ইভ টিজিং: ছলের অভাব নেই by ফারহানা জামান

‘বদলে যাও বদলে দাও মিছিল’ ব্লগে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও নির্বাচিত চারটি ইস্যু নিয়ে অব্যাহত আলোচনা হচ্ছে। আজ ইভ টিজিংমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার একটি বিশ্লেষণাত্মক অভিমতসহ আরও দুজন লেখকের নির্বাচিত মন্তব্য ছাপা হলো। ইভ টিজিং নিয়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য প্রায়ই শুনে থাকি, ‘মেয়েরা নিজেরাই ইভ টিজিংয়ের জন্য দায়ী। কারণ, যেসব মেয়ে উগ্র পোশাক পরে, ছেলেরা তাদেরই ইভ টিজিং করে।’ অর্থাৎ নারীদের পোশাকই ইভ টিজিংয়ের মূল কারণ। নারীরা যদি পর্দা পরে, তাহলে তারা আর ইভ টিজিংয়ের শিকার হবে না। এই যুক্তি আসলে কতটা যুক্তিসংগত বা বিশ্বাসযোগ্য? আমি তর্ক করতে চাই না। সবিনয়ে আমার অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, উপলব্ধি দিয়ে বদলে যাও বদলে দাও মিছিলে কয়েকটি কথা বলতে চাই।
আমি নিজে কয়েকবার দেখেছি, বোরকা পরা মেয়েরাও কত নির্মমভাবে ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়, ‘এই সইরা যা, পেত্নী আইতাছে, গেইটলক বাস আইছে’ ইত্যাদি অশ্লীল আক্রমণ। হাজার রকমের টিজিং চলার পথে। পোশাক বা ধর্ম কোনোটিই এর আওতায় পড়ে না। কোনো মেয়ে মোটা হওয়ার কারণে, কেউ চিকন হওয়ার কারণে; কেউ সুন্দর বলে, কেউ অসুন্দর বলে; কেউ লম্বা বলে আবার কেউ খাটো বলে; কেউ ফরসা বলে, কেউ কালো বলে; কেউ চুল বড় রেখেছে বলে আবার কারও চুল ছোট বলে। কেউ নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটলে তাকেও ‘পয়সা খোঁজো নাকি’ বাক্যবাণে ইভ টিজিংয়ের শিকার হতে হয়। প্রতিনিয়ত ইভ টিজারদের ভিড় ঠেলে একজন নারী হয়ে আমার প্রত্যুত্তর কী হবে? আমার বক্তব্য সমাজ কতটুকু গ্রহণ করবে, আমি জানি না। তবু আমাকে বলতে হবে। কেননা, আমরা এই বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্তি চাই।
কোনো ধর্মের কোথাও লেখা নেই, নারীদের পর্দা-পোশাক নিয়ে ইভ টিজিং করো, রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে অপমান করো, বেইজ্জত করো? ইসলাম ধর্ম নারীদের যেমন পর্দা করতে বলেছে, ঠিক তেমনি নারী-পুরুষ সবাইকে নিজের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করতেও বলেছে। সূরা নূরে ৩০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। ‘হে মুমিনগণ তোমরা তোমাদের দৃষ্টি নত রাখ।’
ইসলাম কি পুরুষের পোশাক পায়ের গোড়ালির ওপর এবং ঢিলা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরতে বলেনি? ইভ টিজার এবং তাদের প্রশ্রয়দানকারীরা কী ধরনের পোশাক পরে? তাদের জিনসের প্যান্ট কোমর থেকে আরও অন্তত পাঁচ ইঞ্চি নিচে থাকে। পায়ের গোড়ালির ওপরে তো দূরের কথা, বরং গোড়ালির এত নিচে প্যান্টের দু পায়ের তলা ছেঁচড়ে গড়াগড়ি খেলে ক্ষয় হয়ে ল্যারব্যাড়া তেনা হয়ে যায়। তাদের কারও গলায় রংবেরঙের মালা, কারও হাতে চুড়ি-ব্রেসলেট, কেউ কেউ ভালো প্যান্ট ব্লেড দিয়ে কেটে কেটে ঊরু দেখাতে আরও ফ্যাশনেবল(!) করে তোলে। তাহলে ‘শালীন’ শব্দটা কি শুধু মেয়েদের জন্যই বরাদ্দ? তাদের এসব উদ্ভট পোশাক হলো যুগের সঙ্গে মানিয়ে চলা, ফ্যাশন-সচেতনতা; আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তা হলো উগ্রতা!
‘আমি ইভ টিজিং করি না’ বলে যারা ইভ টিজিংয়ের জন্য নারীদেরই দায়ী করে, ধর্মের দোহাই দেয় এবং ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ না করে বরং নারীদের দোষী বানিয়ে ইভ টিজিংকারীদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে, তারাও আসলে ইভ টিজিংকারীদেরই একটি অংশ। বরং তারা আরও ভয়ংকর। কারণ, তারা ইভ টিজিংকারীদের ইন্ধন জোগায়, উৎসাহিত করে। ইভ টিজিংকারী এবং তাদের ইন্ধন জোগানকারী উভয়েরই যথোপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত।
