স্বপ্নের বাংলাদেশ- by এমাজউদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশ আমাদের স্বপ্নের দেশ। এই দেশের মাটি আর মানুষকে আমরা ভালোবাসি এবং খুব গভীরভাবে। এ দেশের মাটি সুরক্ষিত হোক আর এর অধিবাসীরা উন্নত জীবনের অধিকারী হোক_এই স্বপ্ন নিয়েই তো বেঁচে রয়েছি। প্রায় চার হাজার বছর পর সর্বপ্রথম এ দেশের শাসনকাজ পরিচালিত হচ্ছে এই মাটির সন্তানদের দ্বারা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। এর আগেও দেশ ছিল। দেশের মাটি ছিল।


ছিলেন দেশের অধিবাসীরা। কিন্তু কোনো সময় এর নীতি নির্ধারিত হয়নি এ মাটির সন্তানদের দ্বারা। ১৯৭১ সালের পর থেকে নতুন অধ্যায়টির সূচনা হয়েছে। এই অধ্যায় অক্ষয় হোক। অমর হোক। চিরন্তন হোক। এই স্বপ্ন নিয়ে তো রয়েছি। এ জন্য যা প্রয়োজন, সে সম্পর্কে ভাবি এবং লেখালেখি করি। আমার আলোচনা-পর্যালোচনার মৌল বিষয় এটাই। অনভিজ্ঞতার জন্য হয়তো রাজনীতির ক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আমরা বারবার হোঁচট খাচ্ছি। যত দ্রুত পথ চলা উচিত, সে গতি হয়তো নেই। হয়তো নেই সেই সক্ষমতা। তাতে দোষের কিছু নেই। যা নেই, তা অর্জন করতে হবে। দেশের মাটিকে আরো উর্বর করতে হবে। দেশের জনগণকে নিয়ে সৃজনশীল স্বপ্ন দেখি, যা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা, যুক্তিবাদী, মুক্তমনের অধিকারী, হৃদয়বান নাগরিকের বাংলাদেশ। আকাশছোঁয়া আত্মবিশ্বাসসমৃদ্ধ, সৃষ্টিশীলতায় উদ্দীপ্ত, নিজেদের ভাগ্য গড়ার দৃঢ়প্রত্যয়ে আস্থাশীল নাগরিকের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে থাকবে না দারিদ্র্য। থাকবে না ব্যাধি-অপুষ্টি। সমাজ হবে দুর্নীতির কলুষমুক্ত। সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতার উর্ধ্বে আকাশের মতো হবে উদার। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পশূন্য সব মত-পথ ও বিশ্বাসের অবাধ চারণক্ষেত্র। মিলনের তীর্থক্ষেত্র শহীদ মিনারের মতো। এই দেশের মাটি ও মানুষকে উন্নত করার দর্শনই আমার দর্শন। মাটিকে সুরক্ষিত রাখার স্বপ্ন আমার স্বপ্ন। এই অধিবাসীদের সৃজনশীল করার প্রত্যয় আমার প্রত্যয়। সবার মাথা উন্নত রাখার আকাঙ্ক্ষাই আমার সাধনা।
জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। উজ্জ্বল বলছি বিভিন্ন কারণে। এক. বাংলাদেশ ছোট রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র। বিশ্বের সমগ্র জনসমষ্টির প্রতি ৪৬ জনের একজন বাংলাদেশি। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যা ১৯২। বাংলাদেশ এর ১৩৩তম সদস্য। বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের পর যে ৫৯টি রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য হয়েছে, তাদের সবার মোট জনসংখ্যা থেকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি। বর্তমানে এই জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। এই ১৫ কোটি মানুষ যদি উন্নত মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠে এবং শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের বিদ্যমান ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে বাংলাদেশ রূপান্তরিত হবে এক উল্লেখযোগ্য শক্তিতে। দুই. বাংলাদেশ শুধু জনসংখ্যার নিরিখেই নয়, এখন পর্যন্ত যেসব সম্পদ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যা হবে, তার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার ঘটলে যে দারিদ্র্য এখন বাংলাদেশের নিত্য সহচর, তা পালানোর পথ পাবে না। তিন. মানবিক উপাদান হিসেবে বাংলাদেশের জনসমষ্টি উন্নতমানের। মানব সম্পদরূপে গড়ে তুলতে পারলে যেকোনো পর্যায়ে যেকোনো প্রতিযোগিতায় তারা উতরে যাবে সাফল্যের সঙ্গে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের সাফল্যের দিকে দৃষ্টি দিলেই সব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। চার. প্রতিবেশী ভারত এবং পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশ আলোচনা-পর্যালোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ বা ক্ষুরধার যুক্তির জৌলুসে জন্মলাভ করেনি। বাংলাদেশ প্রাণ পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে। বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে সংকটকালে। সংকটকালেই তাঁরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অতীতে। ভবিষ্যতেও তারা এমনি পদক্ষেপ গ্রহণে দ্বিধাবোধ করবে না। ফলে এমন দেশটির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল না হয়ে পারে না। এই বিশ্বাস নিয়েই তো আজও বেঁচে আছি।