সুনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস by আখতারুন নাহার আলো

জ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস রোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশন (আইডিএফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সালের ১৪ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই দিনে বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেনটিং জন্ম নিয়েছিলেন, যিনি পরে বিজ্ঞানী চার্লস বেস্টের সঙ্গে মিলে ইনসুলিন আবিষ্কার করেছিলেন।মানবদেহের রক্তে গ্গ্নুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেই ডায়াবেটিস হয়েছে বলা হয়। যেহেতু এটি বিপাকক্রিয়ার বিশৃঙ্খলার জন্য হয়ে থাকে সে জন্য একে বিপাকজনিত রোগও বলা হয়।


দেহে ইনসুলিন নামক হরমোনের ঘাটতি থাকলে রক্তে গ্গ্নুকোজের মাত্রা বাড়তে থাকে। এই রোগ বেদনাদায়ক নয়, আবার ছোঁয়াচেও নয়। তারপরও একে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় সুস্থ জীবনযাপনের লক্ষ্যে।
আসলে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ নয়, খাদ্য ব্যবস্থাপনাই ডায়াবেটিস চিকিৎসার প্রথম সোপান। এই ব্যবস্থাপনা বলতে দেহের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য একটি নিয়ম-পদ্ধতি মেনে চলাকেই বোঝায়। এই কারণে প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পরপর খাবার খেতে হবে। ডায়াবেটিস সম্পন্ন যে কোনো মানুষের ক্ষেত্রে ওজন ঠিক রাখা খুবই জরুরি। অতিরিক্ত ওজন টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ইনসুলিন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে। অধিক ওজনের রোগীদের কম ক্যালরি, অধিক আঁশ, সীমিত চর্বি, প্রয়োজনীয় আমিষযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত। আবার অনেকদিন ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকার দরুন বা টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ওজন কমে গেলে ক্যালরি বেশি দিয়ে খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করতে হবে।
খাবার তালিকায় মাছ বা মাংসের পরিবর্তে ছোলা, মটর, রাজমা, শিমের বীচি, ডাল রাখলে ভালো হয়। খাবারে ভিটামিন, খনিজ লবণ ও আঁশ পেতে হলে খেতে হবে সবজি, ফল ও শস্য। এ জন্য মোট খাবারের অর্ধেক থাকবে শস্য এবং পরের অর্ধেক থাকবে মাছ-মাংস-ডাল ইত্যাদি। লবণ ও সোডিয়ামের সীমিত ব্যবহার দরকার। দেহে জলের সমতা বজায় রাখার জন্য লবণ অক্সাইড প্রয়োজন।
ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ব্যায়াম খুব উপকারী। বেশি ব্যায়াম এবং খাবার অথবা না খেয়ে থাকা কখনও ঠিক নয়। ব্যায়াম করতে যাওয়ার আগে হালকা কিছু খাবার, যেমন_ বিস্কুট, মুড়ি, খই ইত্যাদি ১৫ গ্রামের যত বেশি খেয়ে যাওয়া উচিত।
মোটকথা ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম, কিছু বিষয় মনে রাখতে পারলে রোগটিকে আয়ত্তে আনা খুব সহজ। যেমন_ কী খেতে হবে অর্থাৎ কী ধরনের খাবার গ্রহণযোগ্য সেটা নিজেরই সবসময় মনে রাখতে হবে। কতটুকু খেতে হবে তা মনে রাখতে হবে। তাহলে ঘরে-বাইরে দাওয়াতে যেখানেই খাবার খাওয়া হোক না কেন, নিজ নিজ পরিমাণটুকু জানা থাকলে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এ ব্যাপারে অনুরোধে ঢেঁকি গেলা যাবে না অর্থাৎ অন্যের জবরদস্তিতে সাড়া না দিয়ে নিজস্ব পরিমাণ বজায় রাখলেই নিরাপদে থাকা যাবে। ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে খাদ্য গ্রহণের সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় নির্ভর করবে ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাসের ওপর। রোগী নিজেই তার সময় নির্ধারণ করবেন। তবে একেকদিন একেক সময় খাবার খাওয়া যাবে না। এতে রক্ত শর্করার মাত্রা ওঠানামা করবে। একটা শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে খাবার গ্রহণ করতে হবে দিনে পাঁচ-ছয়বার। একটি খাবার থেকে পরবর্তী খাবারের বিরতি দুই ঘণ্টা নয় আবার চার ঘণ্টাও নয়। প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগীরই হাইপারগ্গ্নাইসেমিয়া (উচ্চতর শর্করা) এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকতে হবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তির জীবনে সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখে।
আখতারুন নাহার আলো : প্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান, পুষ্টি বিভাগ, বারডেম

No comments

Powered by Blogger.