সামরিক শাসন-বন্দী বার্মার ডাক শুনুন by অমর্ত্য সেন

ব্রিটিশ অধীনতা থেকে স্বাধীনতার অল্পদিন পরে ক্ষণিকের গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতার পর থেকেই বার্মা ৫০ বছর ধরে এক চরম স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক শাসনে বন্দী। বার্মা এখন বিশ্বের দরিদ্রতম দেশ। এর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খুবই নড়বড়ে। ওষুধ মেলে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। কঠোর বিধিনিষেধের সঙ্গে রয়েছে প্রতিবাদীদের জন্য চরম শাস্তি।


শান, কারেন, চিন, রোহিঙ্গাসহ অন্য সংখ্যালঘুদের সঙ্গে নির্মম নিপীড়নমূলক আচরণ করা হয়। যাকে-তাকে ইচ্ছামতো বন্দী করা হয়, চলে ভয়াবহ নির্যাতন। রাষ্ট্র নিজেই উচ্ছেদ করে মানুষকে, চালায় সংগঠিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। এবং জনগণ যখন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তখন সরকার কেবল সাহায্যেই বিমুখ নয়, অন্যদের সাহায্যের হাতও ঠেকিয়ে দেয়। ২০০৮ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’-এর সময় এটাই হয়েছিল, আন্তর্জাতিক সাহায্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
সামরিক জান্তা দেশটির নাম বদলে মিয়ানমার রাখে। সত্যিই তো, শত শত বছর ধরে বার্মা নামে যে সুন্দর দেশটি বিকশিত হয়েছিল, সেই দেশটি আর কোথাও নেই। এই মিয়ানমার সেই বার্মার ধ্বংসের ওপর সৃষ্টি হয়েছে।
এই বিপদ এক দিনে ঘটেনি। কেবল বার্মার সরকার ও নাগরিকদের একটি অংশই নয়, বার্মার এই পতনে অবদান রেখেছে প্রতিবেশী দেশগুলো, এমনকি গোটা বিশ্ব। বার্মার সরকারের কথাই প্রথমে আসবে। দেশটির সামরিক শাসকেরা এমন এক ‘আমরা’, যাদের বিপরীতে ‘ওরা’ হচ্ছে তাঁদেরই জনগণ। যে দেশে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হয়, মুক্ত মত প্রকাশ যেখানে অসম্ভব, সেখানে এই দুইয়ের দূরত্ব কমানো কঠিন।
বার্মার শাসকদের কোনো অংশই এই বাধা দূর করতে ইচ্ছুক নন। কিন্তু বাইরে থেকেও তেমন চাপ আসছে না। বার্মার শক্তিশালী প্রতিবেশীরা, বিশেষ করে চীন, ভারত এবং থাইল্যান্ডও সামরিক জান্তাকে মদদ দিয়ে চলছে। জাতিসংঘের এখানে করণীয় ছিল। কিন্তু জাতিসংঘ দূতের মিনমিনে গলার প্রতিবাদ দিয়ে বার্মার সরকার নড়বে না। আসিয়ানের নেতারাও বার্মাকে চাপে ফেলেননি। কিন্তু বার্মার জনগণের এখন দরকার বাস্তব সহায়তা।
তা হলেও প্রমাণ আছে যে বার্মার সামরিক শাসকেরা বিশ্ব জনমতকে হিসেবে রাখেন। গতকালের (৭ নভেম্বর) নির্বাচন সেই উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়েছে। কেন তাঁদের একটি নির্বাচন প্রয়োজন? কারণ, তাঁরা এখন গণতান্ত্রিক লেবেল লাগিয়ে মানুষকে ধোঁকা দিতে চান। এটা এমন এক নির্বাচন, যেখানে শাসকেরা নিজেদের বিজয়ের সব বন্দোবস্ত করে রেখেছেন। নির্বাচন সেখানে আগেও হয়েছিল। ১৯৯০ সালের সেই নির্বাচনে অনেক বাধা সত্ত্বেও অং সান সু চির দল বিপুল বিজয় পায়। ৪৮৫ আসনের মধ্যে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি পায় ৩৯২টি আসন আর সরকারি দল পায় মাত্র ১০টি। কিন্তু নির্বাচনের ফল অস্বীকার করা হয় এবং তখন থেকেই সু চিসহ দেশটির অনেক নেতা এ অবধি বন্দী আছেন।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে শাসকেরা একটি শিক্ষা নেন। এবারের নির্বাচনের আগেই তাই শাসকেরা নিজেদের জন্য বেশ কিছু আসন সংরক্ষিত রাখেন, সত্যিকার বিরোধীদের নির্বাচনে দাঁড়ানোর পথ বন্ধ রাখেন, প্রকাশ্য আলোচনা নিষিদ্ধ করেন, বিরোধী নেতাদের প্রায় সবাইকে আটক করেন।
