দেশে সিলিকোসিসের সংক্রমণ-* বুড়িমারীতে ১৭ শ্রমিকের মৃত্যু * আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে * মৃত ও আক্রান্তরা পাথর ও সিরামিক কারখানার শ্রমিক by তৌফিক মারুফ

দেশের উত্তরের শেষ সীমানা বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকায় বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের সামনের সড়ক ধরে হেঁটে আসছিলেন মোমিন নামের এক তরুণ। অল্প দূরে এক চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন আরেক তরুণ। চেহারায় ও শরীরে দুজনের মধ্যেই স্বাভাবিক তারুণ্য চোখে পড়ে।


কিন্তু ঢাকা থেকে আসা বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের গবেষক ডা. ফজলে রাব্বী ওই দুজনকে দেখিয়ে শোনালেন ভয়ংকর তথ্য। বললেন, "ওরা আমার রোগী। ওদের বাইরে স্বাভাবিক দেখলেও ভেতরে শেষ। বেশি দিন বাঁচার সম্ভাবনা নেই। ওদের শরীরে বাসা বেঁধেছে এক মারণব্যাধি 'সিলিকোসিস'। বিশ্বের অনেক দেশে পুরনো হলেও বাংলাদেশে এই রোগ ধরা পড়েছে নতুন।"
ফজলে রাব্বী একটু থেমে বলেন, 'কেবল ওই দুজনই নন, লালমনিরহাটের এই পাটগ্রাম উপজেলায় আরো প্রায় ৫০ জন মৃত্যুপথযাত্রী রয়েছেন সিলিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে। এ ছাড়া এ রোগের চিকিৎসা শুরুর আগেই গত এক বছরে কেবল পাটগ্রামেই মারা গেছেন কমপক্ষে ১৭ জন। এ বছরের জুন মাসে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বুড়িমারীতে আমরা সিলিকোসিস রোগীর সন্ধান পাই।'
বুড়িমারীর সিলিকোসিসে আক্রান্ত যুবক আযান বলেন, 'আমি পোর্টের ফাতেমা এন্টারপ্রাইজের শ্রমিক ছিলাম। আট বছর কাজ করেছি। একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ি। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, জ্বরসহ আরো কিছু সমস্যা দেখা দেয়। পরে ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতালে যাই। সেখানে প্রথমে আমার যক্ষ্মা হয়েছে বলে জানানো হয়। পরে আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে যে, আমি সিলিকোসিসে আক্রান্ত। ডাক্তাররা জানান, পাথরের পাউডার আমার ফুসফুসে ঢুকে পড়ায় এ রোগের আক্রমণ হয়েছে।'
আক্রান্ত রোগী রাজু আকুতি জানিয়ে বলেন, 'আমি ভিক্টরি সিরামিক কারখানায় কাজ করতাম। অসুস্থ হয়ে পড়ায় এখন কাজ করতে পারছি না। কয় দিন বাঁচব জানি না। আপনারা আমাকে বাঁচান।'
আক্রান্ত আরেক তরুণ জানান, তিনি বুড়িমারীর আরেকটি পাথর কারখানায় কাজ করতেন। ওই কারখানার অনেক শ্রমিক এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর মালিক কারখানাটি অন্য লোকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে কারখানাটি এখনো চালু আছে।
গতকাল মঙ্গলবার বুড়িমারীর কয়েকটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায় সবই বন্ধ। কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে চিকিৎসা নিতে আসা শ্রমিকরা জানান, ঢাকা থেকে বিশেষ টিম আসার খবরে মালিকরা কারখানা বন্ধ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন। এর আগেও একাধিকবার এমন হয়েছে। তবে বিকেলে গোপনে একাধিক কারখানা ঘুরে দেখা যায়, দুর্বিষহ পরিবেশে শ্রমিকরা কাজ করছেন। পাথরের পাউডারে শ্রমিকদের চেহারা একরকম ঢেকে আছে।
পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. আইউব আলী সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, বুড়িমারীতে সিলিকোসিসের প্রকোপ বেশি হলেও পুরো পাটগ্রামেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রোগী আছে। কারণ পাটগ্রামের সর্বত্রই পাথরের কাজ চলে।
বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক ডা. হাফিজুর রহমান বলেন, 'আমরা চেষ্টা করছি পাটগ্রামে সিলিকোসিসে আক্রান্ত সব মানুষকে খুঁজে বের করার। এ রোগ যদি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তবে চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো করা সম্ভব। আর জটিল পর্যায়ে চলে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত।'
