পানি ও জীবন-দুদেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ জরুরি by এ কে এম জাকারিয়া

সংলাপের বিষয় আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, আর অংশগ্রহণকারীরা হচ্ছেন বাংলাদেশ ও ভারতের গণমাধ্যমের লোকজন। এমন একটি সংলাপের স্থান কিন্তু ঢাকা, দিল্লি বা বাংলাদেশ-ভারতের অন্য কোনো শহর নয়, ব্যাংকক। সংলাপের আয়োজকেরা কেন এই স্থানটি বেছে নিল তা আমরা অনুমান করতে পারি। সমস্যাটি ভিসা পাওয়ার। এই দুটি দেশের জনগণ ভাগাভাগি করে এমন নদীর সংখ্যা ৫৪টি।


অথচ এই দুটি দেশের সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের লোকজন সহজে এ দুটি দেশে যেতে পারেন না। নদীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংলাপের জন্য যখন তৃতীয় দেশ বেছে নিতে হয়, তখন এটাই পরিষ্কার হয় যে দুটি দেশের নদীর পানি ভাগাভাগির যে সমস্যা তার শেকড় অনেক গভীরে। পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়টি একটি বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ইস্যু হলেও সমস্যাটি ঠেকে আছে রাজনীতিতেই।
বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো ও প্রভাবশালী পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার বা আইইউসিএনের একটি উদ্যোগ ‘ইকো সিস্টেম ফর লাইফ’। এই ‘জীবনের জন্য প্রতিবেশের’ মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য দেশ দুটির মধ্যে যোগাযোগ ও সংলাপ বাড়ানো। বিশেষ করে দুই দেশের নাগরিক ও গবেষক পর্যায়ে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া। লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ ও আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি সুন্দর বোঝাপড়া গড়ে তোলা। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা হয়তো এই গোষ্ঠীগুলোর নেই, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালনের সুযোগ নিশ্চয় রয়েছে। ২০১০ সালের মাঝামাঝি শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ সাড়ে চার বছর। কাজ করছে যৌথ গবেষণা ও সমীক্ষার মাধ্যমে খাদ্য, জীবন-জীবিকা, পানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি পারস্পরিক সমঝোতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও বোঝাপড়া গড়ে তোলা, জ্ঞানভান্ডার গড়ে তোলা ও সমীক্ষাভিত্তিক নীতি গ্রহণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।
ইকো সিস্টেম ফর লাইফের এই ব্যাংকক মিশনের লক্ষ্য ছিল পরিবেশ, প্রতিবেশ বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা, তাঁদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সংলাপ ও বোঝাপড়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং এ সংক্রান্ত লেখালেখি বা প্রতিবেদন যাতে যথাযথ তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করে হয় সে ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করা। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, এই উদ্যোগের অন্যতম একটি দিক হচ্ছে, তিনটি প্রধান নদীর (গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা) সম্পদ ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
‘ইকো সিস্টেম ফর লাইফ’-এর উদ্দেশ্য অনেকটাই বৈজ্ঞানিক, মানবিকও বটে। কারণ, ‘জীবন’ই এখানে মূল বিবেচনা। দুই দেশের জনগণের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ—এসব বিবেচনায় নিয়েই তারা গণমাধ্যমকর্মীই হোক বা সামগ্রিকভাবে নাগরিক সমাজের লোকই হোক, তাঁদের সচেতন করতে চায়, তাঁদের তথ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক সক্ষমতা বাড়াতে চায়। আয়োজকেরা বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই অরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছে। কিন্তু ইস্যুটি যখন ভারত-বাংলাদেশের যৌথ নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, তখন এর রাজনৈতিক দিকটি উপেক্ষা করার সুযোগ কই, বিশেষ করে অংশগ্রহণকারীরা যখন গণমাধ্যমকর্মী।