আমি এটা স্বীকার করি, ধনাঢ্য পরিবারের কন্যারা কেউ কেউ পাশ্চাত্যের পোশাক পরে, কিন্তু এদের অধিকাংশ এগুলো পরে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় না। পার্টি প্রোগ্রামেই বেশি পরে। ইভ টিজাররা এদের ধারেকাছেই যেতে পারে না। ইভ টিজিংয়ের জন্য উত্ত্যক্তকারীরা মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের সরল নারীদেরই বেছে নেয়, যারা আসলে কখনোই উগ্রতা প্রকাশ করে না। ছোট-বড়, বিবাহিত কি অবিবাহিত, সবাই নিজ পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে সর্বত্রই নারীদের ইভ টিজার নামের সাপের ছোবল খেতে হচ্ছে। এর জন্য নারীরা কীভাবে দায়ী, তা সত্যিই আমার বোধগম্য হয় না। তাহলে কি মেয়েরা পড়াশোনা, চাকরি-বাকরি সব ছেড়ে দিয়ে ইভ টিজিং থেকে মুক্তি পেতে ঘরের মধ্যে বোরকা মুড়িয়ে বসে থাকবে? দেশে ষোলো কোটি মানুষের অর্ধেক নারী। সরকার কি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় নারীর মেধা ও শ্রম অবদানের মূল্যায়ন করবে না? সে ক্ষেত্রে আমাদের অর্থনীতিতে যেটুকু অবনতি হচ্ছে, সে পরিবর্তনের দায় কি ইভ টিজাররা বহন করতে পারবে?
তাহলে সমাধানের পথ খুঁজব কীভাবে? এই সমস্যা হঠাৎ করে সমাধান হবে না। আমার মনে হয়, মাধ্যমিক স্কুলগুলো একটু চেষ্টা করলে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। যদি মাসে একবার করে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রদের কাউন্সেলিং করাতে পারত, তাহলে ছাত্রদের মধ্যে ইভ টিজিং করার প্রবণতা জন্ম নিত না। আবার অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে বোঝাতে পারত, বাসায় তাঁরা তাঁদের সন্তানদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করবে, কীভাবে কী শিক্ষা দেবে ইত্যাদি। কারণ, এখনো অনেক অভিভাবক আছেন, যাঁরা শিক্ষিত নন। আবার অনেক শিক্ষিত অভিভাবক আছেন, যাঁদের মধ্যে এই ধারণা নেই, সন্তানকে পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিকতার শিক্ষাও দিতে হয়।
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর। তাই এ বিষয়ে আর তর্কবিতর্ক না করে একটি কথাই শুধু বলব, আসুন, নিজেদের স্বার্থেই ইভ টিজিং করা থেকে বিরত থাকি, ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করি। একটি সুন্দর সমাজ গঠনে আমাদের সবার সহযোগিতা একান্ত দরকার।
ফারহানা জামান: বদলে যাও বদলে দাও মিছিল ব্লগের নিয়মিত লেখক।
ই-মেইল: bjbd@prothom-alo.info
facebook.com/bjbdmichil

জনমত জরিপের ফলাফল
বদলে যাও বদলে দাও মিছিলের ওয়েবসাইটে নতুন তিনটি জনমত শুরু হয়েছে চলতি সপ্তাহে। আপনিও অংশ নিন জরিপে।
ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের সাজা দিতে প্রতিদিন মোবাইল কোর্ট বসা উচিত বলে মনে করেন?

 হ্যাঁ ৮৬%  না ১১%
 মন্তব্য নেই ৩%
১১ জুলাই, ২০১২ পর্যন্ত
আপনি কি মনে করেন, নৌ-দুর্ঘটনা কমাতে চলতি বাজেটেই নৌ-পুলিশ বাহিনী গঠন করা জরুরি?
 হ্যাঁ ৭২%  না ২২%
 মন্তব্য নেই ৬%
১১ জুলাই, ২০১২ পর্যন্ত
শিশুদের জন্য একটি বিশেষায়িত টিভি চ্যানেল অনুমোদন দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন কি?
 হ্যাঁ ৮২%  না ১৫%
 মন্তব্য নেই ৩%
১১ জুলাই, ২০১২ পর্যন্ত
www.bodlejaobodledao.com

No comments

Powered by Blogger.