এমন অবস্থায় বিশ্ব কী করতে পারে? প্রথমতো, এই নির্বাচন যে একটা জোচ্চুরি, তা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া দরকার। কেউ যদি ভালো মনে ভেবে থাকেন যে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে, তবে তিনি বার্মার সত্যিকার বাস্তবতা জানেন না। নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রচারণা-যুদ্ধে শাসকদের জয়ী হওয়ার মানে বর্মি জনগণের দীর্ঘদিনের সংগ্রামকে হেয় করা।
আজ যদি ভাবা হয়, ‘নির্বাচনে কী হয় দেখা যাক’, তাহলে পরে এই ভাবনাও আসবে যে ‘আচ্ছা, তাদের আরেকটু সময় দেওয়া যাক।’ এর মানে হবে বর্মি জনগণের দুঃখ-কষ্টকে আরও দীর্ঘদিন ধরে চলতে দেওয়া। এ মুহূর্তেই উচিত, বার্মার পরিস্থিতি বিষয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করার ঘোষণা দেওয়া।
এ বিষয়ে বিশ্ব কি এককভাবে কিছু করতে পারে? এ বিষয়ে প্রথমেই আসবে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা জারির কথা। জানা কথা যে, যে অবরোধে জনগণের কষ্ট হবে তা নিয়ে শাসকেরা চিন্তিত নন। তাঁরা চিন্তিত হবেন তখনই যখন তাঁদের স্বার্থে আঘাত আসবে। তাই সর্বাত্মক অবরোধের চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে অবরোধ আরোপ করাই উত্তম।
কী হতে পারে সেই সুনির্দিষ্ট অবরোধের ক্ষেত্র? সবার আগে সামরিক জান্তাকে সব ধরনের অস্ত্র ও যুদ্ধ-সরঞ্জাম দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এর মধ্যে সরাসরি বা অপ্রত্যক্ষভাবে দেওয়া সামরিক সহযোগিতাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একইভাবে সেসব ব্যবসার ওপর আর্থিক বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে, যা থেকে বার্মার সামরিক নেতারা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন। অনেক কিছুর সঙ্গে তাঁরা জড়িত। এর মধ্যে আছে খনিজ রপ্তানি, হীরা-মানিক-তেল-গ্যাস ও কাঠ। এসব ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে, যাতে জনগণ সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বার্মার শাসনকাঠামোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিদেশ সফরেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। চিকিৎসার জন্যই হোক আর ব্যবসার খাতিরেই হোক, তাঁদের বিদেশে ঘোরাফেরা থেকে সামরিক শাসনই লাভবান হয়।
বার্মার সামরিক শাসন টিকে থাকায় কয়েকটি দেশেরও ভূমিকা আছে। চীনা সরকার দীর্ঘদিন ধরে বার্মার সঙ্গে ব্যবসা করছে এবং সে কারণে জান্তার পৃষ্ঠপোষকতা করছে। নিরাপত্তা পরিষদে চীনের ভেটোক্ষমতা থাকার সুবাদে বার্মার শাসকদের জন্য চীনই সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল।
চীনের পরে আছে বার্মার অন্য দুই প্রতিবেশী ভারত ও থাইল্যান্ড। দুটি দেশই বার্মার সঙ্গে ব্যাপক ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছে। ভারত তো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহ দমনে সরাসরি বার্মার সাহায্য পাচ্ছে। এসব কারণেই চীনের সঙ্গে সঙ্গে ভারত ও থাইল্যান্ড কেবল বার্মাকে সাহায্যই করছে না বরং সামরিক শাসন টিকিয়ে রাখায় কাজ করছে। একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আমার মন ভেঙে যায় দেখে যে আমার দেশের প্রধানমন্ত্রী, যিনি বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে মানবিক ও সহমর্মী রাজনৈতিক নেতা, তিনি নিজেও বার্মার কসাইদের দিল্লিতে অভ্যর্থনা জানান, তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান।