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহম্মেদ বলেন, 'সিলিকোসিস সম্পর্কে আমরা অবহিত আছি। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এত দিন দেশে এ রোগের প্রকোপ দেখা যায়নি। এখন পরিস্থিতি দেখে সামনে করণীয় ঠিক করা হবে।'
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা ও রংপুর থেকে আসা সিলিকোসিস নিয়ে কাজ করা একটি বিশেষ দল বুড়িমারী এলাকায় বিশেষ পর্যবেক্ষণ করেন। টিমের সদস্য ও সিলিকোসিস গবেষক ডা. ফজলে রাব্বী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সাধারণত পাথর কাটা ও গুঁড়া করার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। যেসব দেশে পাথরের খনি আছে সেখানে এ রোগ বেশি। আমাদের দেশে বিশেষভাবে চুনাপাথরের কারখানা, সিরামিক ও টাইলস কারখানা এবং শীল-পাটা তৈরির কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে সিলিকোসিসের ঝুঁকি রয়েছে। তবে এখনো বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে কোনো পর্যবেক্ষণ শুরু হয়নি। ফলে সারা দেশে এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বা রোগের প্রকোপ নির্ণয় করা যাচ্ছে না। আপাতত কেবল পাটগ্রামের বুড়িমারী স্থলবন্দরে পাথর শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের নিয়ে পর্যবেক্ষণ চলছে। আর এ পর্যায়েই মৃত ও আক্রান্তের যে চিত্র পাওয়া গেছে- তা সত্যিই ভয়াবহ।'
গতকাল সকাল থেকে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ঢাকা ও রংপুর থেকে সিলিকোসিস নিয়ে কাজ করা বিশেষ টিম আগমনের খবরে ছুটে আসেন পাথর শিল্পে কাজ করা শ্রমিকরা। এ সময় পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সাধারণ সিলিকোসিসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেন। এ সময় বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করে অনেকের এক্স-রে দেখে মোট ১৩০ জনের মধ্যে ৫২ জনকে সিলিকোসিসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হয়। এদেরকে দ্রুত ঢাকার বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডা. ফজলে রাব্বী জানান, গতকাল মঙ্গলবার তিনি ৮০ জনের পরীক্ষা করে ৪০ জনকে শনাক্ত করেছেন। আজ বুধবারও এ পর্যবেক্ষণ ক্যাম্প চলবে। টিমের সদস্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. তাপস বলেন, 'আমি ৪০ জনের পরীক্ষা করে ১২ জনের শরীরে সিলিকোসিস শনাক্ত করেছি।' ডা. হাফিজুর রহমান বলেন, এর আগে আরেক দফা পরীক্ষা করে ১৩৪ জনের মধ্যে ২৯ জনের শরীরে সিলিকোসিস পাওয়া গেছে।
টিমের আরেক সদস্য শ্রম মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শক (ফ্যাক্টরি ও মেডিক্যাল) ডা. সৈয়দ আবুল এহসান বলেন, ২০০৬ সালের কারখানা আইনে (যা আগে শ্রম আইন ছিল) পেশাগত কারণে আক্রান্ত হওয়া অনেক রোগের তালিকা রয়েছে। এ তালিকায় সিলিকোসিসের নাম রয়েছে। তবে এবারই প্রথম এ রোগের সন্ধান পাওয়া গেল। তিনি জানান, আইন অনুসারে কারখানায় নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে কারখানার মালিকের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদি কোনো শ্রমিকের কোনো কারখানায় কাজের কারণে বিশেষ কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় তবে ওই কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রয়েছে। বুড়িমারী এলাকায় ইতিমধ্যেই শ্রম বিভাগ থেকে পাথর কারখানাগুলোতে পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ কারখানাগুলোকে প্রথমে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে। সংশোধন না হলে শাস্তির আওতায় আনা হবে।
শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে আমরা বুড়িমারীতে পাথর কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে বিশেষ রোগের প্রকোপ সম্পর্কে অবহিত হয়ে বুড়িমারীতে পর্যবেক্ষণকাজ শুরু করি। পরে এ কাজের সঙ্গে বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটকে যুক্ত করি।' তিনি জানান, বুড়িমারীতে মঙ্গলবার থেকে লালমনিরহাট সিভিল সার্জন অফিস, পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় 'অসুস্থ শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সেবায় স্বাস্থ্য ক্যাম্প' শুরু হয়েছে।
