কল্পনাশক্তির মৃত্যু by সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কলেজ জীবনে বামদের সঙ্গে আমার রোমাঞ্চের শুরু। পঞ্চাশের দিকে আমি এস্টাবলিস্টমেন্টবিরোধী ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য ছিলাম। পার্টির দাদাদের কাছে তখন আমার লেখালেখি একটা সমস্যা হয়ে দেখা দিল। তারা আমাকে বলত : ভালোবাসার কবিতা লিখো না, ওটা অবক্ষয়ী সংস্কৃতি।


এরপরও আমি শ্রেণীহীন সমাজের প্রতি বিশ্বাস হারাইনি। স্বাধীনতা অর্জনের আগে আমরা যারা জন্মেছিলাম তারা স্বাধীনতাকে একটা ইউটোপীয় ব্যাপার বলে কল্পনা করতাম। তখন কংগ্রেস নেতারা গান্ধী টুপি পরতেন, আর গান্ধীর নামেই শপথবাক্য উচ্চারণ করতেন। বাংলায় তখন বোমা, ব্যাটন ও গুলির নাচন। এরই মাঝে ১৯৭৭ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় এলো বামরা। রাজনীতিতে একটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া হলো : রাজনৈতিক দলগুলো যখন বিরোধী অবস্থানে থাকে তখন তারা সচরাচর জনপ্রিয় হয়ে থাকে কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালে তারা অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থিরাও উচ্চ ও ইতিবাচক প্রত্যাশা জাগিয়েই তাদের ক্ষমতার পর্ব শুরু করেছিল। কিন্তু তারাও শেষ পর্যন্ত জনগণকে হতাশ করল। তাদের কৃষি সংস্কার গ্রামীণ এলাকায় ঐতিহাসিক পরিবর্তন সাধন করে। তারাই প্রথম দেশে কার্যকর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।
ভূমি এক সময় যেখানে তাদের শক্তি ছিল এখন সেটাই তাদের কর্মের উচিত প্রতিফল। বিনয় চৌধুরীর মতো লোক তাদের ছিল না বলেই কি তারা তা করে উঠতে পারেননি? আর জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালেই শুরু হয়ে গেল বামদের ক্ষয়ে যাওয়া।
এটা কেবল নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, কল্পনাশক্তিরও ব্যর্থতা। এটা কেবল মন্ত্রীদের ব্যর্থতাই নয়, দলের কৌশলবিদ ও নীতি-প্রণয়নকারীদেরও ব্যর্থতা। তারা যদি নন্দীগ্রাম ও নেতাইয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে থাকে, তবে সিঙ্গুরের ব্যাপারে ততটা বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে পারেনি। ওইসব গুরুতর ভুলের জন্য চড়া মাশুল গুনতে হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ভূমির প্রশ্নটিই দীর্ঘকাল রাজ্যকে তাড়া করবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভূমির ব্যাপারে গঠনমূলক কিছুই বলেননি। ১০ লাখ লোকের চাকরি প্রদান ও কলকাতাকে লন্ডন বানাবেন_ এমনতর জজবায় তিনি মানুষকে সম্মোহিত করেছেন। তবে তার এই একাগ্রচিত্ত প্রচেষ্টাকে সময় মনে রাখবে। ১৯৯২ সালে মমতাকে রাইটার্স বিল্ডিং থেকে আক্ষরিক অর্থেই বের করে দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি এই রাজ্যের ক্ষমতা নিয়েই এখানে ফিরে আসবেন বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। মমতা তার কথা রেখেছেন।
তাকে কি বিশ্বাস করা যায়? ভেবেচিন্তে নেওয়া কোনো পরিকল্পনা বা ভিশনের ছাপ তার মাথায় রয়েছে বলে মনে হয় না। যাদের নিয়ে চলেন তাদের অনুপ্রাণিত করার তেমন যোগ্যতা নেই। রাজনীতি ও শাসন পরিচালনার ব্যাপারে অভিজ্ঞতা নেই এমন লোকজনকেই তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দিয়েছেন।
বামপন্থিদের বিরুদ্ধে এখন একটা জোরালো প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একসময় যারা বামফ্রন্টের ঘনিষ্ঠ ছিল তারা এখন তার ছায়াও মাড়াচ্ছেন না। বুদ্ধিজীবীদের রাজনীতিকরণে আমি খুব বিষণ্নবোধ করছি। আমি আমার শৈশব থেকেই সক্রিয়তাবাদী লেখক ও শিল্পীদের আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হতে দেখেছি। এখন তাদের অধিকাংশকেই দেখা যায় অসন্তোষ প্রকাশ করতে নতুবা সুযোগ-সুবিধার হিস্যা পেতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালাতে। ব্যানার্জি এই মানসিকতাটা ভালোভাবেই বুঝতে পারেন। এক সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস না করেই রেলওয়ের উপদেষ্টা ঘোষণা করে বসেন। তবে আমি সেটা অবশ্যই প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করি।
বামের মধ্যে আমি কখনও কোনো অসাধুতা দেখিনি। অমনি অমনিতেই বাংলা দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ভাষাগত অসহিষ্ণুতামুক্ত ছিল, তা নয়। এসব আমার কাছে ভবন-কারখানার চেয়ে কম মূল্যবান নয়। বামপন্থিরা এখন বিরোধী দলে থাকার কারণে তাদের হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবে। বামদের জন্য এটা একটা সুযোগ।
আমার কাছে মিস বন্দ্যোপাধ্যায় একজন রসকষহীন মানুষ। একটা পাবলিক বিতর্কে আমার টিম তার টিমকে হারিয়ে দিয়েছিল। এতে তিনি কতটা ত্রুক্রদ্ধ হয়েছিলেন তা এখনও আমার মনে আছে। বিতর্কে হারার পর স্টেজে উঠে তার সে কী দাপাদাপি। চিৎকার করে বলছেন_ কারচুপি, কারচুপি, আসো, ভোটে লড়ে আমাকে হারাও।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় :কথাসাহিত্যিক
 

No comments

Powered by Blogger.