উন্নয়ন-দিনবদল বনাম দিনের ধারাবাহিকতা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বিগত জাতীয় নির্বাচনে দিনবদলের অঙ্গীকার করে আশাতীত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরে যে ভাগ্যবিতাড়িত জাতির ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনগোষ্ঠী, সামরিক শাসন এবং অতীব দুর্বল, রুগ্ণ গণতন্ত্রের সংস্কৃতি যাকে বিশ্বসভায়


এখনো মর্যাদার আসনে আসীন করতে পারেনি, তার কাছে ‘দিনবদলের সরকার’ হবে জনবান্ধব, যার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শাসক না হয়ে হবেন জনগণের সেবক, বৃহৎ জনসংখ্যা ও সীমিত সম্পদের চাহিদা এবং জোগানের যোজন যোজন পার্থক্যকে যে সরকার নীতি-কর্মসূচির মাধ্যমে হ্রাস করবে, উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ করবে।
গত ৪০ বছর অনুন্নয়নের দুষ্টচক্রে বাধাপ্রাপ্ত দেশটির দারিদ্র্যপীড়িত জনগণকে স্বপ্ন দেখাতে সফল হলেও দিনবদলের আশা মরীচিকার মতোই অধরা রয়ে গেছে। সাধারণ জনগণকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী সম্পদ ও ক্ষমতার পাহাড় গড়েছে। তাই জনগণ দিনবদলের সরকার বলতে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও জনগণের সম্পদ ও ক্ষমতার ব্যবধানের হ্রাসকে বোঝায়, ক্ষমতাসীনদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, উন্নয়ন অনুকূল সংস্কৃতিতে নেতৃত্বদান এবং শাসক নয়, জনগণের সেবক হিসেবে তাদের বহিঃপ্রকাশকে বোঝায়। ওয়াদা আর প্রতিশ্রুতিতে আমাদের কখনো কমতি ছিল না। দিনবদলের ঢাক যত জোরে বাজানো হচ্ছে, কর্মতৎপরতা একই সমতালে চলছে না। বেশির ভাগ সময়ই শাসকগোষ্ঠীর কার্যকলাপ বিগত দিনগুলোর আহূত ধারাবাহিকতা হিসেবেই প্রতিপন্ন হচ্ছে। এই দিনবদল ও দিনের ধারাবাহিকতা নিয়ে আজকের লেখা।
১.ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিনের গত সংস্করণে খবর ছিল, ভারতের সাংসদ ও মন্ত্রীদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাতে জনগণ বাহবা না দিয়ে তাঁদের পেছনে যে খরচ হচ্ছে সীমিত সম্পদের, দুর্বল মাথাপিছু আয়ের দেশকে কেন সেই বোঝা বইতে হবে, তা জোরালোভাবে প্রশ্ন করা হয়েছে। ভারতে যদি মন্ত্রী-সাংসদদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, বাংলাদেশে হতে পারবে না কেন?
২. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য কিন্তু বিনা করে সাংসদদের মূল্যবান গাড়ি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা গ্রহণযোগ্য নয়। এমন দ্বিমুখী আচরণ দিনবদলের সংস্কৃতি হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। সংসদ চলাকালীন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার গাড়ির ব্যবস্থা করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য নামীদামি গাড়ির করমুক্ত আমদানির উন্নয়ন প্রতিকূল সংস্কৃতি কখনোই দিনবদলের উদাহরণ হতে পারে না। জনগণের প্রতিনিধি যাঁরা দেশের অগ্রগতির জন্য আইন প্রণয়ন করবেন, তাঁদের জন্য করমুক্ত গাড়ি আর সাধারণ মানুষের জন্য মাত্রাতিরিক্ত করের গাড়ি অন্তত জনগণের সেবকদের সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
৩. সাংসদ আর মন্ত্রীদের আইনের ঊর্ধ্বে রেখে আইনের শাসন বলে চিৎকার করলে না আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, না সাধারণ জনগণ তা বিশ্বাস করবে। ভুল পার্কিংয়ের জন্য নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে জরিমানা কিংবা পেছনে সিটে বেল্ট না বেঁধে বসার জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে জরিমানা করা আইনের শাসনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের শাসকেরা যে অনেক বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, তাতে কারও সন্দেহ নেই। তাই আইনের শাসনের মাপকাঠি হবে শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কী হারে শাস্তি পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রেও দিনের ধারাবাহিকতাই বিদ্যমান, বদলের কোনো চিহ্ন নেই।