দিনব্যাপী আলোচনার আগে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে আলোচনায় যেসব তথ্য উঠে আসবে বা বিষয়বস্তু সবই প্রকাশ করা যাবে, তবে বক্তার পরিচয় প্রকাশ না করে। সেটা মেনে চলেই দিনব্যাপী আলোচনার ফলাফল সংক্ষেপে উল্লেখ করতে চাই। এ ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছেন যে আন্তসীমান্ত নদী ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সচেতনতা ও যৌক্তিক সমাধানের ক্ষেত্রে এ সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও তথ্য-উপাত্ত বিনিময়ের বিষয়টি খুবই জরুরি। এ সংক্রান্ত যেকোনো লেখালেখি বা প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো পক্ষ থেকে তথ্য যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অনেকে। কারণ, তথ্যগত বিভ্রান্তি বা ভুল টার্মের কারণে দুই দেশেই অনেক সময় বিভ্রান্তিকর খবর ছাপা হয়। সরকারের বা বিশেষজ্ঞদের তরফ থেকে যথাযথ তথ্য না পাওয়ার কারণেও অনেক সময় বিভ্রান্তি ছড়ায়। তথ্য সরবরাহ করা যে সরকারের দায়িত্ব, সে প্রসঙ্গটিও গুরুত্ব পেয়েছে। গণমাধ্যমকে ঢালাওভাবে দায়ী করার আগে দুই দেশের সরকারের উচিত গণমাধ্যমগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা। মূলধারার যেকোনো আলোচনায় এ জন্য গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। দুই দেশের নদীসংশ্লিষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে কেন এ ধরনের আলোচনায় সম্পৃক্ত করা হয় না, সে প্রশ্নটিও উঠে এসেছে। এসেছে নানা প্রস্তাবও। তথ্য যাচাই- বাছাইয়ের জন্য দুই দেশে সাংবাদিকেরা কীভাবে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে পারে, কোনো গ্রুপ গঠন করা যায় কি না—এসব প্রশ্ন এসেছে। সমীক্ষার ফলাফল ও প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্য যাতে গণমাধ্যম পেতে পারে, সে জন্য আইইউসিএনের মতো প্রতিষ্ঠান কী করতে পারে সে আলোচনাও হয়েছে। দুই দেশের আন্তসীমান্ত ইস্যুতে নাগরিক সমাজ পর্যায়ে ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে—এ ধরনের সাধারণ ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সংলাপ শেষ হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আগে-পরে তিস্তা নদী নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় কী পরিমাণ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে তার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল সংলাপে। অনুপাতটি অনেকটা এ রকম যে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় যদি ৩০০ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়ে থাকে তো ভারতীয় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে তিনটি। ভারতীয় সাংবাদিকেরা অবশ্য এমন পরিসংখ্যান মেনে নেননি। এ ক্ষেত্রে তথ্যগত বিভ্রান্তি রয়েছে এমন বিষয়টি অবশ্য আয়োজকেরাও শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছে। সে সময় ইন্টারনেটে ভারতীয় পত্রপত্রিকায় তিস্তা নিয়ে খবরা-খবর নিয়মিত ফলো করার চেষ্টা করেছি, তাতে আমারও মনে হয়েছে যে তথ্যগত বিভ্রান্তি রয়েছে। বাংলাদেশের তুলনায় ভারতীয় পত্রপত্রিকায় তিস্তা নিয়ে খবর কমই ছাপা হয়েছে, কিন্তু এতটা কম হওয়ার কথা নয়। তবে এটা ঠিক যে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী ও এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে সমস্যা রয়েছে তা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য যত গুরুত্বপূর্ণ, খুব স্বাভাবিক কারণেই ভারতীয় পত্রপত্রিকার জন্য ততটা নয়। নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে যে বিরোধ—সেটাই সেখানকার গণমাধ্যমের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যৌথ নদীর অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ।
সিকিমে তিস্তা নদীতে যে ২৩টি বাঁধ হচ্ছে, সেটা পশ্চিমবঙ্গের গণমাধ্যমের কাছে অনেক জরুরি বিষয়, তিস্তার পানি বাংলাদেশ পাচ্ছে কি না, বা পাবে কি না তা নয়। আসমের গণমাধ্যমের সব মনোযোগ ভারতের উত্তর-পূর্বে পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলের অরুণাচলে যে ৭০টি বাঁধ তৈরি হচ্ছে তা নিয়ে। ভারত সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে মোট ১৬৮টি বাঁধ তৈরি হবে। ব্রহ্মপুত্র ও শাখা নদীতে বাঁধ তৈরি হলে আসামের কাজিরাঙ্গা ন্যাশনাল পার্কের বন্য প্রাণীর জীবন যে এতে হুমকির মুখে পড়বে সে নিয়ে স্বাভাবিক উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে সেখানকার গবেষকদের কাছ থেকে। এরও নিচের দিকে সিলেট নামে যে একটি অঞ্চল রয়েছে, সেই ভূখণ্ড বা বাংলাদেশের পরিবেশ, বন, বন্য প্রাণী বা জনগণের জীবন-জীবিকার ওপর এর কী প্রভাব পড়বে সেই আলোচনা তো অনেক পরের বিষয়!
