অবশেষে এনবিআরের বোধদ্বয়-প্রধানমন্ত্রী কর দিয়েছেন, মন্ত্রী-এমপিরা কেন নয়?

মন্ত্রী-এমপিদেরও আয়কর দিতে হবে। এই সিদ্ধান্তে অবশ্যই জনগণ সন্তুষ্ট হবে। তারা বুঝবে আইন সবার জন্যই সমান। বর্তমান বাজেট পেশ করার সময় ঘোষণা করা হয়েছিল, এখন থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী-এমপিরাও আয়কর দেবেন। সে সময় এই ঘোষণাটি সব মহলেরই প্রশংসা কুড়িয়েছিল।


কিন্তু আয়কর বিবরণী জমা দেওয়ার শেষ সময়ের দুদিন আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংসদ সচিবালয়কে চিঠি দিয়ে জানায়, তাঁদের কাউকেই আয়কর দিতে হবে না। কারণ হিসেবে জানানো হয়েছে, মন্ত্রী-এমপিদের আয়কর থেকে অব্যাহতি দিয়ে অতীতে যেসব বিধান করা হয়, জাতীয় সংসদে সেই বিধানগুলো বাতিল বা সংশোধন করা হয়নি। ফলে তাঁদের আয়কর নেওয়া যাচ্ছে না। তবে একই সময়ে সরকারি কর্মচারীদের আয়কর নিজেদের পরিশোধের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেটি বলবৎ থাকবে। এর ফলে, প্রশ্ন ওঠে এই বৈষম্য কেন, যেখানে খোদ প্রধানমন্ত্রী তাঁর যাবতীয় কর পরিশোধ করেছেন। অবশেষে সেই বোধদ্বয় হওয়ায় এনবিআরকে ধন্যবাদ, তারা চিঠি প্রত্যাহার করেছে।
একজন এমপি বেতন-সম্মানী-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে মোট এক লাখ ৫০০ টাকা পেয়ে থাকেন। এর বাইরেও তাঁরা বিভিন্ন রকম সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে আছে এমপিদের সরকারি বাসস্থানের আনুষঙ্গিক খরচ হিসেবে মাসিক চার হাজার টাকা, সংসদ অধিবেশন চলাকালে প্রতিদিন ৫০০ টাকা। আবার বিনাশুল্কে তাঁরা চাইলে কয়েক কোটি টাকা দামের তিনটি পর্যন্ত গাড়ি আমদানি করতে পারেন এবং তা করেছেনও। সব মিলিয়ে বলা যায়, রাষ্ট্র যেন এমপিদের জন্য তার সব সুযোগ-সুবিধার দ্বার অবারিত করে দিয়েছে। আর এমপিদের নির্বাচনকারী সাধারণ মানুষের জন্য বেঁচে থাকার সব পথই যেন রুদ্ধ করা হয়েছে। এই বৈষম্য কেন ?
এবারের ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের যতটা কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত আর কখনো তাদের এমন কষ্ট ভোগ করতে হয়নি। যোগাযোগমন্ত্রী বলেছিলেন, মাত্র ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েও পাওয়া যায়নি, তাই টাকার অভাবে সময়মতো সড়কগুলোর সংস্কার করা যায়নি। অথচ গত ২০ আগস্ট কালের কণ্ঠে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, সরকারি ও বিরোধী দলের ১৮০ এমপির শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে ৫৫৫ কোটি টাকা। জনগণ এমপিদের নির্বাচিত করেন এই আশায় যে তাঁরা জনগণ ও দেশের স্বার্থ দেখবেন। এটাই কি তাঁদের জনস্বার্থ দেখার নমুনা? অর্থনৈতিকভাবে ভারত আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সেখানকার এমপিদের অনেকেরই ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, অনেকে দেশপ্রেম থেকে সে দেশে তৈরি গাড়িতে চড়েন। হাতে গোনা কয়েকজন এমপি পাওয়া যেতে পারে, যাঁরা বিদেশি বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন। কিন্তু বিনা শুল্কে তাঁদের কাউকেই গাড়ি আমদানি করতে দেওয়া হয় না। তাতে কি ভারতের এমপিরা মান-মর্যাদায় কোথাও পেছনে পড়ে গেছেন? আর এত সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও আমাদের জাতীয় সংসদ কি খুব একটা কার্যকর হতে পেরেছে? বরং আমরা লাগাতার সংসদ বর্জনের রেকর্ড গড়ে চলেছি।
দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের অধিকাংশেরই দুই বেলা দুমুঠো ডাল-ভাত জোগাড় করতে কষ্ট হয়। অথচ মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন পান (বছরে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা) এমন প্রত্যেক কর্মচারীকে আয়কর দিতে হয়। আর একজন এমপি, যাঁর প্রতি মাসেই এক লাখ ৮০ হাজার টাকার মতো কিংবা আরো বেশি আয় হয়, তিনি কেন আয়কর দেবেন না? প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে শান্তির যে মডেল দিয়েছেন, তাতে বৈষম্য লাঘব করা একটি অন্যতম শর্ত। তাই মন্ত্রী-এমপিদের অবশেষে করের আওতায় আনার বিষয়টিকে জনগণ প্রশংসার দৃষ্টিতেই দেখবে।

No comments

Powered by Blogger.