২০ বছরে লোকসান ১৩৯ কোটি টাকা-রাজশাহী চিনিকল by কাজী শাহেদ,

দীর্ঘ ২০ বছর ধরে লোকসান গুনছে রাজশাহী চিনিকল। এ অঞ্চলে আখ চাষের পরিমাণ আগের তুলনায় কমে গেছে। কমেছে চিনির উৎপাদন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত জনবল। মৌসুম শেষে মিলের গুদামে অবিক্রীত থাকছে বিপুল পরিমাণ চিনি। পরের বছর তা কম দামে বিক্রি করতে হয়। ফলে প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হচ্ছে মিলটিকে। ২০ বছরে মিলটি লোকসান দিয়েছে ১৩৯ কোটি টাকা।


রাজশাহী চিনিকল সূত্র জানায়, ১৯৬২ সালে চিনিকলটি স্থাপিত হওয়ার পর ১৯৬৫-৬৬ মৌসুমে উৎপাদনে আসে। ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত মিলটি লাভের মুখ দেখে। ১৯৯১ সালের পর থেকে রাজশাহী চিনিকল প্রতিবছর লোকসান দিয়ে আসছে। ১৯৯১ সালের পর চিনিকলটিতে নিয়োগ দেওয়া হয় চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের বেতন-ভাতা মেটাতে মিলটি লোকসানি খাতে চলে যায় বলে অনেকে মনে করেন। সর্বশেষ গত মৌসুমে মিলটিকে লোকসান দিতে হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। তবে লোকসানের অন্যতম কারণ হিসেবে চিনিকলের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আখ চাষে এ অঞ্চলের কৃষকদের অনাগ্রহকে। এ ছাড়া যারা আখ চাষ করছেন, তারা চিনিকলে আখ সরবরাহ না করে নিজেরা গুড় উৎপাদন করে থাকেন। এতে মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে আখ সংকটে পড়ে মিলটি।
স্থানীয় আখ চাষিরা জানান, চিনিকলে আখ সরবরাহ করে তারা যে টাকা পান, তার চেয়ে গুড় উৎপাদন করলে বেশি লাভ হয়। এ ছাড়া আখের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে চাষিরা আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে রাজশাহী চিনিকল এলাকায় ২২ হাজার ২১ একর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছিল। গত মৌসুমে ১০ হাজার ৮৬০ একর জমিতে আখ চাষ করা হয়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
জানা যায়, রাজশাহী চিনিকলে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ হয় ৪৩ টাকা। সেই চিনি বাজারে বিক্রি হয়ে থাকে ৩৫ টাকায়। ফলে প্রতি কেজি চিনিতে লোকসান দিতে হয় ৮ টাকা। গত মৌসুমে ৯০ হাজার টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। দেড় লাখ টন চাহিদার এ মিলটি গড়ে আখ সরবরাহ পায় মাত্র ৩৫-৪০ হাজার টন। ২০০৯ সালে মিলটিকে লোকসান গুনতে হয়েছে ১৪ কোটি ৭৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। ২০০৮ সালে লোকসান দিতে হয়েছে ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ২০১০ মৌসুমে লোকসান দিতে হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। ২০ বছরে এভাবে মিলটিকে লোকসান দিতে হয়েছে ১৩৯ কোটি টাকা।
রাজশাহী চিনিকলে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত জনবল থাকায় উৎপাদন খরচে এর প্রভাব পড়ছে। অতিরিক্ত জনবলের বেতন-ভাতা দিতে গিয়ে দিন দিন লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে বলে কর্মকর্তারা মনে করেন। বর্তমানে রাজশাহী চিনিকলে ৬৯ স্থায়ী কর্মকর্তা, ৩৮৬ স্থায়ী কর্মচারী, ১৮৪ স্থায়ী শ্রমিক, ৪৭ চুক্তিভিত্তিক ও ৪৪৫ মৌসুমি শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করে থাকেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মিলটিতে। এরপর থেকে প্রতিবছর লোকসানের পাল্লা ভারী হয়েছে।
রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল-আমিন জানান, এ বছরও মিলটি লোকসানের আশঙ্কা নিয়ে মাড়াই মৌসুম শুরু করছে। পাওয়ার ক্র্যাশারের মাধ্যমে যেভাবে আখ মাড়াই শুরু হয়েছে, তাতে মিলটি চাহিদা অনুযায়ী আখ সরবরাহ না পাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে পাওয়ার ক্র্যাশারে আখ মাড়াই বন্ধে এলাকাগুলোতে মাইকিং, পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আখ না পাওয়ায় মিলটির লোকসান বাড়বে বলে জানান তিনি। 

No comments

Powered by Blogger.