ওরা জনগণের কথা বলে—কিন্তু জনগণ কারা? by ব্রিগেডিয়ার (অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ নুরাল হক্, পিএসসি

শিরোনামের প্রথম অংশটি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচরণকারী সবার উচ্চকিত উক্তি। আর প্রশ্নটি আমার মতো হয়তোবা আরও অনেকের। আর লেখার শুরুতেই পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাংলাদেশের জনমানুষ তথা জনগণের কয়েকটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। তা হলো প্রথমত, বাংলাদেশের ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ মানুষ মুসলমান।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ মানুষ বাংলায় কথা বলে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ মানুষ কৃষিকাজ তথা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। চতুর্থত, বাংলাদেশের ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। যদিও সরকারি ও সুশীল (?) সমাজের পরিসংখ্যানে এ সংখ্যা হলো মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বেশি। পঞ্চমত, আপামর জনমানুষের সক্রিয় সম্পৃক্ততায় স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম; যা সমসাময়িক বিশ্বে একটি বিরল ঘটনা। ষষ্ঠত, বাংলাদেশের জনমানুষ ঐতিহাসিকভাবে অতিথিপরায়ণ জাতি হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের প্রয়োজনে অকল্পনীয়ভাবে নিষ্ঠুর।
এর আগেও বেশ ক’বার আমি লিখেছি যে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের (ঈড়হপবঢ়ঃঁধষ ষবাবষ) সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই পর্যায়ে প্রণীত নীতিমালার অনিশ্চয়তার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কারণ, এ পর্যায়ে সব নীতিমালাই প্রণীত হয় মূলত পরিসংখ্যান ও অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে। বাস্তবতা হলো—প্রথমত, বাংলাদেশের সবরকমের পরিসংখ্যানের অবস্থা এখন হ-য-ব-র-ল। আর অতীতের অর্জিত অভিজ্ঞতা আজ কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য ও কারও কাছে সুখকর নয়। দ্বিতীয়ত, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রণীত নীতিমালা সব ক্ষেত্রে প্রায় সবসময়ই দৃষ্টিকটুভাবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে প্রণীত। অর্থাত্ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যেই প্রণীত হয়েছে সবসময়ই তথাকথিত জনগণের নামে। আর এই তথাকথিত জনগণের নামেই সবকিছু ভোগ করছে বাংলাদেশের জনমানুষের মধ্য থেকে অতি সৌভাগ্যবান ৫ থেকে ১০ শতাংশ; যারা সদা সরব সংখ্যালঘিষ্ঠ। নীতিনির্ধারণের জন্য সব শেষ হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো নীতিনির্ধারকদের দেশপ্রেম। বর্তমান বাংলাদেশে দেশপ্রেম বিষয়টি এত আলোচিত ও সমালোচিত যে, এ বিষয়ে এখানে তিক্ততা আরও না বাড়িয়ে বাড়তি আলোচনা নিষ্প্রয়োজন মনে করছি।
স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশের সব সরকারই দেশ শাসন করেছে জনগণের নামে, জনগণের সমর্থন নামক ‘দিল্লিকা লাড্ডু’ দেখিয়ে। সব সরকারই নিজেদের কর্মকাণ্ডকে জনগণের দাবি বলেছে অথবা জনগণের চাহিদা বলেছে। যাকে বলা হয় জনদাবি অথবা গণদাবি। এই জনগণ বলতে আমরা কি পল্টন ময়দান অথবা মুক্তাঙ্গনে নেতানেত্রীদের জনসভায় উপস্থিত শ্রোতাদের বুঝব? নাকি আতি-পাতি নেতা ও কর্মী-সমর্থক কর্তৃক বাসে-বাসে অথবা ট্রাকে-ট্রাকে আনা ১০০, ২০০, ৩০০ টাকার ভাড়াটিয়াদের বুঝব? নাকি এই শ্রোতারা জনগণের সামান্যতম অংশও নয়? বিচারের ভার বিজ্ঞ পাঠকদের কাছেই রইল। আসলে রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা ও সমাজপতিরা জনগণের নাম ভাঙিয়ে তাদের ও তাদের সমর্থকদের কথা নিয়েই সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকেন। অথচ সব ক্ষেত্রে প্রাধান্যই হলো ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ। যেখানে জনগণ তথা দেশের স্বার্থ একেবারেই গৌণ। জনগণের কথা বলা বা জনস্বার্থের দোহাই আজ এক ধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। মোদ্দা কথা হলো, অদ্যাবধি জনগণের নামে সব সরকারের আমলেই প্রণীত নীতিমালা দ্বারা দেশের শুধু হাতেগোনা ৫ থেকে ১০ ভাগ মানুষ ফুলে-ফেঁপে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। আর ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ জনমানুষ শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হয়ে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচার সংগ্রামে জঠর অর্থনীতির আবর্তে দিনের পর দিন ঘুরপাক খাচ্ছে তো খাচ্ছেই।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পেটের দায়ভার প্রতিনিয়ত প্রকট থেকে এত প্রকটতর হচ্ছে যে, দৈনন্দিন জীবনে তাত্ক্ষণিকভাবে জঠর জ্বালা নিরসনের বাইরে অন্য কোনো কিছু চিন্তা-ভাবনার সময় এদের নেই বললেই চলে। এই সুযোগটি মোক্ষমভাবে কাজে লাগাচ্ছে আমাদের সুহৃদ রাজনীতিবিদরা ও সমাজপতিরা। তাই সুযোগ বুঝে সবকিছুই চলছে জনগণের নামে তথা জনস্বার্থে। অথচ ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর এহেন কর্মকাণ্ডের ফলেই দেখা যায়, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে সদ্য ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া রাজনৈতিক দলের সরকারগুলো পুনর্নির্বাচিত হতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
