গান্ধারীর তৃতীয় চক্ষু by মণিকা চক্রবর্তী

ধৃতরাষ্ট্রের বনগমনের সংবাদ অনেক আগেই প্রচার হয়ে গিয়েছিল হস্তিনাপুরে। রাজপথ তখন লোকে লোকারণ্য। চতুর্বর্ণের মানুষ একত্র হয়েছে ধৃতরাষ্ট্রকে শেষ অভিবাদন জানানোর জন্য। ধৃতরাষ্ট্র হাত জোড় করে অনুমতি চাইলেন প্রস্থানকালে। ধৃতরাষ্ট্রের বনযাত্রার সঙ্গী হয়েছেন গান্ধারী আর কুন্তী। সেই দিনটি ছিল কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথি। কুন্তী পথ দেখিয়ে চলছেন সবার আগে, তাঁর পিঠে হাত রেখেছেন কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা গান্ধারী, তাঁকে অনুসরণ করছেন অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র। বনবাসের প্রথম রাতটি কেটে গেল ভাগীরথীর তীরে কুশশয্যার শয়নে।


ঘুম আসে না, এত চমৎকার কার্তিকের রাত, তবু ঘুম আসে না চোখে। আপন মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল গান্ধারী। জেগে বসে থাকল, কুশশয্যার ওপরে। পরিশ্রান্ত কুন্তী ঘুমিয়ে আছে তারই শয্যাপাশে। ধৃতরাষ্ট্র ভিন্ন শয্যায়। কত না প্রান্তর হেঁটে হেঁটে পরিশ্রান্ত সবাই, এ অরণ্য দিকচিহ্নহীন, রাতের বাতাসে ছড়িয়ে থাকা বাষ্প জমে গিয়ে আর কদিন পরেই হিম হয়ে ঝরে পড়বে। আসন্ন শীতের কথা একবার ভাবতেই তা অদৃশ্য অনুভবের মধ্য দিয়ে বুকের মধ্যে অনুরণিত হয়ে উঠল। নক্ষত্রের আলোয় গান্ধারী অস্ফুট শব্দ করে ওঠে। কাতরতা কেঁপে কেঁপে ওঠে। গাছের ছায়ারা অন্ধকারে দুলে ওঠে। দুলে ওঠা ছায়ারা কোনো এক হরিণীর পিছু পিছু ছোটে। গান্ধারী তাকিয়ে থাকে সেই শব্দের দিকে। অনুভব দিয়ে বুঝে নেয় বিচিত্র কমলা রঙের এই ঝরে পড়ার সময়টিকে। গাছ হতে ফুল, ফল, এরপর ধাবমান ঋতুতে রূপের নানা বিস্তার। সব শেষে মাটির গভীরে পড়ে থাকে শুধু বিস্তীর্ণ শিকড়। জন্ম নেওয়ার আগের মুহূর্তের জড় অস্তিত্ব একমাত্র মৃত্যুতে লয়প্রাপ্ত হয়ে জড়ত্বেই বিদ্যমান থাকে। মাঝখানের এই সময়টুকুতেই শুধু বিস্ময় আর বিস্মিত হওয়া। গান্ধারী বিস্মিত হয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিস্ময়-তাড়িত হয়ে নিজের হাতকে পেঁৗছে দেয় তার পাকা চুলে, গ্রীবায়, বুকে। স্পর্শের উত্তাপে নিজেকে পরখ করে নিতে চায়। নীরবতার মধ্যে নিজের নিশ্বাসের শব্দকেও মনে হয় অন্য কোনো অস্তিত্বের উপস্থিতি। ভেঙে ভেঙে পড়ে সেই নিঃশ্বাসের শব্দ, হতাশার গোপন কুঠুরিতে। চারিদিকের অন্ধকারেরা শোকের মত কালো, ভয়ের মত কালো। হঠাৎ গান্ধারীর মনে হলো অনেক মৃতদেহের ওপর দিয়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে এতটা পথ এগিয়ে এসেছে গান্ধারী, ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে। চারপাশের নির্জনতায় গান্ধারী ফিসফিস করে বলতে থাকে। তার বিস্মিত কষ্ঠস্বর এক নিস্পন্দ আ@ে@@@াপলব্ধির নিবিড়তায় তাকে আন্দোলিত করে। সে ভাবতে থাকে : 'অন্ধ স্বামীকে অতিক্রম করব না_এই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে যেদিন পট্টবস্ত্র দিয়ে নিজের চোখগুলোকে বন্দি করেছিলাম সারা জীবনের জন্য, আজ মনে হয় কুরুক্ষেত্রের অন্যায় যুদ্ধে আমার চোখ দুটো সত্যিই অন্ধ ছিল। আমার হৃদয়ের প্রেমের আর্তি ডুবে গেছে রক্তস্রোতে। আমার চারপাশে মানবতার ক্ষান্তিহীন আর্তনাদ শুনেও চোখ-কানকে বন্ধ করে রেখেছিলাম অনিবার্যভাবেই। আজীবন পতিব্রতা হয়েও কোনো আদর্শ হয়ে উঠতে পারিনি আমি। কুরুক্ষেত্রের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো জেগে আছে আমার স্নেহান্ধ খোলা চোখ। মনের এক গহন জটিলতা আমাকে ক্লান্ত করেছে বারবার। আমার ইচ্ছা, চিন্তা, স্বপ্নকে করেছে বেদনাহত। তাই চোখের সামনে আজ শুধু ধোঁয়া আর কুয়াশার মাঝে লাখ মানুষের মৃত্যুর ভার। হ্যাঁ, আমারই মনের অবচেতনে পড়ে ছিল দুর্যোধনের প্রতি অতি সূক্ষ্ম পক্ষপাত যা ক্রমে ক্রমেই পরিস্থিতিকে নিয়ে গিয়েছিল নিষ্ঠুরতার দিকে। মনের গভীরের এক পার্থিব দ্বন্দ্ব আমাকে পেঁৗছাতে দেয়নি অপার্থিব চেতনার শুদ্ধতার মাত্রায়। আমি হেরে গেলাম নিজের কাছে।
ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হওয়ার কারণে প্রকৃত রাজা হতে পারেননি কখনো। যদিও তিনিই রাজ্যভার সামলানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন দীর্ঘ সময় ধরে। রাষ্ট্রকে তিনি ধারণ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু অন্ধত্বকে অতিক্রম না করার দুঃখ ছিল তাঁর মনের অতলে। যখন শুনতে পেলাম বাবা সুবল রাজা আমার বিবাহ স্থির করেছেন ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে, কোনো এক অজানা কারণে আমি স্ব-আরোপিত অন্ধত্বকে বরণ করে নিলাম। সবটুকুই যে পতিব্রতা হওয়ার জন্য তা নয়, বরং অন্ধরাজার মনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো নিশ্চিহ্ন করে ফেলার জন্য নিজের মধ্যে একটি মীমাংসিত মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। যদিও শেষ পর্যন্ত এই অন্ধত্বের অভ্যাস আমাকে কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্ধত্বের কূপগৃহ থেকে বের হয়ে আসতে দেয়নি। হতাশার এক বিচিত্র অন্তঃক্রিয়া, যেমনভাবে ধৃতরাষ্ট্রের মনে অনন্ত জটিলতা তৈরি করেছিল, তেমনিভাবে স্বামীর প্রতি সমব্যথী হওয়ার জন্য আমার অন্তরকেও ঈর্ষায় পুড়িয়ে দিয়েছিল। তাই যখন শুনতে পেলাম, কুন্তী পুত্রলাভ করেছে, আমার সহ্য হলো না। ধৃতরাষ্ট্র চেয়েছিল, আমাদের সন্তান জ্যেষ্ঠতা অনুসারে রাজ্যলাভ করুক। কিন্তু সবই দুর্ভাগ্য। দুঃখে অধীর হয়ে আমি আমার নিশ্চল গর্ভে আঘাত করলাম। কেন করলাম! সেই মাংসময় পেশি