সাড়ে ৭ মাসে ২৬৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি by সজল জাহিদ

ন্তর্জাতিক ইনকামিং ফোনকলের রেটে দশমিক ৪৫ সেন্টের হেরফের করে সাড়ে ৭ মাসে ২৬৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ২৩ মে থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত হিসাবে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বছরে এ অঙ্ক ৪০০ কোটি টাকা পেরিয়ে যাবে। সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরকারের রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার
করেছে। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি দায় চাপাচ্ছে সরকারের ওপর। মন্ত্রী-সচিব বলছেন ভিন্ন কথা।


সংঘবদ্ধ একটি চক্র ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব ভাগ-বাটোয়ারা করছে বলেও দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সাংসদরাও এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। সরকারের ঘোষণা অনুসারে প্রতি মিনিটের আন্তর্জাতিক ইনকামিং কলের টার্মিনেশন রেট ৩ সেন্ট। প্রতি মিনিটের আয় আন্তর্জাতিক গেটওয়ের (আইজিডবি্লউ) মাধ্যমে আসবে। যার ৫২ দশমিক ৭৫ শতাংশ সরাসরি বিটিআরসির মাধ্যমে সরকারের কোষাগারে যাবে। অর্থের অন্য দুটি অংশ মোবাইল ফোন এবং আন্তঃসংযোগ এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) পায়। যেখান থেকে আবার ২০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ হারে রাজস্ব পায় বিটিআরসি। সব মিলে এ আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারের কোষাগারে আসে।
কিন্তু কৌশলে একটি নির্দেশনা বের করে রাজস্ব ফাঁকির বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কী হারে এবং কিসের ভিত্তিতে ভাগাভাগি হবে তার নীতিমালা আছে। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। আইজিডবি্লউদের ব্যাখ্যা, ব্যবসা করতে তাদের সুযোগ দিতে হবে। না হলে বিদেশ থেকে কল আনা অসম্ভব। এদের কেউ কেউ আবার দশমিক ৪৫ সেন্টকে ব্যবসার 'গোমর' হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিদেশি কল থেকে গত বছর দেড় হাজার কোটি টাকা পেয়েছে বিটিআরসি। রেট সংক্রান্ত জটিলতায় বিটিআরসির আয়ও শত কোটি টাকা কমেছে।
একসময় বিদেশ থেকে কল এলে ১০ সেন্ট পর্যন্ত দেশে আসত। অবৈধ কল কমাতে দুই বছর আগে এ রেট ৩ সেন্ট নির্ধারিত হয়। গত বছর ২৩ মে হঠাৎ বিটিআরসি টার্মিনেশন রেট সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৪৫ সেন্ট নির্ধারণ করে। কিন্তু আয়ের ভাগাভাগি হবে ৩ সেন্টেই। প্রতিদিন যেহেতু দেশে ৫ কোটি মিনিটের কল আসে তাতে দশমিক ৪৫ সেন্টের ঘাপলা করায় সরকারের সরাসরি ক্ষতি ১ কোটি ১৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে শেষ পর্যন্ত যে অপারেটরটির মাধ্যমে কলটি গ্রাহকের কাছে পেঁৗছায় তারা বঞ্চিত হয় ৩৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকা থেকে। আইসিএক্সগুলো বঞ্চিত হচ্ছে দিনে ২৮ লাখ ২৪ লাখ টাকা থেকে। এ দুই অপারেটরের কাছ থেকেও সরকারের ১০ লাখ টাকার বেশি আসে। সব মিলে বছরে ক্ষতি ৪০০ কোটির কম নয়।
গত ২৩ মে বিটিআরসির সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল মোঃ রাকিবুল হাসান স্বাক্ষরিত চিঠি বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ সমকালকে বলেন, পুরো কাজটি মন্ত্রণালয় করেছে। তারা কেবল চিঠিটি পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, আইজিডবি্লউরা যে রেটে কল আনবে সেই হারেই রাজস্ব ভাগাভাগি করার নিয়ম। কিন্তু যত বেশি দামেই কল আনুক না কেন ৩ সেন্টের ভিত্তিতে আয় ভাগাভাগি করার শর্ত মন্ত্রণালয়ই জুড়েছে। তিনি স্বীকার করেন, এখানে সরকারের কিছু টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
অন্যদিকে, টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু বলেন, তারা জড়িত নন। এর প্রমাণ সংসদীয় কমিটিতে তিনিই বিষয়টি উত্থাপন করেন। ৮ জানুয়ারি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের সচিব সুনীল কান্তি বোস দাবি করেন, নির্দেশনাটি যখন দেওয়া হয় তখন তিনি দেশে ছিলেন না।
আইজিডবি্লউ নভোটেলের চেয়ারম্যান আরশাদ জামাল সমকালকে বলেন, দশমিক ৪৫ সেন্ট হচ্ছে প্রতিযোগিতার জায়গায়। তাদের দাবিতেই টার্মিনেশন রেট ৩ দশমিক ৪৫ সেন্ট করলেও রেভিনিউ ভাগাভাগির দর করেছেন ৩ সেন্ট। নাহলে তারা ব্যবসা চালিয়ে নিতে পারবেন না। অন্য একজন বলেন, ৩ সেন্টে না হলেও গড়ে তাদের টার্মিনেশন রেট ৩ দশমিক ১৫ সেন্ট থেকে ৩ দশমিক ২৫ সেন্ট। তা হলেও সরকার শত কোটি টাকার ফাঁকিতে পড়ে বলেও স্বীকার করেন তিনি।

No comments

Powered by Blogger.