দুই দু’গুণে পাঁচ-রবিরশ্মির আলোকচ্ছটা by আতাউর রহমান

বীন্দ্রনাথ কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে একবার অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন; একজন কবিরাজ এসেছেন তাঁকে দেখতে। তো কবি শুয়ে শুয়েই কবিরাজকে উদ্দেশ্য করে স্মিতহাস্যে বললেন, ‘দেখো কবিরাজ, আমি হচ্ছি গিয়ে তোমার চাইতে বড়। তুমি হচ্ছ কবি-রাজ আর লোকে আমাকে বলে কবি-সম্রাট।’


তো কবি-সম্রাট, কবিগুরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার উদ্যোগে সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল; মনোমুগ্ধকর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ আমারও হয়েছিল। অতঃপর তিন দিনব্যাপী নানা গুণীজন রবীন্দ্রচরিতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করলেন; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের উইট ও হিউমার তথা ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রইল। এবারকার ‘দুই দুগুণে পাঁচ’ তাই এতদুদ্দেশ্যে নিবেদিত।
সত্যি বলতে কি, পৃথিবীর সমস্ত মহৎপ্রাণ ব্যক্তিই বোধ করি অল্পবিস্তর হাস্যরসে অভিষিক্ত। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথা উচ্ছেদ করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন, কিন্তু তাঁর হাস্যরস পরিবেশনের ক্ষমতা এতটাই প্রবল ছিল যে বলা হয়ে থাকে, তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট না হলেও শুধু হাস্যরসের জন্যই ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতেন। নিজেকে নিয়ে হাস্যরস পরিবেশন করতেও তিনি পিছপা হতেন না। তার পায়ের পাতা ছিল সাধারণের চেয়ে বেশ বড়; তাই একবার সর্দি লাগলে তিনি একজনের সমবেদনার উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমার তো সর্দিজ্বর হবেই; কেননা আমার শরীরের অনেকখানি অংশই যে ঠান্ডা মাটির সংস্পর্শে আসে।’
ফিরে আসি কবিগুরুর কথায়। তিনি শুধু কবি-সম্রাট ছিলেন না, ছিলেন হাস্যরস-সম্রাটও—সেটা সাহিত্যে যেমন, ব্যক্তিজীবনেও তেমনি। আর তাই আমার মতো রম্যলেখকদের জন্য রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন সোনার খনি। প্রথমে সাহিত্যের কথাই বলি। রবীন্দ্রনাথের রচিত ছোটগল্পগুলোয় হিউমার ভরপুর। এ স্থলে স্মরণ করা যেতে পারে ‘দিদি’ গল্পের প্রারম্ভিক বাক্যটি: ‘এমন স্বামীর মুখে আগুন’ (কথাটি) শুনিয়া জয়গোপালবাবুর স্ত্রী শশী অত্যন্ত পীড়া অনুভব করিল—স্বামীজাতির মুখে চুরুটের আগুন ছাড়া অন্য কোনো প্রকার আগুন কোনো অবস্থাতেই কামনা করা স্ত্রীজাতিকে শোভা পায় না...।
কিংবা ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পের মধ্যবর্তী বাক্য: খোঁড়ার পা খানায় পড়ে—সে কেবল খানার দোষে নয়, খোঁড়ার পা’টারও পড়িবার দিকে একটু বিশেষ ঝোঁক আছে...।
অথবা ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পটির সর্বশেষ বাক্য: কাদম্বিনী মরিয়া গিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই।
এর অধিক উদাহরণের আপাতত প্রয়োজন নেই।
আর কবিগুরুর হাস্যরসপ্রিয়তার ব্যাপারে তাঁর পুত্রবধূ প্রতিমা ঠাকুরই তো তাঁর নির্বাণ গ্রন্থে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, ‘বাবা মশায় সকলের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতে খুব ভালবাসতেন। মেয়ে, বউ, পরিবারবর্গের সকলের সঙ্গে, এমনকি নীলমণি ভৃত্যের সঙ্গে হাস্য-পরিহাসে তাঁর ছিল সহজ আনন্দ।’ তবে তাঁর হাস্যরস ছিল মার্জিত ও সূক্ষ্ম। উদাহরণ চান? নিন তাহলে—
