টেকনাফ থেকে দুটি জাহাজ মিয়ানমারে পালাল গোপনে

কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরে আমদানি করা প্রায় ১৫ কোটি টাকার পণ্য নিয়ে দুটি জাহাজ মিয়ানমারে পালিয়ে গেছে। সোমবার রাতের কোনো এক সময় নাবিকরা পণ্যবাহী জাহাজ দুটি নিয়ে গোপনে টেকনাফ বন্দর ছেড়ে যান। টেকনাফের সাত ব্যবসায়ী মিয়ানমার থেকে ওই পণ্য আমদানি করেছিলেন।


আমদানিকারক নুরুল হাকিম কালের কণ্ঠকে জানান, মিয়ানমারের আকিয়াব থেকে গত ৭ জুন জাহাজ দুটিতে করে আচার, শুঁটকি ও ডালসহ অন্য পণ্যসামগ্রী আমদানি করা হয়। গত ৮ জুন থেকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে মুসলিম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গা ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইনদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে টেকনাফ স্থলবন্দর স্থবির হয়ে পড়ে। বন্দরের মালামাল ওঠানামাসহ পণ্য আমদানিও বন্ধ হয়ে যায়। বন্দরে নোঙর করা পণ্যবাহী জাহাজের সব ক্রু মিয়ানমারের বাসিন্দা এবং সবাই রাখাইন সম্প্রদায়ের হওয়ার কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। গত কদিনেও পণ্য খালাস না হওয়ায় তাঁরা রাতের আঁধারে বন্দর ছেড়ে চলে যান।
টেকনাফ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সমিতির সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক বাহাদুর জানান, আমদানিকারকরা বারবার বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা দেওয়ার দাবি জানালেও তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। এ কারণে মিয়ানমারের পণ্যবাহী জাহাজ দুটি নিয়ে ক্রুরা স্বদেশে ফিরে গেছেন। এ ঘটনার জন্য আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সমিতি বন্দর কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছে।
তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের জেনারেল ম্যানেজার আবদুল মোহাইমিন বলেন, 'আমরা শুধু বন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দিতে পারি। কিন্তু নাফ নদীতে নোঙর করা জাহাজের নিরাপত্তা দিতে পারব না।' তিনি স্বীকার করেন, মিয়ানমার থেকে আসা পণ্যবাহী জাহাজ গোপনে বন্দর ছেড়েছে নিরাপত্তার অভাবে।
টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম নাজিমুদ্দিন জানান, পণ্যবাহী জাহাজ দুটি ফিরিয়ে আনতে বিজিবি কর্মকর্তাদের নিয়ে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা কিছুতেই বিজিবির মোবাইল কল রিসিভ করছে না।
সীমান্তে অনুপ্রবেশ চেষ্টা অব্যাহত : গতকালও রোহিঙ্গারা নৌকা নিয়ে সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে। তাদের মূল টার্গেট এখন সেন্টমার্টিন দ্বীপ। গতকাল সকাল ১১টার দিকে মিয়ানমারের আকিয়াব থেকে আরো তিনটি নৌকা নিয়ে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গা সেন্টমার্টিন দ্বীপে আসার চেষ্টা করে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত এসআই জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'দ্বীপের পূর্ব দিকে নৌকা তিনটি দেখার পর কোস্টগার্ডের সদস্যসহ আমরা এগিয়ে যাই।' তিনি জানান, ওইসব রোহিঙ্গার দ্বীপে অনুপ্রবেশ ঠেকানো হয়েছে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপেও কয়েকটি নৌকায় করে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো হয়েছে। এ ছাড়া উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুম সীমান্ত দিয়ে গতকাল সকালে বেশ কিছু রোহিঙ্গা ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলেও বিজিবির সদস্যরা তা ভণ্ডুল করে দেন।
রাতের আঁধারে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ : সীমান্তে বিজিবির কড়া পাহারা সত্ত্বেও সোমবার দিবাগত রাতের আঁধারে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এবং নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্ত দিয়ে শত শত রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সীমান্তের এসব সূত্রগুলোর মতে, রোহিঙ্গারা সোমবার দিনব্যাপী চেষ্টার পর অনুপ্রবেশে ব্যর্থ হয়েও তারা পিছপা হয়নি। রাতের আঁধারে তারা আগে থেকে অবস্থানকারীদের সহযোগিতায় ঢুকতে সমর্থ হয়েছে। সোমবার গভীর রাতে শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণপাড়া ঘাট দিয়ে তিনটি নৌকায় পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। তবে কোস্টগার্ড ও বিজিবির সদস্যরা অপর একটি নৌকায় করে আসা নারী-শিশুদের হাতেনাতে আটক করে। তাদের পুশব্যাক করা হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমবুরু থেকে বাইশারী এলাকার পাহাড়ি ও গহিন অরণ্য এলাকা দিয়ে শত শত রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সেন্টমার্টিনে মাইকিং : অনুপ্রবেশের চেষ্টার মুখে মাইকিং করে দ্বীপবাসীকে সচেতন করা হচ্ছে, যাতে কোনোভাবেই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহযোগিতা দেওয়া না হয়। গতকাল দ্বীপের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মৌলভী নুরুল আমিন মাইকিং করে এ ব্যাপারে দ্বীপবাসীকে অধিকতর সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। দ্বীপের পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-ইন্সপেক্টর জাহাঙ্গীর আলম জানান, দ্বীপের বাসিন্দারা তেমন সচেতন নয়, তাই এ ব্যাপারে সচেতন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
কে এই পাকিস্তানি নাগরিক? : বাংলাদেশে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে বেশ কিছুকাল ধরে অবস্থানকারী একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। পাকিস্তানি এই নাগরিক ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে এ দেশে অবস্থান করলেও তাঁর বিরুদ্ধে নানা এনজিওর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা নিয়ে কথা উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সহিংস ঘটনার পরপরই তিনি আলোচনায় উঠে আসেন।
এই পাকিস্তানি নাগরিক একসময় জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশনে কর্মরত ছিলেন বলে লোকমুখে জানা যায়। সেখান থেকে চাকরি ছাড়ার পর তিনি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় প্রায়ই যাওয়া-আসা করেন বলে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সদস্য জানিয়েছেন। রোহিঙ্গা সমস্যা জিইয়ে রাখার ব্যাপারে এই পাকিস্তানি নাগরিকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, পাকিস্তানি একজন নাগরিককে নিয়ে নানা কথা উত্থাপিত হচ্ছে।

No comments

Powered by Blogger.