পাটগ্রাম উপজেলার ৮ নম্বর বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আছির উদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমাদের বাঁচান। ১২-১৩টি পাথর কারখানায় যেভাবে অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকরভাবে কাজ চলে তাতে কেবল শ্রমিকরাই নন, এলাকার সাধারণ মানুষও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পাথর কারখানায় কাজ করা মানুষগুলো যেভাবে মারা যাচ্ছে তা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু কারখানার মালিকরা বহিরাগত এবং বিভিন্নভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় আমরা তাঁদের বেপরোয়া আচরণ রোধ করতে পারছি না।'
চেয়ারম্যান বলেন, 'আগে এলাকার দরিদ্র মানুষ সাধারণত তামাক চাষ, ধান, পাট, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত থাকত। ২০০০ সালের পর থেকে বুড়িমারী এলাকায় পাথর কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করলে অনেকেই এসব কারখানায় কাজ শুরু করেন। অল্প দিনের মধ্যেই এসব শ্রমিক অসুস্থ হয়ে মারা যেতে শুরু করেন। শ্রমিকদের এমন অসুস্থতা ও মৃত্যুর বিষয়টি আমরা আগে স্বাস্থ্য বিভাগকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।'
বুড়িমারীর পাথর কারখানা অনুভা ট্রেডিংয়ের মালিক আতিকুর রহমান রাজু কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে কোয়ার্টজ পাথরের কয়েকটি কারখানা ছিল বুড়িমারীতে, ওই কারখানাগুলোর শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়েন, অনেকে মারা যান। এ জন্য ওই কারখানার বেশির ভাগই এখান থেকে গুটিয়ে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছে। এখন সেগুলোতে খুব একটা ক্ষতি হয় বলে মনে করি না।
আতিকুর রহমান বলেন, 'তবে আমরা যারা এখনো এখানে এ কারখানা চালাচ্ছি, তারা আরো নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে কারখানা চালানোর ব্যবস্থা নেব। আগে আমরা সচেতন ছিলাম না।'
একই ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২ ও ৩ নম্বর সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য নার্গিস বেগম বলেন, বুড়িমারীর বন্দরের উদয়ন শিশু নিকেতনের সামনে যেভাবে একটি কারখানা গড়ে উঠেছে, তাতে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশুরাও ক্ষতির শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন, বড় কারখানার পাথরগুলো ভারত বা ভুটান থেকে আসে। এসব কারখানায় নারী শ্রমিকরা কাজ না করলেও এলাকার মাটির নিচ থেকে ওঠানো লোকাল পাথর ভাঙার কাজে অনেক নারী শ্রমিক কাজ করে থাকেন। তাই তাঁরাও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু তাঁদের পরীক্ষার বা চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই।
বুড়িমারী স্থলবন্দর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি সফর উদ্দিন বলেন, পাথর কারখানাগুলোতে বড় পাথর ছোট করা, পাথর কাটা, পাথর গুঁড়া করা এবং হাঁস-মুরগি ও মাছের খাবারের উপকরণ তৈরি করা হয়। এ সময় পাথর থেকে বের হওয়া পাউডার শ্রমিকদের নাক-মুখ দিয়ে ফুসফুসে ঢুকে যায়। ফলে তাঁরা নানা রোগে আক্রান্ত হন। শ্রমিক রকিব বলেন, 'কারখানায় আমরা বোল্ডার ভাঙ্গি, মোজাইক বানাই, পাউডার তৈরি করি।'
বক্ষব্যাধির গবেষকরা বলেন, সিলিকন ক্রিস্টাল ফুসফুসের কোষে ঢুকে জমা হতে হতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে যক্ষ্মা ও সিলিকোসিস দুটিই হতে পারে। যক্ষ্মা সংক্রামক হলেও সিলিকোসিস অসংক্রামিত রোগ। এটা একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়ায় না। তবে তার শরীরের যক্ষ্মা ছড়াতে পারে। সিলিকোসিস শনাক্তকরণে এক্স-রে ও স্প্যারোমিটার ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া সিটি স্ক্যান ও ফুল পালমোনারি টেস্ট থেকেও এ রোগ ধরা যায়। তাই বাংলাদেশে সিলিকোসিস শনাক্তকরণ এখন কঠিন কিছু নয়। তবে এ জন্য সচেতনতা দরকার।

No comments

Powered by Blogger.