রক্তদানে বাঁচুক প্রাণ by মুনতাসীর মারুফ

উপদেষ্টা, সন্ধানী ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইউনিট অস্ত্রোপচার, দুর্ঘটনায় রক্তক্ষরণ, প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, রক্তের ক্যানসার, রক্তশূন্যতা, হিমোফিলিয়া, থ্যালাসেমিয়া, ডেঙ্গুসহ রক্তের স্বল্পতাজনিত অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় রোগীর দেহে রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রয়োজন পড়ে।


রক্ত কারখানায় তৈরি হয় না এবং রক্তের কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। একজন মানুষের দেহের একই গ্রুপের রক্তই সঞ্চালন করা হয় আরেকজনের দেহে। সাধারণত আত্মীয়স্বজনের মধ্য থেকেই রোগীর জন্য রক্তদানকে উৎসাহিত করা হয়। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে না পাওয়া গেলে কোনো সুস্থ, নীরোগ মানুষের দেহের একই গ্রুপের রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়।
১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী যেকোনো সুস্থ, নীরোগ মানুষ (পুরুষের ক্ষেত্রে ওজন কমপক্ষে ৪৮ কেজি, মেয়েদের ক্ষেত্রে ৪৫ কেজি) চার মাস পর পর এক ব্যাগ রক্ত (৩৫০-৪৫০ মিলিলিটার) দিতে পারেন, এতে তেমন শারীরিক ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই। যাঁরা হেপাটাইটিস, এইডস, ম্যালেরিয়া বা অন্য কোনো রক্তবাহিত রোগে ভুগছেন, তাঁদের রক্ত দান করা উচিত নয়, কারণ আপনি হয়তো রোগীর উপকারই করতে চাইছেন, কিন্তু সেই রক্ত রোগীকে নতুন রোগে আক্রান্ত করতে পারে।
কোনো রোগের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ খাচ্ছেন, এ রকম অবস্থায়ও রক্ত দেওয়া উচিত নয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিক চলাকালে, গর্ভবতী অবস্থায় ও সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার এক বছর পর্যন্ত রক্তদান করা তাঁদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মাস ছয়েকের ভেতর বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বা অপারেশন হয়েছেন—এমন ব্যক্তিদেরও রক্তদান করা উচিত নয়। এ ছাড়া সুস্থ মানুষ রক্তদান করলে তার ও স্ক্রিনিংয়ের পর ওই রক্ত দিলে রোগীর সাধারণত কোনো সমস্যা হয় না।
রক্তদান এমন কোনো কঠিন বা দুঃসাহসের কাজ নয়। রক্তদান করলে শরীর দুর্বল হয়ে যায় না বা দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজের ক্ষমতা হারায় না। তবে রক্তদানের পর কিছুটা সময় বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্রামের সময়টাতে দু-এক গ্লাস পানি বা জুস পান করা এবং হালকা কোনো খাবার খাওয়া যেতে পারে। প্রাথমিক ওই বিশ্রামের পর দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজ করতে কোনো নিষেধ নেই। তবে যেদিন রক্ত দেবেন, সেদিন ভারী কোনো কাজ না করাই ভালো। অনেকের ধারণা, রক্তদানের সময় খুবই ব্যথা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, দক্ষ হাতে রক্ত সংগ্রহ করা হলে শিরায় সুচ ঢোকানোর সময় একটুখানি ব্যথা ছাড়া বাকি সময় কোনো ব্যথা হয় না। রক্তদানের জন্য বিশেষ কোনো প্রস্তুতিরও দরকার পড়ে না। স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়াই যথেষ্ট। তবে রক্তদানের আগে-পরে একটু বেশি পরিমাণে পানি পান করা উচিত। রক্তদানের সময় মাথা ও শরীর এক সমান্তরালে থাকতে হবে। হাতে সুচ ঢোকানোর পর সাধারণত ছয় থেকে ১০ মিনিট সময়ের মধ্যেই এক ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হয়ে যায়। একজন মানুষের শরীরে থাকে ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ লিটার রক্ত। এক ব্যাগ রক্ত দান করা মানে ৩৫০ থেকে ৪৫০ মিলিলিটার রক্তদান করা। রক্তের উপাদানগুলোর ভেতর পানির অভাব পূরণ হয়ে যায় বেশি পরিমাণ পানি পানের মাধ্যমেই। রক্তের অন্যতম উপাদান লোহিত কণিকা (রেড ব্লাড সেল) ১২০ দিন পর পর প্রতিস্থাপিত হয়। অর্থাৎ একেকটি লোহিত কণিকা ১২০ দিন বাঁচে। আপনি রক্ত দিন বা না দিন ১২০ দিন পর সেটি মরে যায় এবং নতুন লোহিত কণিকা জন্ম নেয়। রক্তের অন্যান্য কণিকার আয়ুষ্কাল আরও কম। পেশাদার রক্তদাতারা টাকার বিনিময়ে রক্ত দেয়। আমাদের দেশে পেশাদার রক্তদাতাদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত বা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত। মূলত নেশার টাকা জোগাড়ের জন্যই এরা রক্ত বিক্রি করে। এরা ভোগে রক্তবাহিত নানা রোগে। আর পেশাদার ব্যক্তিদের রক্ত বিক্রির মাধ্যম হিসেবে অলিতে-গলিতে গড়ে ওঠা ব্লাড ব্যাংকগুলো যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের সরবরাহ করছে এদের রক্ত। এই রক্ত গ্রহণ করায় রোগী সাময়িকভাবে সুস্থ হলেও দীর্ঘমেয়াদে রক্তবাহিত জটিল কোনো রোগ, যেমন—এইডস, হেপাটাইটিস-বি ও সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ফাইলেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে।
এক জরিপে দেখা গেছে, পেশাদার রক্তদাতাদের মধ্যে ২৯ শতাংশ হেপাটাইটিস-বি ও ২২ শতাংশ সিফিলিসে ভোগে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া রোগীকে রক্ত দেওয়ায় পরবর্তী সময় ৬০ দশমিক ১ শতাংশ রোগী হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছে। আরেকটি ব্যাপার, পেশাদার রক্তদাতাদের বেশির ভাগই পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং চার মাসের বিরতির ব্যাপারটি না মেনেই রক্ত বিক্রি করে বলে রক্তের অন্যতম উপাদান হিমোগ্লোবিন এদের দেহে কম থাকে। ফলে এক ব্যাগ রক্তে যতটুকু হিমোগ্লোবিন রোগীর পাওয়ার কথা, তা সে পায় না। আর পেশাদারদের রক্ত বিক্রির মাধ্যম হিসেবে অলিতে-গলিতে গড়ে ওঠা ব্লাড ব্যাংকগুলো যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের সরবরাহ করছে এসব রক্ত।
১৯৭৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নতুন গড়া একটি সংগঠন ‘সন্ধানী’ আয়োজন করেছিল স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির। সেখানে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী ২৭ জনের মধ্যে একজন শিক্ষক ছাড়া আর সবাই ছিলেন কলেজেরই ছাত্রছাত্রী। ধীরে ধীরে স্বেচ্ছায় রক্তদানের ধারণাটি বিস্তৃৃতি লাভ করে। সন্ধানীর পাশাপাশি রেডক্রিসেন্ট, অরকা, কোয়ান্টাম, বাঁধনসহ অনেক সংগঠন স্বেচ্ছায় রক্তদান বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং রক্ত সংগ্রহ, সরবরাহ প্রভৃতি কর্মসূচিতে এগিয়ে আসে। বিশুদ্ধ রক্ত পাওয়ার আশায় আমাদের দেশে মানুষজন এসব সংগঠনের দ্বারস্থ হয়। এরা কিন্তু রক্ত তৈরি করে না। স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের দান করা রক্তই সরবরাহ করে এসব সংগঠন। যত বেশি মানুষ রক্ত দেবে, এসব সংগঠন তত বেশি বিশুদ্ধ রক্ত সরবরাহ করতে পারবে। তাই স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসুন। আপনার রক্তে বেঁচে থাকুক একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ।

No comments

Powered by Blogger.