এভাবে আর কত অথবা কতদিন চলবে এহেন প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের জনমানুষের মুখে-মুখে, হাটে-বাটে ও পথে-ঘাটে। এখানে যে কোনো ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী অবান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, জনজাগরণের আনুষ্ঠানিক বিষয়ের মূলে কাজ করে মানুষের আত্মিক উপলব্ধি। এহেন আত্মিক উপলব্ধি কখন কীভাবে উজ্জীবিত হবে তা একমাত্র সময়ই বলে দিতে পারে। আমরা শুধু অতীত ইতিহাস থেকে এ ব্যাপারে কিছুটা আঁচ করতে পারি, ধারণা নিতে পারি। আর ইতিহাসই চিরসত্য। একই সঙ্গে ইতিহাস নির্মমও বটে। আসলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা আছেন তারা সবাই সব কালেই মোটামুটিভাবে অন্ধ এবং একই সঙ্গে বধিরও বটে। কারণ, ইদানীং নীতিনির্ধারকরা যা দেখে তা বুঝতে চায় না এবং যা বোঝে তা দেখতে চায় না। অর্থাত্ ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ এমনভাবে এদের পেয়ে বসেছে যে, এদের দেখাটা সত্য হলেও বোঝে ভুল এবং বুঝ সত্য হলেও সবই ভুল দেখে। আর এই চক্রে প্রতিনিয়ত খরচের খাতায় দলে দলে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে কথিত ক্ষমতার উত্স নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আর শুধুই আপামর জনসাধারণ।
আজকাল যে কোনো আলাপচারিতায় এক পর্যায়ে অনেকের প্রশ্ন হলো, ‘আপনি রাজনীতি করেন? কোন দল করেন?’ প্রশ্ন দুটিতে আগ্রহ, বলিষ্ঠতা ও সততা সন্দেহাতীত। তাই কপটতার আশ্রয় না নিয়ে নির্দ্বিধায় অনেক সাধারণজনের উত্তর হলো, ‘ভাই, রাজনীতি করি; কিন্তু কোনো দলীয় রাজনীতি নয়।’ কারণ, প্রথমত বর্তমানের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে অনেকেরই আদর্শিক বিরোধ অনেক গভীরে এবং দিনের পর দিন এহেন বিরোধ বাড়ছে তো বাড়ছেই। বাস্তবে ঘটনাপ্রবাহ এমন যে, এর কোনো রকমের সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনাও ইদানীং প্রায় দুরূহ। কেননা, বানরের পিঠা ভাগের বিষয়টি কি কোনো মানদণ্ডে মেনে নেয়া সম্ভব? দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে আমিই সত্য বাকি সব মিথ্যা, এহেন নীতির সঙ্গে কতজন একাত্মতা প্রকাশ করবে? তৃতীয়ত, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’ আবদারটি বাস্তবে আত্মঘাতী নয় কি?
রাজনীতির কথা যখন এসেই গেল তখন আর একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। এদেশেই ষাটের দশকে কলেজ/ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়াকালে দেখেছি, রাজনীতি ছিল স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও শুধুই নীতিবানদের গর্বিত অবলম্বন। রাজনীতি কখনোই পেশা (Profession) ছিল না। রাজনীতি ছিল এক ধরনের আবেশ (Passion)। আজ বাংলাদেশে রাজনীতি একটি জমজমাট আকর্ষণীয় পেশা (Profession)। জীবন-জীবিকার মোক্ষম অবলম্বন। ক্ষমতা এবং সম্পদই যেন এখন একমাত্র চাহিদা, তাও আবার জনগণের নামে।
শেষ করব ছোট একটি গল্প দিয়ে। এক রাজা মশায় তার দেশের সব পণ্ডিতকে ডেকে বললেন, ‘কে আছেন, যিনি আমার জনহিতৈষী কর্মকাণ্ডগুলো ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারবেন?’ পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনায় পণ্ডিতকুল সবাই প্রায় নিশ্চুপ। অবশেষে একজন পণ্ডিত রাজি হলেন। রাজার যাবতীয় কর্মকাণ্ড ইতিহাসের পাতায় লেখা হলো। একদিন রাজদরবারে পেশ করা হলো বারো খণ্ডের ইতিহাস। রাজা বললেন, ‘এ রকম বারো খণ্ড পড়ার সময় আমার নেই। এগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হোক।’ রাজার ইচ্ছাই কর্ম। শেষ অবধি পণ্ডিত মশায় সযত্নে একটি লাইন লিখে নির্দিষ্ট সময় ও দিনে রাজদরবারে হাজির। রাজদরবারে এদিন উত্সুক জনগণেরও কোনো কমতি ছিল না। রাজা পণ্ডিত মশায়কে তার গুণ-কীর্তনে লাইনটি পড়ার অনুমতি দিলেন। পণ্ডিত মশায় যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে পড়লেন, ‘রাজা আসে, রাজা যায়। তাতে জনগণের কি কিছু এসে যায়?’
লেখক : পেনশনার
haquenoor@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.