প্রসব করে আমি ফেলে দিতেই উদ্যত হয়েছিলাম। এক অক্ষম ঈর্ষা আমাকে চরম অধৈর্যের দিকে এগিয়ে দিল। আরো বেশি হতাশ হয়েছিলাম ধৃতরাষ্ট্রকে সুখী করতে পারিনি বলে। এই অকালিক গর্ভপাত সত্ত্বেও মহাজ্ঞানী ব্যাসের অসীম করুণায় আর শিবের বরে আমার শতপুত্র জন্মলাভ করল। দুর্যোধনের জন্মের সময়ই তার চিৎকার ছিল অতি কর্কশ। সেই ক্রন্দনধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছিল শেয়াল, শুকুন আর কাকের চিৎকারে।
মহামতি বিদুর বারবার অনুরোধ করলেন, এই শিশুটিকে পরিত্যাগ করার জন্য। কিন্তু আমি যে মা! বংশের মঙ্গল, জগতের মঙ্গল এসবের চেয়েও বড় হয়ে উঠল আমার মাতৃত্ববোধ, আমার অপারগতা।
সময়ের ভাঁজে ভাঁজে এই মাতৃত্ববোধের অঙ্কুর ছড়িয়ে গেছে বহুদূর, আরো দৃঢ় হয়েছে দুর্যোধনের প্রতি ধৃতরাষ্ট্রের বাঁধভাঙা স্নেহ আর প্রশ্রয়ে। ধৃতরাষ্ট্রের রাজা হওয়ার ব্যর্থ স্বপ্ন পিছু নিয়েছিল দুর্যোধনের বাড়ন্ত শরীরে, উঁচুনিচু বিচিত্র মনে। রাজ্য-লিপ্সা ক্রমেই দুর্যোধনকে পরিণত করল খলস্বভাব, দুষ্টুবুদ্ধি আর নির্লজ্জতার ধারক ও বাহক হিসেবে। তার পেছনে ছিল ধৃতরাষ্ট্রের নিঃশব্দ, নিরুত্তর প্রশ্রয়। এই নৈঃশব্দ্যকে সানন্দে মেনে নিয়েছিলাম আমি! হয়তো তা-ই। আর সে জন্যই পাণ্ডুর মৃত্যুর পর যখন কুন্তী তার পাঁচ ছেলে নিয়ে ফিরে এল হস্তিনাপুরে, আমার হৃদয় সংশয়ে কণ্টকিত ছিল। দ্রৌপদীকে প্রথমবার আলিঙ্গন করেই আমি অনুভব করেছিলাম, এ দ্রৌপদীই আমার পুত্রদের মৃত্যুর কারণ হবে।'
গান্ধারীর স্বীকারোক্তি রাতের অন্ধকারে ফিসফিস শব্দ করে ভাসে, বৃক্ষগুলো নীরব বনের মাঝে স্তম্ভিত। গান্ধারীর শরীর আর মনের নির্লিপ্ততা কোনো এক ত্রিকালজ্ঞ বোধের দিকে ধাবিত হয়। আকাশে জ্বলে ওঠা ছড়ানো-ছিটানো তারাগুলো গভীর অন্ধকারে নানা সুদীর্ঘ প্রশ্ন নিয়ে ঝুঁকে পড়ে গান্ধারীর নিরাশ্রয় মনের ওপর। মন্থর সময়গুলো যখন মনের নিবিষ্ট দর্পণে নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায়, গান্ধারী নিজের দিকে তাকিয়ে চমকায়। আবারও সে ভাবতে থাকে :
'হায় যুদ্ধ। নিজের ভেতর আর কোনো শব্দ নেই, যখন কুরুক্ষেত্রের ধ্বংসস্তূপের স্মৃতি ভাসে। কী দেখলাম ধোঁয়া আর কুয়াশার ভেতর অদ্ভুত আর লোমহর্ষণ রণস্থল। অস্থি, কেশে, রক্তপ্রবাহে আপ্লুত, মস্তকশূন্য দেহ আর দেহশূন্য মস্তকে আচ্ছাদিত। প্রাণহীন দেহে ব্যাপ্ত হয়েছে গৃধ্নু, শৃগাল, বক ও দাঁড়কাকেরা। নানা নিশাচর জন্তু ছিঁড়ে খাচ্ছে কৌরবদের রক্তমাংস। তাঁদের স্বর্ণনির্মিত বাজুবন্ধ, আর মালাগুলো ছড়িয়ে পড়েছে মৃতদেহের আশপাশে। শোক বিহ্বল চিত্ত কৌরবনারিরা খণ্ডিত মস্তকগুলো দেহের সঙ্গে মিলিয়ে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে তাঁদের স্বামীদের। হঠাৎ আমি দুর্যোধনকে শনাক্ত করতে পারলাম। রক্তসিক্ত দেহে ভূমিতে লুটিয়ে আছেন, তাঁর পাশে ভানুমতী অচেতন। আমার সব ইন্দ্রিয়ই শোকে বিকল হয়ে গেল। অদূরে শায়িত দুঃশাসন, কর্ণ, জয়দ্রথ, দ্রোণ, ভুরিশ্রবা, অভিমন্যু। দুঃশলা ও উত্তরার চিৎকার আর বিলাপে আমার চৈতন্য লোপ পেল।'
