মিয়ানমারে অস্থিরতা, বিপাকে বাংলাদেশ-রোহিঙ্গা, না অনুপ্রবেশকারী!-বাস্তবতা বনাম মানবিকতা by মেহেদী হাসান ও রফিকুল ইসলাম

মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ফিরে "তিন দশক ধরে রোহিঙ্গা শব্দটি আমরা এত বেশি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি যেন ওরা কোনো নৃ-গোষ্ঠীর মতো হয়ে গেছে। কেন সংবাদমাধ্যম তাদের 'মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারী' বা 'মিয়ানমারের নাগরিক' বলে না?" গত সোমবার রাতে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলার সময় এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক।


ওই কূটনীতিক আরো বলেন, 'মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে বাড়তি বিদেশি জনগোষ্ঠীর চাপ আর কত দিন? বাংলাদেশ তার বিশেষ কিছু এলাকায় আর কত দিন চার লাখেরও বেশি বিদেশিকে ধারণ করবে? দ্রুত এর একটা বিহিত হওয়া উচিত।'
সমস্যার আরেকটি দিকও আছে। সেটি হচ্ছে মানবিক দিক। গত সোমবার রাতে যখন পরদিনের পত্রিকার সংবাদ বিন্যাসের কাজ চলছিল তখন কথা ওঠে ওই দিনই নৌকায় করে আসা রোহিঙ্গাদের বিজিবির ধাওয়া দেওয়ার ছবি কিভাবে ছাপা হবে। কালের কণ্ঠেরই একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তখন যুক্তি দেখান, 'ওই নৌকাটিতে নারী ও শিশু আছে। মিয়ানমার তাদের জন্য বিপৎসংকুল। প্রাণের ভয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। ফিরিয়ে দিলে এই নারী-শিশুরা কোথায় যাবে?' সেদিন সকালেই অন্য এক সহকর্মী বলেছিলেন, গণমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মানবিক দিক প্রকাশ পাচ্ছে না। তাঁর মতে, সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক চ্যানেলে মিয়ানমারের ওপরই চাপ দেওয়া উচিত, রোহিঙ্গাদের ওপর নয়। কক্সবাজারে গিয়েও রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ভাষ্য পাওয়া গেছে।
গত ২৮ মে দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের পাশে বখতিয়ার বাজারের একটি দোকানে রোহিঙ্গা মাঝিদের (সর্দার) মধ্যমণি হিসেবে বসে ছিলেন সাবেক ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমেদ। অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তাঁর সঙ্গে আমাদের আলোচনার মধ্যেই সেখানে হাজির হন দুই নারী। মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে ঢুকে অটোরিকশা নিয়ে সোজা চলে এসেছেন কুতুপালংয়ে। বখতিয়ার মেম্বারের কাছে আসার কারণ অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে চালকের সঙ্গে বিরোধ। ওই দুই নারী সবার সামনেই বললেন, সীমান্ত পার হওয়ার সময় তাঁদের পাঁচ শ টাকা করে দিতে হয়েছে বাংলাদেশ অংশে দায়িত্বরতদের।
বখতিয়ার মেম্বারের সঙ্গে কথোপকথন শেষে অটোরিকশায় করে আমরাও চললাম সীমান্তের দিকে। রোহিঙ্গা বসতি আর গাছ কাটার ঘটনা দেখতে দেখতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার মৈত্রী সড়ক ধরে কিছু দূর যাওয়ার পরই সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সদস্যদের দেখা মিলল। বখতিয়ার বাজার এলাকায় মিয়ানমারের কয়েকজন অনুপ্রবেশকারী বলেছিলেন, মূলত হাটের দিন মিয়ানমার থেকে অনেক লোক বাংলাদেশে ঢোকে। তবে এলাকাবাসী জানান, প্রতিদিনই অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে। সীমান্ত এলাকায় কিছু সময় দাঁড়ালেই দু-একজন করে আসতে দেখা যায়।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু সীমান্তে যাওয়ার পথে বিজিবি সদস্যদের বেশ কয়েকটি দল আমাদের অটোরিকশা থামিয়ে গন্তব্য জানতে চায়। সহযাত্রী স্থানীয় এক বাসিন্দা আমাদের মেহমান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তারা ছেড়ে দেয়। কিছু দূর যাওয়ার পর মাঠ আর সীমানা খুঁটি দেখিয়ে সহযাত্রীদের একজন বলেন, 'ওই যে মিয়ানমার। দেখেন, মিয়ানমার থেকে কয়েকজন বাংলাদেশের ভেতর ঢুকছে।'
এ সময় এক বিজিবি সদস্যকে লাঠি হাতে ওদের না আসার ইশারা দিতে দেখা গেল। আরো কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর জীর্ণ-শীর্ণ এক শিশুকে কাঁদতে দেখে আমাদের এক সহযাত্রী জিজ্ঞেস করেন, তাকে কেউ মেরেছে কি না। শিশুটি জবাব না দিয়ে বাংলাদেশের আরো ভেতরে আসার রাস্তার দিকে তাকিয়ে কাঁদে। অটোরিকশাচালক বললেন, কতক্ষণ আর ঠেকাবে? খোলা সীমান্ত, একসময় না একসময় তো ঢুকবেই।
