ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা!-প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যেন বিড়ম্বনার শিকার না হন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় ৯ হাজার ২০৬ জন প্রার্থী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সনদগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে। পরে নিয়োগযোগ্য বিবেচনায় আরো ১৬১ জনের সনদ পাঠানো হয়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় জানায়, সাত হাজার ২০৬ জনের সনদ বৈধ, বাকি এক হাজার ৪৯৬ জনের সঠিক নয়।


৩৬১ জনের সনদ উপযুক্ত নয়, ৩৯০ জনের যাচাইয়ের উপযুক্ত নয় এবং ৫৫৮ জনের সনদ বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সনদ বিতরণ নিবন্ধে পাওয়া যায়নি। আর দ্বিতীয় দফায় পাঠানো ১৬১ জনের মধ্যে ৭৮ জনের সনদ সঠিক, পাঁচজনের ভুয়া, ছয়জনের অস্পষ্ট, ১৪ জনের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নিবন্ধন তালিকায় নেই এবং ৫৩ জনের সনদ প্রত্যয়নের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। ক্যাটাগরি বা বিবেচনার অনুক্রমের যেন কোনো অভাব নেই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা সাজার এবং মুক্তিযোদ্ধা বানানোর বহু খেলা হয়েছে। খেলা যে শেষ হয়ে গেছে, তা-ও বলা যাবে না। যতবার সরকার বদলেছে, ততবারই মুক্তিযোদ্ধাদের 'সঠিক' তালিকা বানানো হয়েছে। সে কারণে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কেবলই বেড়েছে, আর বহু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সনদহীন হয়ে পড়েছেন, যা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার। জানা গেছে, আবারও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ফরম বিতরণ করা হয়েছে সঠিক মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরির জন্য।
যতদূর জানা যায়, ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এক লাখ ২৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা প্রত্যেকে চার পৃষ্ঠার একটি ফরম পূরণ করেছিলেন। ভারতে থাকাকালে ৩০ রুপি করে ভাতা পেতেন, স্বাধীনতার পর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকেও তাঁদের মোটা রেজিস্টারে স্বাক্ষর নিয়ে এককালীন কিছু টাকা দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কেউ কেউ যদি পরবর্তী সরকারগুলোর আমলে মন্ত্রণালয় বা সংসদে গিয়ে সার্টিফিকেট গ্রহণ করাকে বিড়ম্বনা বলে মনে করেন, তাহলে তাঁরা কি 'গলদ' মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবেন? অনুরূপভাবে অনেকে দেশের ভেতরে থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের সংখ্যা কত হবে? সব মিলিয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের মোট সংখ্যা দুই লাখের কমই থাকার কথা। অথচ সত্তরের দশকের শেষ দিকে এই সংখ্যা সম্ভবত পাঁচ-সাত লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এরশাদের শাসনামলে তা আবার এক লাখ দুই হাজারে নেমে আসে। ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সম্ভবত তা এক লাখ ৮০ হাজারে পেঁৗছায়। বিগত জোট সরকারের আমলে তা দুই লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। অভিযোগ আছে, এই প্রক্রিয়ায় ঘুষ দিয়ে বা ক্ষমতাধরদের কাছে ধর্না দিয়ে অনেকে সনদ নিয়েছেন। এভাবে কেউ মুক্তিযুদ্ধ না করেই সনদ পেয়ে গেলেই কি তিনি সঠিক মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবেন?
স্বাধীনতার চার দশক পরে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই আর আমাদের মধ্যে নেই। যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁদেরও অধিকাংশের বয়স ষাটের কোঠায় বা সত্তরের কোঠায় চলে গেছে। অনেকে অসুস্থ। এখন নিজেকে সঠিক মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ পেতে কিংবা স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় সংসদে গিয়ে ধর্না দিতে হয়তো তাঁদের অনেকেরই রুচিতে ও শক্তিতে কুলাবে না। বর্তমান সরকারের প্রতি অনুরোধ, ষাটোর্ধ্ব বা সত্তরোর্ধ্ব কিংবা অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন করে বিড়ম্বনায় না ফেলে কিভা
বে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করা যায়, তার সঠিক ও কার্যকর উপায় বের করুন। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকেও যদি 'ভুয়া' বলা হয়, তাহলে সেটি হবে পুরো জাতির জন্য লজ্জার।

No comments

Powered by Blogger.