বিরোধী দল- বর্জনে কোনো অর্জন নেই by আলী ইমাম মজুমদার

বিরোধী রাজনৈতিক জোট বেশ কয়েক মাস ধরে এই সরকারের অধীনে যেকোনো নির্বাচন বর্জন করে চলেছে। তাদের দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন হতে হবে। দাবিটি রাজনৈতিক।


তাই সরকার ও বিরোধী দলের আলাপ-আলোচনা করে লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য একটি সমঝোতায় আসার আবশ্যকতা রয়েছে। তবে জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকালে তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার সুযোগ নেই এবং এ ধরনের কোনো দাবিও বিরোধী দলসমূহের নেই। তা হলে তারা এগুলো বর্জন করে চলেছে কেন? আর এতে লাভবানই বা কেউ হচ্ছে কি না আর হলে তা কীভাবে?
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনের বিধান অনুসারে অরাজনৈতিক। সুতরাং কোনো রাজনৈতিক দলের বর্জন এতে তেমন প্রভাব ফেলে না। তাদের অনেক নেতা, কর্মী, সমর্থককে নির্বাচন থেকে বিরতও রাখা যায় না। এটা দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। কুমিল্লায় তো তাদের দলের একজন নেতা ব্যক্তিগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও সরকারি দলের সমর্থিত প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। আসন্ন রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাদের এহেন ভূমিকা অব্যাহত থাকলে মেয়র কিংবা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে তাদের কর্মী-সমর্থকদের বিরত রাখতে কতটা সক্ষম হবে, এটা দেখার বিষয়। তাই বাস্তবতা মেনে নিয়ে এই নির্বাচনগুলোতে অংশ নিলে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ে। জয়লাভের সম্ভাবনাও থাকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। অবশ্য ব্যাপারটা নিশ্চয় তারাই ভালো বুঝবে। তবে সাধারণত দেখা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় দু-একটি দল অংশ না নিলেও জনগণের অংশগ্রহণ কম হয় না। কেননা, এসব নির্বাচনে সাধারণত স্থানীয় ইস্যু ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রাধান্য পায়। জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু এখানে গৌণ ভূমিকাতেই থাকে। অবশ্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো জনবহুল মহানগরে রাজনৈতিক ভূমিকা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় থাকার কথা।
তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বা উপনির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে হয়। এখানে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ না থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ও প্রাণহীন হয়ে যায় সেই নির্বাচন। আইনি বৈধতা ঠিকই পান বিজয়ী প্রার্থী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি এ আলোচনার প্রতিপাদ্য নয়। সেখানে জয়লাভের সঙ্গে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভের প্রশ্ন রয়েছে। তদুপরি এর পরিসরও ব্যাপক। কিন্তু উপনির্বাচনে অংশ না নিয়ে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের তৎপর হওয়ার এবং ক্ষেত্রবিশেষে জয়লাভের সুযোগ তারা ছেড়ে দিচ্ছে কেন, এটা অনেকের কাছেই বোধগম্য নয়। এমনটা কিন্তু ঘটেছিল আগের সরকারের আমলেও—‘এ সরকারের বা কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচন নয়’ যুক্তি দেখিয়ে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত কিছুটা ভিন্ন। সাফল্যের দাবিদার অনেকেই। তবে বিনা দ্বিধায় বলা চলে, ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশন একটি ইতিবাচক দীর্ঘমেয়াদি ছাপ রেখে দায়িত্ব শেষ করেছে। এটাও স্বীকার করতে হবে, সারা দেশের সব ভোটারের ছবিযুক্ত তালিকা ও ভোটার পরিচয়পত্রও এ ক্ষেত্রে একটি অসাধারণ সংযোজন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সংসদের উপনির্বাচন বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তেমন বড় অভিযোগ করার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। অবশ্য কয়েকটি পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ ছিল। জাতীয় সংসদের বেশ কয়েকটি উপনির্বাচনে (বগুড়া ও হবিগঞ্জ উল্লেখ্য) এবং গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে (যেমন চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন) বিরোধীদলীয় প্রার্থীরাই জয়লাভ করেছেন।
নিকট অতীতের ধারাবাহিকতায় এসব উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক সমাবেশ ঘটে। তেমনি ব্যাপকতর সমাবেশ হয় পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের। এ-জাতীয় একটি পরিবেশে (যেখানে সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নেই) সরকারে যে দলই থাকুক না কেন, তেমন বিরূপ কোনো প্রভাব ফেলার সুযোগই নেই। আর তা যদি ফেলেও, মুহূর্তেই দেশ-বিদেশে সে খবর চলে যাবে গণমাধ্যমের ব্যাপক সমাগমের ফলে। তখন বিরোধী দল একটি যুক্তি নিয়ে সামনে আসতে পারবে। মনে হচ্ছে অনেকটা জেদাজেদির কারণেই তারা এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এতে তাদের সংগঠনের লাভ বা ক্ষতি কতটুকু তা আমাদের বিবেচ্য নয়। আমাদের আশঙ্কা, এ ধরনের নির্বাচন বর্জন গণতন্ত্রের ভিতকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তারা কাপাসিয়া উপনির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ভোটারদের উৎসাহে ভাটা পড়েছে। প্রদত্ত ভোটের শতকরা হার সিইসির বক্তব্য অনুসারে আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ডে সঠিক। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভোট হয়েছিল বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ায়। সামনের উপনির্বাচনগুলোতেও ভোটারের উপস্থিতি এ রকমই হওয়ার কথা।
নির্বাচন বর্জনের মতো আরেকটি সংস্কৃতি আমাদের গণতন্ত্রের পথে যাত্রা ব্যাহত করছে। সেটা হচ্ছে বিরোধী দল কর্তৃক সংসদ বর্জন। এর শুরু পঞ্চম সংসদের মাঝামাঝি সময় থেকে। তখন থেকে যখন যারাই বিরোধী দলে থাকছে, তারা কখনো যথার্থ আর অনেক সময়ই তুচ্ছ বা বিনা কারণে সংসদ বর্জন করছে। যথার্থ কারণেও সংসদ বর্জন না করে সাময়িকভাবে ওয়াকআউট করেও প্রতিবাদ করা যায়। বর্জনকারী দল আবার সদস্যপদ বাতিল যাতে না হয়, সেই সময়সীমা ধরে হাজিরা দিয়ে পদটি বহাল রেখে আবার তথৈবচ। অথচ তাঁরা নিচ্ছেন বেতন-ভাতাসহ অন্য সব সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু জনগণ তাঁদের ম্যান্ডেট দেয় সংসদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করতে। তা হলে এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে এই ম্যান্ডেটের প্রতি তাঁরা বিশ্বস্ত থাকছেন না। অবশ্য তাঁরা অংশ নেন সংসদীয় কমিটির সভায় আর বিদেশভ্রমণে যান সংসদ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে। এটা অবশ্যই মন্দের ভালো। বিরোধী দল তাদের বক্তব্য জনগণের কাছে তুলে ধরতে আয়োজন করে সভা-সমাবেশ ও মিছিলের। মাঝেমধ্যে হরতাল-অবরোধ। তবে এসব আয়োজনে ব্যয় হয় টাকা। আবশ্যক হয় প্রচুর শ্রম। আর জের হিসেবে কারণে-অকারণে পুলিশি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হয় নেতা-কর্মীদের। তবে সরকারি খরচে আরামদায়ক ব্যবস্থায়, টেলিভিশনে দেশব্যাপী বক্তব্য প্রচারের সুযোগ যেখানে রয়েছে, সেই জাতীয় সংসদে গিয়ে তাঁরা জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা অনায়াসে তুলে ধরতে পারেন। অথচ এটাই করা হচ্ছে বর্জন। এতে নিষপ্রাণ হচ্ছে সংসদের অধিবেশনগুলো। দর্শক গ্যালারিও প্রায়ই ফাঁকা থাকছে। সংসদ টিভি চ্যানেলও আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে। এতেও প্রকৃতপক্ষে আমাদের গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হচ্ছে।
