বহির্নোঙরে ভোজ্য তেল খালাসে এক কম্পানির প্রস্তাব অন্যদের অসন্তোষ

দেশের প্রচলিত নীতিমালা লঙ্ঘন করে আমদানি করা ভোজ্য তেল বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙর থেকে সরাসরি খালাস করে নারায়ণগঞ্জের মিলে নেওয়ার প্রস্তাব করেছে মেঘনা গ্রুপ। চলমান আমদানিনীতি আদেশ ২০১২-২০১৫ প্রণয়ন কার্যক্রমে এই প্রস্তাব করেছে দেশের ভোগ্যপণ্য বাজারজাতকারী অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান।


মেঘনা গ্রুপের এই প্রস্তাবে আমদানিকারকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মাত্র একটি ব্যবসায়িক গ্রুপকে এ ধরনের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে ভোজ্য তেল আমদানিকারকদের সংগঠন। দেশের বাকি আমদানিকারকরা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হলে ভোজ্য তেল সেক্টরে অসম প্রতিযোগিতা দেখা দেবে। কারণ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে গভীর সমুদ্রে ভোজ্য তেল খালাসের অবাধ সুযোগ রয়েছে। আর তা কাজে লাগিয়ে গ্রুপটি পণ্য খালাস করে কম দামে বাজারজাত করার সুযোগ পেতে পারে। এতে বাজারে তাদের একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মার খাবে অন্যরা।
অন্যান্য আমদানিকারক বলেন, অসম প্রতিযোগিতার কারণে এই একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে রমজানের আগে ভোজ্য তেলের বাজার অস্থির হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া সরাসরি খালাসের সুযোগ দিলে মজুদ পরিস্থিতি সম্পর্কেও সরকার থাকবে অন্ধকারে। আর মজুদ পরিস্থিতি জানা না থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ওঠানামার ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
প্রসঙ্গত, প্রতি টন ভোজ্য তেলের জন্য সরকারকে শুল্ক দিতে হয় আট হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা। সাধারণত জাহাজে ভোজ্য তেল আমদানির পর তা কর্ণফুলী নদীতীরে ট্যাংক টার্মিনালের সরকারি বন্ডে রাখা হয়। এরপর চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে শুল্ক পরিশোধ করে আমদানিকারকরা তা খালাস করে নিজেদের মিলে নিয়ে যান। প্রচলিত এই নীতিমালার কারণে সরকারের কাছেও ভোজ্য তেলের মজুদের পরিমাণ সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য থাকে।
ভোজ্য তেল মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভেজিটেবল ঘি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ রউফ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের সুযোগ দেওয়া হলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নিরূপণ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের একপেশে সিদ্ধান্ত না নিতে সরকারের কাছে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রামের কাস্টমস কমিশনারকে দেওয়া হয়েছে।' অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, ৩৪ জন আমদানিকারক সদস্যের মধ্যে বর্তমানে সক্রিয় রয়েছেন ১৬ জন।
এ বিষয়ে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'বহির্নোঙর থেকে সরাসরি পণ্য খালাস নিলে বহনকারী জাহাজের ভাড়া বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। যাঁরা এর বিরোধিতা করছেন তাঁদের অনেকের টার্মিনাল রয়েছে। সেই টার্মিনালে মজুদ না রাখলে তাঁরা টনপ্রতি ২০০ টাকা ভাড়া থেকে বঞ্চিত হবেন।' এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'ছয় হাজার টন ভোজ্য তেল আমদানি করে চার হাজার টনের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির কোনো সুযোগ নেই। কারণ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বেশ সতর্ক ও সজাগ।' মোস্তফা কামাল স্বীকার করেন, সরকারের কাছে এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপনের আগে মিল মালিকদের সংগঠনে এ নিয়ে তিনি আলোচনা করেননি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আবু সিদ্দিক সর্দার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, মেঘনা গ্রুপের প্রস্তাবটি নীতি-আদেশে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতামত প্রয়োজন। ১০ মে স্বাক্ষরিত ওই চিঠি পাঠানোর ১৩ দিন পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দ্বিতীয় সচিব (শুল্ক : নীতি ও বাজেট) মোহাম্মদ রেজাউল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে মতামত দেওয়ার জন্য চট্টগ্রামের কাস্টমস কমিশনারকে অনুরোধ জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ড. মারুফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এ ধরনের প্রস্তাব অনুমোদন দিতে গেলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক ঝুঁকি থাকে। পুরো বিষয়টি যাচাই-বাছাই শেষে আমাদের মতামত সংবলিত কাগজ আজই (গতকাল মঙ্গলবার) ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাস্টমস কর্মকর্তা জানান, বহির্নোঙরে মালামাল খালাসের ক্ষেত্রে শুল্ক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা খুবই দুরূহ।

No comments

Powered by Blogger.