকার উৎখাতের চেষ্টাও ছিল। সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে, এ অপচেষ্টার সঙ্গে সেনাবাহিনীর স্বল্পসংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কর্মরত কিছু কর্মকর্তাও জড়িত।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা একেবারে কম ঘটেনি। এসব কারণে অনেক মেধাবী সেনা কর্মকর্তাকে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে। সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের অসৎ উদ্দেশ্য এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলি হতে হয়েছে অনেককে। এর সুযোগে রাজনৈতিক অসাধুতা বিস্তৃত হয়েছে। এবারও ঠিক সে রকমই একটি অপচেষ্টা রুখে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেই অপচেষ্টাটি রুখে দিয়েছে। অতীতের মতো এবারও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা যে হয়নি, তা নয়। সেনাবাহিনীতে গুম-খুনের কথা বলে দেশের মানুষের তথা সেনাবাহিনীর আবেগকে রাজনীতির হাতিয়ার করার চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু সঠিক সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেই অপচেষ্টাকারীদেরও মুখোশ উন্মোচন করে দিল। গত কিছুদিনে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যা কিছু ঘটেছে, সেনা আইনে তার বিচার হবে। সেটা সেনাবাহিনীর বিচার্য বিষয়। কিন্তু ঘটনাগুলো নিয়ে মাসখানেক ধরে ঢাকাসহ সারা দেশে যে গুজব ছড়ানো হয়েছে, গত বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলন সেই গুজবকে উড়িয়ে দিল। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, এমন অনেক গুজবের ওপর ভর করে দেশের রাজনীতিতে অপশক্তির কালো ছায়া নেমে এসেছে। স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চলে আসছে স্বাধীনতার পর থেকেই। বেশ কিছু মৌলবাদী দল সাধারণ মানুষের ধর্মানুরাগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। এমনই একটি নিষিদ্ধ সংগঠনও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের ঘটনাকে কাজে লাগাতে চেয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানটি স্পষ্ট করে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পাদন করেছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের অহংকারের অংশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এই সেনাবাহিনী ছিল সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা। মহান মুক্তিযুদ্ধের ফসল সেনাবাহিনীকে তাই বিভ্রান্ত করা যে সম্ভব নয়, সেটাই এবার প্রমাণিত হলো। প্রমাণিত হলো, আমাদের সেনাবাহিনী 'সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে'_এই মূলমন্ত্র থেকে একটুও বিচ্যুত হয়নি। দেশপ্রেমিক জনগণের কাছে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর দায়বদ্ধতা এ থেকে সহজেই প্রমাণিত হয়। সেনাবাহিনীর সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের একটি দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে অনেক আগেই। গত বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলন সেই দূরত্ব অনেকটাই ঘুচিয়ে দিল। রাষ্ট্রের মালিক যে জনগণ, সেনাবাহিনী সেই রাষ্ট্রেরই একটি অংশ মাত্র_এটা গত বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে সবার কাছে স্পষ্ট হয়েছে।
সেনাবাহিনী জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়বদ্ধতাও স্বীকার করে নিল। জানাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা। কিন্তু দেশের রাজনীতিতে অপশক্তির যে কালো ছায়া বিরাজ করছে, তা থেকে এখনো আমরা মুক্ত নই। আমাদের সেনাবাহিনীকে সেই সম্পর্কে সব সময় সজাগ থাকতে হবে। রাষ্ট্র এবং সরকারবিরোধী গণতন্ত্র হন্তারক যে ষড়যন্ত্রকারী অংশ এখনো সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে রয়েছে, চিহ্নিত সেই অংশটির মূলোৎপাটন করা হোক।

No comments

Powered by Blogger.