যখন যাঁরা বর্জন করেন, তাঁদের প্রধান অভিযোগ—কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয় না। যাঁরা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেন, তাঁদের বিবেচনায় এ বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য। তবে একটি অসমর্থনযোগ্য সংস্কৃতি চালু আছে উভয় পক্ষের কিছু সাংসদের মধ্যে। তা হচ্ছে, অপর দলের স্পর্শকাতর কিছু বিষয় প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিকভাবে তুলে সংসদের পরিবেশকে বিষাক্ত করে বিরোধী দলকে সংসদ বর্জনের সুযোগ করে দেন। অনেক সময় বিরোধী দলের কিছু সদস্যও অকারণে এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে ঘৃতে অগ্নিসংযোগ করেন। সংসদে আলোচনায় কয়েকটি ক্ষেত্রে কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন ভাষার ব্যবহার সচেতন জনগণকে হতবাক করেছে। এ ব্যাপারে সংসদের স্পিকারকে আমরা কিন্তু দৃঢ় ভূমিকায় দেখি না। তিনি দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের আলোকবর্তিকা বহন করছেন এবং একজন সজ্জন ব্যক্তি। তিনি তো জানেন, এ ধরনের বক্তব্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পর্যায়ে পড়ে। সংসদে কোনো সদস্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে সংসদ কার্যপ্রণালি বিধিমালার ১৫ নম্বর বিধি অনুসারে স্পিকার তাৎক্ষণিক সেই সদস্যকে বহিষ্কার করতে পারেন কিছু সময় বা সেই দিনের জন্য। সামপ্রতিককালে আমরা কিন্তু এই বিধির প্রয়োগ একবারও দেখিনি। বরং দেখেছি সেখানে একাধিকবার বিশৃঙ্খল পরিবেশ ঘটতে। বলা বাহুল্য, কোনো আইন কাউকে ক্ষমতা দেয় প্রয়োজনে তা প্রয়োগ করার জন্য। সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীনভাবে এ ধরনের দু-একটি পদক্ষেপ নিয়ে, সাময়িকভাবে আরও তিক্ততা সৃষ্টির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, ইতিহাসের কাছে দায়মুক্ত থাকতে পারেন মাননীয় স্পিকার। সুদূর ভবিষ্যতে এটা ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।
নিকট প্রতিবেশী ভারতের লোকসভার অধিবেশনগুলো একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট হয় এমন কিন্তু নয়। মাঝেমধ্যে তো উভয় পক্ষের হট্টগোলের জন্য স্পিকারকে লোকসভার বৈঠক মূলতবি করতে হয়। তাঁর সভাপতিত্বে আবার হয় নেতাদের সর্বদলীয় বৈঠক। আবার অধিবেশনও বসে। কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। রাজ্য বিধানসভাগুলোর কোনো কোনোটিতে রীতিমতো চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করতে টেলিভিশনে দেখা যায়। আবার আপস হয়। কিন্তু সেখানে তো দিনের পর দিন অধিবেশন বর্জনের কোনো সংস্কৃতি নেই। এভাবেই তো তাদের গণতন্ত্রের ভিত উত্তরোত্তর মজবুত হচ্ছে।
ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষে আমাদের গণতন্ত্রের পাঠ। বাংলা সেখানে অগ্রণীই ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ভারত অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যেও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে জোরদার করে চলেছে। আর সেই বাংলারই বৃহত্তর অংশ আজকের বাংলাদেশ। ঐতিহ্য তো একই। তা হলে আমরা পারব না কেন? আমাদের পথে বাধা অনেক এসেছে এটা যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি, এসব বাধার কারণ আমরাই সৃষ্টি করেছি। এত ঘটন-অঘটনের পরেও কি আমরা বর্জনের সংস্কৃতিই দেখতে থাকব? তা হলে স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্র দুর্বল থেকে দুর্বলতর হবে আর মাশুল দেবে জনগণ। এসব বর্জনে তো আমরা কোনো অর্জন দেখছি না।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

No comments

Powered by Blogger.