এক ভারতীয় সাংবাদিক টিপাইমুখ নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক নানা খবরের উল্লেখ করে বলতে চেয়েছেন বিবিসি কী রিপোর্ট করল তা নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের এত বাড়াবাড়ি করা উচিত হয়নি। ভারত সরকার সত্যিই তা করছে কি না সেজন্য বাংলাদেশের সাংবাদিকদের এটা যাচাই করা উচিত ছিল যে ভারত সরকারের বাজেটে এ নিয়ে কোনো বরাদ্দ আছে কি না? সাংবাদিকতার জায়গা থেকে তাঁর এই পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গেই নিতে চাই। ভারত সরকার তাদের বাজেটে টিপাইমুখ নিয়ে কোনো বরাদ্দ রেখেছে কি না তা নিশ্চয়ই আমাদের সাংবাদিকেরা খুঁজে দেখতে পারেন। কিন্তু টিপাইমুখের ব্যাপারে ভারত কী ভাবছে সেটা স্পষ্ট করে বলে দিলেই যে বিষয়টি সহজ হয়ে যায়, এমন সরল ভাবনা সেই সাংবাদিকের মনে কেন আসে না সেটা বিস্ময়েরই বটে! আর ওয়েটল্যান্ড কনভেনশন, বায়োডাইভারসিটি কনভেনশন বা এ ধরনের আন্তর্জাতিক পরিবেশ নীতিমালা অনুযায়ী যৌথ নদীতে কেউ একতরফাভাবে কিছু করতে পারে না। টিপাইমুখে যে প্রকল্পই নেওয়া হোক, তার বিস্তারিত বাংলাদেশকে জানানো ভারতের দায়িত্ব। ২০১০ সালে চীন যখন ব্রহ্মপুত্র (চীনা নাম ইয়ারলুং ৎসাংপে) নদীতে ১.২ বিলিয়ন ডলারের জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে, এবং পরে সেখান থেকে যখন পানি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার বিষয়টি প্রকাশ পায়, তখন ভারতের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি আমরা স্মরণ করতে পরি। টিপাইমুখ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ আর পত্রপত্রিকায় এর প্রতিফলনের বিষয়টি কি বাড়তি কিছু? বাংলাদেশের কয়েকজন সাংবাদিক স্বাভাবিক কারণেই সেই ভারতীয় সাংবাদিকের বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এর আগে অন্য এক ভারতীয় সাংবাদিক ভিন্ন প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছিলেন দেশপ্রেমিক হিসেবে ভূমিকা পালন করা সাংবাদিকের দায়িত্ব কি না? টিপাইমুখ নিয়ে যখন দুই দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে আলোচনা চলছিল, তখন এই প্রশ্নটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো।
অন্য এক ভারতীয় সাংবাদিকের কথা বলি। তিনি বললেন, ‘যখন শুনতাম যে ফারাক্কার কারণে পানির স্তর কত ফুট নেমে গেছে, তখন ভাবতাম ভারতের অনেক স্থানে পানির স্তর এর চেয়ে অনেক নিচে। বাংলাদেশ এ নিয়ে এত উদ্বিগ্ন কেন। যখন একবার বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ হলো, তখন বুঝলাম যে সেখানকার মানুষের জীবনের ওপর এর প্রভাব কী। বাংলাদেশে না গেলে তা টের পেতাম না।’
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোটা সত্যিই জরুরি।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.