প্রশ্নপত্র ফাঁস-নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম আর কতদিন?

খাদ্য বিভাগের অধীনে প্রায় এক হাজার জনবল নিয়োগে শুক্রবার অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন আগের রাতে ফাঁস হয়ে যাওয়ার যে অভিযোগ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠেছে, তা আমাদের কাছে সত্যি বলে মনে হয়। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে এর সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন আটক হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ফটোকপির দোকানগুলোতেও প্রশ্নপত্রটি সহজলভ্য ছিল বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। অবশ্য এ ধরনের অঘটন আমাদের দেশে নতুন নয়।


এর আগেও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হতে দেখা গেছে। ২০১০ সালের জুলাইয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাতেও একই দুর্ভাগ্যজনক চিত্র আমরা দেখেছি। কিন্তু খোদ খাদ্য সচিবের কাছে বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তির অভিযোগের পরও যেভাবে পরদিন পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, তার নজির কমই। আমরা মনে করি, কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল পরীক্ষাটি অন্তত স্থগিত করা। তাতে করে জটিলতা কমত। সচিব প্রক্টরের সঙ্গে টেলিফোনে দুর্ব্যবহার করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তাও কম গুরুতর নয়। অভিযোগকারী নাগরিকের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ অনিয়মের প্রতিবাদকে নিরুৎসাহিতই করবে। আশা করি, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হবে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগকে আমরা সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানাতে চাই। কারণ এ দেশের অনিয়ম তদন্তের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। অনেক ক্ষেত্রে সময় বৃদ্ধি করতে করতে এক পর্যায়ে বিষয়টি ভুলেই যাওয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়ার তালিকাও দীর্ঘ। আবার তদন্ত কমিটির সুপারিশ হিমাগারে চলে যায় অহরহ। খাদ্য উপ-পরিদর্শক ও নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক নিয়োগের এই প্রক্রিয়ায় তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। কমবেশি আড়াই লাখ কর্মপ্রত্যাশীর সঙ্গে তামাশা করার অধিকার কারও নেই। কয়েক দিন আগে খাদ্য বিভাগেরই পরিদর্শক নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে। সেখানেও একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি-না তাও খতিয়ে দেখতে বলব আমরা। আমাদের মনে আছে, মাধ্যমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায়ও দেখা গিয়েছিল যে একই চক্র বারবার ওই অপতৎপরতা চালিয়েছে। পরিদর্শক নিয়োগ পরীক্ষায় 'সাফল্য' উপ-পরিদর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসাহ জুগিয়েছে কি-না, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার প্রশ্নেই তা দেখা জরুরি। দ্বিতীয় দফার প্রশ্নপত্র যে প্রতিষ্ঠানে প্রণীত এবং যে প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত হয়েছে, তাদের প্রতিও অভিযোগের তর্জনী উঠেছে। বিষয়টি আমলে নেওয়া জরুরি। পরস্পর দোষারোপের খেলা না খেলে প্রতিষ্ঠানগুলো তদন্তে সহায়তা করবে বলে প্রত্যাশিত। বস্তুত দক্ষ ও শিক্ষিত জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে চাইলে গোড়ার এসব গলদ আমাদের দূর করতেই হবে। বারবার প্রশ্ন ফাঁসের পুনরাবৃত্তি প্রশাসনযন্ত্রের দৈন্যই তুলে ধরে। নিয়োগ পরীক্ষার গোপনীয়তা ও পবিত্রতা কেন রক্ষা করা যায় না, সে বিষয়েও গভীর চিন্তা-ভাবনার সময় এসেছে। স্বাধীনতার ৪০ বছর চলছে। এখনও যদি আমাদের প্রশাসন নিয়োগ পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ কী? বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, এ ধরনের অঘটনের সঙ্গে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিচু পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও জড়িত থাকে। আমরা আশা করি, এর সঙ্গে জড়িতরা যেই হোক, যে পর্যায়েরই হোক, কোনোরকম ছাড় পাবে না। বর্তমান সরকার ঘরে ঘরে কর্মসংস্থানের যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করেছিল; অনিয়মের কারণে একই পরীক্ষা বারবার গ্রহণ করতে হলে, তা সুদূরপরাহতই থেকে যাবে।

No comments

Powered by Blogger.