নানির সাথে আর ঈদ করা হইল না by পান্না বালা

১৮ আগস্ট। সারা দিন ধরে আকাশ মেঘলা। মাঝে ঝিরঝির বৃষ্টি। রসুলপুরের মানুষের সঙ্গে যেন প্রকৃতিও একাত্মতা জানান দিল। কেননা আজ যে তাদের আসমানী না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। ফরিদপুরের ঈশানগোপালপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের সবার চোখে-মুখে শোকের ছায়া, স্বজন হারানোর বেদনা।


বাড়ির পাশেই বাঁশবাগানের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে কবর দেওয়া হয় আসমানীকে। পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’ কবিতা লেখা হয়েছিল তাঁকে নিয়ে। ১৮ আগস্ট ভোররাতে রসুলপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আসমানী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
আসমানী নেই, এই খবর শুনে স্বজন-পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে আহাজারি শুরু হয়। আসমানীর নাতি আক্রাম মণ্ডল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘নানির সাথে আর ঈদ করা হইল না। নানি আমাগোর সকলকে ফাঁকি দিয়া চইলা গেল।’ আসমানীর ছোট মেয়ে তাসলিমার আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কান্নায় ভেঙে পড়েন আসমানীর আরেক মেয়ে আলতা বেগম।
এই গ্রামের ছেলে সুজন মণ্ডল নীরবে কাঁদছিলেন। বললেন, ‘আসমানীর মৃত্যুতে আমরা রসুলপুর গ্রামের লোকজন এতিম হইয়া গেলাম। এত দিন কত লোক আসমানীকে দেখতে ছুইটা আসত, এখন আর কেউ আসবে না।’
গত ২৩ জুন আসমানী বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ হলে তাঁকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২৭ জুলাই তাঁকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে ৫ আগস্ট তাঁকে রসুলপুরে নিয়ে আসা হয়।
ঈশানগোপালপুর ইউনিয়নের (ইউপি) চেয়ারম্যান নূরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের আজিজ পাইপের সামনে থেকে রসুলপুর গ্রাম পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ আসমানীর নামে করা হবে। আমরা এই গ্রামে আসমানীর স্মৃতি বাঁচাইয়া রাখতে আরও কী কী করা যায় সে বিষয়ে পরিষদের সভায় আলাপ কইরা সিদ্ধান্ত নেব।’
আসমানীর কবর সংরক্ষণ করে একটি স্মৃতিসৌধ করার দাবি জানিয়ে রসুলপুর গ্রামের মো. নূরুদ্দীন মল্লিক বলেন, ‘তা হলে অন্তত লোকজন স্মৃতিসৌধের টানে এই গ্রামে আসবে, আমরাও তাদের দেখা পাব।’
প্রসঙ্গত, পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’ কবিতাটি কবি ১৯৪৬ সালে আসমানীর নিজ গ্রাম রসুলপুরে বসে রচনা করেন।
এই কবিতাটি কবির এক পয়সার বাঁশী কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। পরবর্তী সময়ে কবিতাটি স্কুল শ্রেণীর পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কবি লিখেছিলেন, ‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিমুদ্দীর ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও’। রসুলপুরে গিয়ে আর দেখা মিলবে না আসমানীর।

No comments

Powered by Blogger.