তমবু্র সীমান্তের কাছাকাছি যে জায়গায় অটোরিকশা থামল, তার একটি বাড়ির পুকুর পাড় থেকে স্পষ্ট দেখা গেল সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের লোকজনের আনাগোনা। ছোট এক পাহাড়ের ওপর নাসাকা বাহিনীর ক্যাম্পও চোখে পড়ল। সীমান্তকে পটভূমিতে রেখে নিজেদের কয়েকটি ছবি তোলার পর হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে বিজিবি সদস্য পরিচয় দিয়ে একজন জানতে চাইলেন এবং দেখলেন কী ছবি তুলেছি আমরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের একজন আবারও আমাদের 'অতিথি' হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বিজিবি সদস্যরা আর এগোতে বারণ করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, মিয়ানমার থেকে সহজেই বাংলাদেশে চলে আসা যায়, যত বিপত্তি মিয়ানমারে ঢোকার ক্ষেত্রে। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা যখন এ দেশে আসে, তখন সীমান্তের ওই পাড়ে তাঁদের বাধা দেওয়া হয় না বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন। বাধা দেওয়া হয় ফেরার সময়। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, চিকিৎসা, কাজের জন্য প্রতিদিনই মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে অনেকে আসে। আবার অনেকে আসে বিয়ে করে এ দেশের মাটিতে সংসার গড়ার লক্ষ্যে। কারণ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিয়ে করতে দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, ঘোলাপাড়া, নয়াপাড়া, জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, নাইটংপাড়া, জাদিমুরা, চৌধুরীপাড়া, লেদা খাল, আলী খাল, হ্নীলা, খারাংখালী, মৌলভীবাজার, উনছিপারাং, উলুবনিয়া, তুলাতুলি, উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া, রাহমতের বিল, বালুখালী, পার্বত্য নাইক্ষ্যংছড়ির জলপাইতলী, বাঁশবাগান, তমব্রু, বাইশপারী, ভাজাবনিয়া, আমতলী, রেজু, ওয়ালিডংসহ প্রায় পুরো সীমান্ত দিয়েই প্রতিদিন বিচ্ছিন্নভাবে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে। গত শুক্রবার আরাকানে দাঙ্গা শুরুর পর অনুপ্রবেশের হার ও আগ্রহ উভয়ই বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
টেকনাফের ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাহেদ হাসান বলেন, স্থানীয় লোকজন ও রোহিঙ্গাদের আচার-আচরণ, শারীরিক গঠনে সাদৃশ্য থাকায় বিজিবি অনেক ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পারে না। সস্তায় নানা কাজে ব্যবহারের জন্য স্থানীয় লোকজন, জনপ্রতিনিধিরাও রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। কর্নেল জাহেদ হাসান আরো বলেন, বিভিন্ন সময় আটক রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকাকে মাথাপিছু অর্থ দিয়ে তারা এ দেশে আসছে।
কক্সবাজারভিত্তিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক উখিয়া বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, শাহপরীর দ্বীপ থেকে উখিয়ার বালুখালি পর্যন্ত নাফ নদী এবং ঘুনধুম থেকে নাইক্ষ্যংছড়ির লেবুছড়ি পর্যন্ত সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। এসব অনুপ্রবেশের বেশির ভাগের কারণ অর্থনৈতিক।
কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার সেলিম মো. জাহাঙ্গীর বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি যথেষ্ট চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রয়োজনীয় সড়ক নির্মাণ করলে সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি অনুপ্রবেশও রোধ করা যাবে।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ফিরোজ সালাহ উদ্দিন বলেন, স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে। তাদের সঙ্গে মেয়ে-ছেলে বিয়ে দিয়ে, সস্তায় বিভিন্ন কাজে তাদের ব্যবহার করে, মসজিদ-মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে স্বল্প বেতনে নিয়োগ দেওয়াসহ মানব ও মাদকপাচারে স্থানীয় লোকজন রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করছে। তিনি মনে করেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং তাদের অবাধ যাতায়াত রোধ করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক বলেন, অনুপ্রবেশ সমস্যা অনেক দেশেই আছে। কিন্তু অনুপ্রবেশকারী বা শরণার্থীরা বাংলাদেশের মতো এত অবাধে চলাচল ও জীবনযাপনের সুযোগ পায় না। অনেক দেশেই অনুপ্রবেশকারীদের নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে আটকে রাখা হয়। ফলে তারা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ারই চেষ্টা করে একসময়।

No comments

Powered by Blogger.