হঠাৎ গান্ধারী সংবিত ফিরে পায়। নিজেকেই প্রশ্ন করে, 'এ যুদ্ধ কি এড়ানো যেত! অন্ধকারে সেই প্রশ্ন আকাশমুখী হয়ে দিগ্দিগন্তে ছড়িয়ে যায়। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস হু হু করে উঠছে, হৃৎকম্পন হচ্ছে কেঁপে কেঁপে। এই নিষ্পাপ অন্ধকারে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে আমার নিরর্থক জীবন। হয়তো থামানো যেত এই যুদ্ধ, যদি তীব্র অধিকার নিয়ে সেদিনই অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে পারতাম দুর্যোধনের শ্লীল স্বার্থমগ্নতা। তার ঔদ্ধত্যের কাছে কেন নরম জননী হয়ে থাকলাম আমি! এত বিপন্নতায়ও কেন আত্মঘাতী হলাম না! বারবার অন্যায় করেছে দুর্যোধন, ষড়যন্ত্র আর ঈর্ষায় লালিত হয়ে উদ্ভ্রান্ত হয়েছে সে। ভীমকে বিষ খাওয়ানো, জতুগৃহের ষড়যন্ত্র, পাশা খেলা! হ্যাঁ, ওই একবারই আমি তীব্র আর্তি প্রকাশ করেছিলাম, যখন দ্বিতীয়বার পাশা খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল দুর্যোধনরা। আমার স্তব্ধ বুক থেকে গড়িয়ে পড়েছিল রক্ত, যেদিন অবগুণ্ঠিতা দ্রৌপদীকে সভাস্থানে নগ্ন করার প্রয়াস নেওয়া হয়। আমার আত্মা হতে নিঃসৃত তির্যক চিৎকারও রুদ্ধ করতে পারেনি দুর্যোধনের ঊরু প্রদর্শনের নিলর্জতা, ঊরুর গভীরে থেমে থাকা ভীমের ক্রোধ, দ্রৌপদীর শ্লীলতাহানির অসহায়তা, আমার আহত সত্তায় বারবার উচ্চারিত হয়েছে_যথা ধর্ম তথা জয়।
হায় আমার আত্মজরা, আজ সবাই মৃত। আমার ভেতরে নিঃশব্দে বহমান মাতৃত্ব আজ ম্লান। সংঘর্ষ, রিরংসা আর মৃত্যু_বিদ্ধ শরীরগুলোই আজ শেষ ঠিকানা। হয়তো আরো যুদ্ধ হবে হাজার বছর পরে। সবুজ উপত্যকা পরিণত হবে মৃত্যু-উপত্যকায়। আকাশের নীলে ছড়িয়ে থাকবে বিপন্ন অসহায়তা, মানুষের পচনশীল মস্তিষ্কের দুর্গন্ধ ছড়াবে আকাশে- বাতাসে। যুদ্ধ আর কিছুই দিতে পারে না মৃত্যুর ক্ষত ছাড়া। এই অন্ধকারের নির্জন নীরবতায় আমি আমার বুদ্ধির গণ্ডির মাঝে একমাত্র পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে চাই। এই ব্যক্তিগত গণ্ডি অতিক্রম করে অনন্তের মাঝে বিলুপ্ত হতে চাই। একটু পরেই প্রভাতের মূর্ছনায় প্রতিদিনের সূর্য উঠবে, বিস্ময় চিহ্নের মতো!'
নীরবতার সঙ্গে অদৃশ্য কথোপকথনের পর ভাঙাচোরা স্মৃতিগুলো হাতে নিয়ে আকাশের গায়ে আঁকা অস্পষ্ট রেখার দিকে খোলা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে গান্ধারী। আর ভাবে, আকাশে কী কখনো চিত্রিত হবে বেদনার ইতিহাস!

No comments

Powered by Blogger.