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সংহতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। এক. বাংলাদেশের জনগণকে জাগ্রত রাখতে হবে। কোনো জনপদে দেশপ্রেম আপনা-আপনি জাগ্রত হয় না। সংকটকালে তার প্রকাশ ঘটলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না আপনা-আপনি। এ জন্য প্রয়োজন নিরন্তর চর্চার, সার্বক্ষণিক যত্নের, প্রতি মুহূর্তের পরিচর্যার। জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম বৃদ্ধির প্রকট পন্থা হলো, দেশের শাসন-প্রশাসনে তাদের গভীরভাবে সম্পৃক্ত করা। গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়েই সাধারণ মানুষ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে এবং একাত্মতার উষ্ণ অনুভূতিই দেশপ্রেম। গণতন্ত্র হলো এর সঠিক পথ। দুই. দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের জন্য দেশপ্রেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বটে, তবে তা-ই যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন হয় নাগরিকত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ। দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, নৈপুণ্যের মতো গুণাবলি এ লক্ষ্যে একেকটা মণিমুক্তা। নাগরিকদের তা আয়ত্তে আনতে হবে। সুশিক্ষার সিংহদরজা দিয়েই জাতীয় জীবনে তা প্রবেশ করে সগৌরবে এবং প্রত্যেক নগরিককে সচকিত করে তোলে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে। রাষ্ট্রের প্রতি নিজ নিজ ভূমিকা সম্পর্কে। সুশিক্ষিত জনসমষ্টি হলো, যেকোনো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রধানতম রক্ষাকবচ। তিন. জাতীয় সংহতি হলো জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অন্য নাম। যে জাতি যত সুসংহত এবং সুবিন্যন্ত, সেই জাতি তত বেশি স্বাধীন। তত বেশি সার্বভৌম। জাতীয় পর্যায়ে ভিন্নমত থাকবে। থাকবে ভিন্নপথের দিশা। ভিন্নমত ও পথের জন্যই রাজনীতি এত অর্থপূর্ণ। কিন্তু রাজনীতিকে সার্থক করতে হলে ভিন্নমত ও পথকে ছাপিয়ে সমাজব্যাপী প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে ঐকমত্য। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ভাষার প্রশ্নে এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এমনি ঐকমত্যই ছিল এ জাতির প্রধান মূলধন।
জাতি হিসেবে বাংলাদেশের রয়েছে এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। রয়েছে এর সুস্পষ্ট গন্তব্য। জাতির এই লক্ষ্য এবং গন্তব্যকে ধারণ করেই রাষ্ট্রকে তার নীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং হাজারো প্রতিবন্ধকতা জয় করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়নীতি_রাজনৈতিকভাবে ঘোষিত হয়েছে এসব লক্ষ্য। তা ছাড়া রয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য অর্জনের লক্ষ্য, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের উন্নত জীবনের আশীর্বাদ আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সব নাগরিকের মাথা উঁচু করে, রাজনীতির বৃহত্তর ক্ষেত্রে, নীতি গ্রহণের সব স্তরে এবং নীতি বাস্তবায়নের সব পর্যায়ে অংশগ্রহণের অধিকারসমৃদ্ধ পরিপূর্ণ জীবন গঠনের লক্ষ্য। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য চাই এমন নীতি, যা জাতীয় স্বার্থ এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের উপযোগী। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরে নিরবচ্ছিন্ন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। চাই দেশের চারপাশে এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বহুসংখ্যক নির্ভরযোগ্য বন্ধুরাষ্ট্র। চাই নাগরিকদের মধ্যে যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক জাতীয় মানস। সবার ওপরে চাই নিরপেক্ষ, আত্মনির্ভর, আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ শাসক-প্রশাসক, যাঁরা কোনো জনপদের প্রতি বিরাগ বা অনুরাগে নয় অথবা ক্ষণিক লাভের প্রত্যাশায় নয়, বরং জনস্বার্থ বা জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর হতে পারেন। বাংলাদেশের নীতি হতে হবে এমন, যা শুধু বর্তমানের প্রেক্ষাপটে নয়, বরং আগামী তিন-চার দশকের স্বপ্ন পূরণেও সক্ষম। এ সব কিছুর জন্য সর্বাগ্রে দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার আর পরমতসহিষ্ণুতা। সব রকম রাজনৈতিক সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে সব প্রত্যাশাই পূরণ হবে। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ-প্রচেষ্টা জরুরি।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.