কবিগুরু তাঁর অচলিত সংগ্রহ রচনাবলী প্রকাশের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু এতদসত্ত্বেও সেগুলি যখন প্রকাশিত হলো তখন তিনি ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, এ তো ‘রচনাবলী’ নয়, এ হচ্ছে ‘রচনা বলি’। একবার এক অবসরপ্রাপ্ত রায় বাহাদুর তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনার মাথার চুল কেমন করে পাকলো?’ রবীন্দ্রনাথ প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার মাথা পেকেছে। আপনার কিন্তু মাথা পাকেনি, কেবল গোঁফটাই পেকেছে।’ আর রাজশাহী বিভাগের পতিসরে ঠাকুর পরিবারের জমিদারির কাছারি বাড়িতে যেতে গেলে পথে নাগর নামে একটি নদী পড়ত বিধায় একবার একজন এসে বললেন, ‘আপনাদের জমিদারীতে যে নদী আছে, তার নামটি তো বেশ, নাগর।’ রবীন্দ্রনাথ সহাস্যে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, তারপরই পতি-সর।’ এবং ন হন্যতে খ্যাত মৈত্রেয়ী দেবী মংপুতে রবীন্দ্রনাথকে বেশ কয়েক দিন ধরে নিরামিষ খাওয়াচ্ছিলেন। একদিন ছাগলের মগজ পরিবেশন করতে দেখে রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন, ‘দেখ দেখি কাণ্ড! কী করে তুমি ধরে নিলে যে ঐ পদার্থটার আমার প্রয়োজন আছে? আজকাল কি আর আমি ভালো লিখতে পারছিনে?’ তা সত্যিই শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে উবু হয়ে লিখতেন দেখে কে একজন একবার বলেছিলেন, ‘এভাবে লিখতে আপনার কষ্ট হয় না?’ প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘ঝুঁকে না লিখলে আর লেখা বেরোয় না। কুঁজোর জল তো কমে এসেছে, তাই উপুড় করতেই হয়।’ রবীন্দ্রনাথ বোধ করি কথাটা যথার্থই বলে গেছেন।
তো বিগত এক দশকে আরও দুই দফায় এই কলামেই আমি রবীন্দ্রনাথের অন্তত ডজন খানেক হাস্যরসের উপাখ্যান বর্ণনা করেছি। পুনরুক্তির অপবাদের আশঙ্কা সত্ত্বেও এই উপাখ্যানটি না বলে পারছি না: শান্তিনিকেতনে ফরাসি নাগরিক মরিস সাহেব ছিলেন ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার অধ্যাপক। তিনি বাংলাও কিছুটা শিখেছিলেন। তো একদিন তিনি বিশ্বভারতীর তৎকালীন ছাত্র প্রমথনাথ বিশীকে বললেন, ‘গুরুদেব চিনির ওপর একটি গান লিখেছেন, গানটি বড়ই মিষ্টি: চিনিগো চিনি, ওগো বিদেশিনী, তুমি থাক সিন্ধুপারে...।’ প্রমথনাথ তখন বললেন, ‘তা চিনির গান তো মিষ্টি হবেই। কিন্তু এই ব্যাখ্যা আপনি কোথায় পেলেন?’
‘কেন? স্বয়ং গুরুদেবই তো আমায় বলে দিয়েছেন।’ উত্তরে মরিস সাহেব বললেন।
সে যাহোক। সম্প্রতি প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত, নিউইয়র্ক থেকে প্রেরিত, হুমায়ূন আহমেদ সাহেব এক লেখায় বলেছেন: রবীন্দ্রনাথের ‘একই গাঁয়ে’ আর এডগার অ্যালেন পোর ‘অ্যানাবেল লি’ একই কবিতা; একটি ইংরেজিতে লেখা, অন্যটি বাংলায়...মহান লেখকেরাও ধার করেন।
ওটা যেমন সত্যি, তেমনই এটাও সত্যি যে রবীন্দ্রনাথের গানে চার্চ সংগীতের সুরের অনেকটা প্রতিধ্বনি আর ছোটগল্পে মোপাসাঁর ছোটগল্পের অবয়ব লক্ষ করা যায়; এবং এ সমস্ত সমস্থানিকতা একটা কথাই প্রমাণ করে যে, পৃথিবীতে আমরা সবাই একই আদম ও হাওয়ার সন্তান আর মহৎ ব্যক্তিরা প্রায়শই একই ধরনের চিন্তা করেন।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক। ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক।

No comments

Powered by Blogger.