৪. সাংসদদের স্বাগত জানাতে পড়ালেখা বন্ধ করে অতিরিক্ত সূর্যতাপে পুড়ে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের অনির্দিষ্টকাল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটাও দিনবদলের উদাহরণ নয়। সাত-আট বছর বিরোধী দলের কর্মী হয়ে, চলমান কর্মকাণ্ডের অসহায় দর্শক হয়ে নির্বাচনে জিতে শতটি সোনার নৌকা উপহার, দারিদ্র্যপীড়িত দেশে হাওয়াইতে করে নির্বাচনী এলাকায় সংবর্ধনা গ্রহণ কিংবা শত শত গাড়ি, ট্রাক, মোটরসাইকেলের বহরে অসংখ্য তোরণ পার হয়ে সংবর্ধনা গ্রহণ—এর কোনোটিই দিনবদলের উদাহরণ নয়।
৫. ডজন-ডজন গাড়ি এবং অসংখ্য যাত্রী আটকে রেখে সাংসদের জন্য নয়, তাঁর গাড়ির জন্য ফেরি অপেক্ষা করানো, সিএনজি গ্রহণ থেকে শুরু করে সব কর্মকাণ্ডে শুধু সাংসদ ও মন্ত্রীরাই নন, তাঁদের নামে কমিশনারদের গাড়িচালকদের প্রবল প্রতাপে শাসিয়ে, ভয় দেখিয়ে সেবা গ্রহণ কখনোই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সহায়ক হবে না। বরং এগুলো আহূত দিনের ধারাবাহিকতাই শুধু প্রলম্বিত করবে।
৬. যোগ্যতাকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু দলের জি-হুজুর, তল্পিবাহকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগদান তাও কিন্তু আহূত দিনের ধারাবাহিকতারই বহিঃপ্রকাশ। দুর্বল অর্থনীতির মাত্রাতিরিক্ত সমস্যাজর্জরিত দেশে সৎ ও বিবেকবান মানুষেরা নেতৃত্বে না থাকলে দিনবদলের কোনো সম্ভাবনা নেই।
৭. বরাবরের মতো এবারও ক্ষমতাসীনদের তরুণ সংগঠন তাঁদের যোগ্য পূর্বসূরিদের মতোই টেন্ডারবাজি, বোমাবাজি ও সংঘর্ষে লিপ্ত। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, অশান্ত হয়ে উঠছে অনেক ক্যাম্পাস। এখানেও দিনবদলের লক্ষণ নেই। সাংসদ, মন্ত্রী তৈরিতে যাঁরা মাঠে অবদান রেখেছেন, প্রতিপক্ষ দলকে শক্তি দিয়ে ঘায়েল করেছেন, ক্ষমতাপ্রাপ্তদের ক্ষমতা ও সম্পদ বৃদ্ধির অন্তত কিছুটা তো তাঁদের দিতে হবে। তবে এই অবৈধ সুবিধাদান থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে সাংসদ ও মন্ত্রীদেরও বিশেষ সুবিধা নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
৮. সাধারণ মানুষের আয় করের আওতায়, কিন্তু তাদের প্রতিনিধিদের বেতন-ভাতাদি করের আওতামুক্ত—তাও দিনবদলের সংস্কৃতি হতে পারে না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে জনগণের প্রতিনিধিদের আয়কর দিতে হয়, দিনবদলের সরকারের জনপ্রতিনিধিদের কেন তা দিতে হবে না?
৯. সাংসদ কর্তৃক শিক্ষক, প্রকৌশলীসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষ প্রহূত হচ্ছে। এটি দিনবদলের সরকারের কাছে প্রত্যাশিত নয়। এবং আইন ভঙ্গকারী আইনপ্রণেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে সমাজে এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করা হবে দিনবদলের সংস্কৃতি।
১০. দীর্ঘ ৪০ বছর আমরা আমাদের মতো করে অগ্রগতি করার চেষ্টা করেছি, আমাদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছি, বহির্বিশ্বে নিজেদের জন্য অসম্মানের আসন তৈরি করেছি। এই চেষ্টার ধারাবাহিকতা আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা চাই কোরিয়ার মতো দিনবদলের সরকার, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের মতো দিনবদলের সরকার, সিঙ্গাপুরের লি কুয়ানের মতো দিনবদলের সরকার। আমাদের সরকার যেন কোনোমতে বিগত দিনের সরকারগুলোর মতো না হয়।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ফেলো বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

No comments

Powered by Blogger.