প্রশাসক নিয়োগের বিধান অযৌক্তিক- কোম্পানি আইন সংশোধন

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য নতুন আইন করতে হয়। আবার প্রচলিত আইনকানুন, বিধিবিধান সংশোধন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে সময়ের সঙ্গে তালমিলিয়ে চলার জন্য। সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুই ধরনের উদ্যোগই পরিলক্ষিত হচ্ছে।


যেমন কিছুদিন আগে প্রতিযোগিতা আইন জাতীয় সংসদে অনুমোদন করা হলো। আবার কোম্পানি আইন ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বছর খানেক ধরে কোম্পানি আইন সংশোধনের জন্য কাজ চলছে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞের সহযোগিতায়। যেহেতু কাজটি জটিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই সময় লাগছে। এ অবস্থায় তড়িঘড়ি করে যেকোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিতে সরকার কর্তৃক সরাসরি প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ একাধারে বিভ্রান্তিকর ও অযৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয়।
বস্তুত, বিতর্কিত বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) কার্যক্রমের নামে ডেসটিনি গ্রুপের বিরাট অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়ার পরই সরকারের টনক নড়ে। সরকার ডেসটিনি গ্রুপের বিরুদ্ধে এখন নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে আইনি জটিলতায় ডেসটিনিতে প্রশাসক নিয়োগ করা যাচ্ছে না। সে কারণেই কোম্পানি আইনে এ ধরনের সংশোধন করা হচ্ছে বলে সরকারের দিক থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতি সম্প্রদায় সরকারের এই উদ্যোগে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, তাদের উদ্বেগ অত্যন্ত যৌক্তিক। কেননা, সরাসরি প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতার সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশের শিল্প-বাণিজ্যে পড়তে বাধ্য। তাই বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ নেই।
প্রথমত, ডেসটিনি বা হল-মার্কের মতো প্রতিষ্ঠান অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার কাজটি হঠাৎ করে করেনি; কিংবা খুব লুকিয়ে-ছাপিয়েও করেনি। বছরের পর বছর প্রশাসনের নাকের ডগায় ডেসটিনি কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, ফুলেফেঁপে উঠেছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে অনেক আগেই লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারই সময়মতো পদক্ষেপ নেয়নি। পরিস্থিতি যখন অত্যন্ত জটিল রূপ নিয়েছে, তখন সরকারের সক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে। কথা হলো, সেই সক্রিয়তার দায় দেশের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কেন বহন করবে? দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান আইনেই আদালতের মাধ্যমে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করার সুযোগ আছে। যদি এই প্রক্রিয়ায় ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে, তাহলে সেটা সংশোধনের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। তৃতীয়ত, পুরো বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের সঙ্গে আলোচনা না করে সরকারের একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। চতুর্থত, সরাসরি প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতার রাজনৈতিক অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটিকে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের মতামত প্রকাশের গণতান্ত্রিক চর্চা রহিত বা নিয়ন্ত্রণ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। পঞ্চমত, এই ধরনের ক্ষমতা বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
সামগ্রিক বাস্তবতায় সরকারের উচিত হবে, বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা-বিশ্লেষণ করা। তবে ইতিবাচক দিক হলো, মন্ত্রিপরিষদে সংশোধনীটি নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে আর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার দ্বার খোলা রাখা হয়েছে। ভালোভাবে বিচার-বিবেচনা করে অযৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে সরকার বিরত থাকবে, এটাই প্রত্যাশিত।

No comments

Powered by Blogger.