ভারতে বার্মার পরিস্থিতি কিংবা ভারত সরকারের বার্মা-নীতি কমই আলোচিত হয়। এমন নয় যে, তা সংবাদমাধ্যমে ছাপা হবে না বা কেউ করলে শাস্তি হবে; বরং উল্টোটা। আমি নিজে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এক সভায় সরকারের বার্মা-নীতির কঠোর সমালোচনা করেছি এবং তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। সমস্যা হলো, ভারতের সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থ-চিন্তা। ভারতে এখন এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে নেহরুর আমলের উদার সৎসাহসিকতাগুলো ভুলে যেতে চাওয়া হচ্ছে। অথচ বার্মায় সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর পর ভারতই সেখানকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অনেক সহায়তা করেছিল। অং সান সু চিও ভারতের বন্ধুত্ব ও সাহায্য পেয়েছিলেন। কিন্তু এখন ভারত চীনের অনুকরণে ক্ষুদ্র স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নেহরু যেসব চিন্তা লালন করতেন, আজ ভারতে তার জায়গা কম। ভারত নিজেকে সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা দিয়ে নতুন করে গড়ে নিচ্ছে।
এ বিষয়ে কোনো পরিবর্তন হতে হলে ভারতের অবস্থান বদলাতে হবে। এ বিষয়ে সেখানে জনস্বার্থের আলোচনা উঠতে হবে। বৈশ্বিক জনমত সৃষ্টিও বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। বার্মার পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধান ভারতে রাজনৈতিক আবহাওয়া বদলে দিতে পারে।
তিনটি চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ হচ্ছে—এক. বার্মা বিষয়ে ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডের অবস্থান দায়িত্বহীন ও ক্রুর। অন্যদিকে যে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো বার্মার সামরিক জান্তার কঠোর সমালোচনা করে, সাধ্য থাকা সত্ত্বেও তারা বার্মার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বদলাচ্ছে না। বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশসহ বাইরের কিছু দেশও বার্মার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্কে জড়িত, বিশেষত তেল ও গ্যাস উত্তোলন ক্ষেত্রে। তাই দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডা বার্মার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে রাজি হয় না। এভাবে তারা তাদের নীতি না পাল্টালে বার্মার প্রতিবেশীদের জন্যও কঠিন হয়ে পড়ে অবস্থান বদলানো।
দ্বিতীয়ত, কোনো দেশের তথাকথিত জাতীয় স্বার্থ কেবল বর্তমানের জন্যই নয়, ভবিষ্যতের নিরিখেও সমস্যাজনক হতে পারে। চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের বেলায় এ কথাগুলো খাটে। বিশ্বের জুলুমবাজ শাসনের ইতিহাস শিক্ষা দেয়, একটা সময় বার্মার স্বৈরশাসকেরা আর থাকবেন না। কিন্তু কয়েকটি দেশের বিশ্বাসঘাতকতার স্মৃতি বার্মার জনগণের মনে আরও অনেক দিন রয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, বিশ্বের অনেক মানুষের মনেই বার্মা বিষয়ে একটা হাল ছেড়ে দেওয়া মনোভাব দানা বেঁধেছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, যৌক্তিক গণমতামতের বিস্তার আর সংঘবদ্ধ বৈশ্বিক পদক্ষেপের মাধ্যমে অচিরেই বর্তমানের থেকে অনেক বেশি কিছু অর্জন করা সম্ভব।
১৯৯৯ সালের মার্চের শেষের দিকে আমি ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে পড়াতাম। তখন এক সকালে আমার কাছে একটি ফোন আসে। ফোনটি করেন আমার পুরোনো বন্ধু মাইকেল হ্যারিস, অং সান সু চির স্বামী। আমি জানতাম, হ্যারিস তখন প্রস্ট্রেট ক্যানসারে চরমভাবে ভুগছেন। মাইকেল সেদিন আমাকে বলেছিলেন যে তাঁর জীবনের একটা লক্ষ্য হলো সু চিকে সাহায্য করে যাওয়া। অসুস্থতা সত্ত্বেও তাঁর কণ্ঠে সেই সংকল্প ফুটে উঠছিল। সেই কণ্ঠেই তিনি আমাকে বোঝাতে লাগলেন, কেন আমাদের সবার নজর এখন বার্মার সামরিক জান্তাকে মোকাবিলা করার দিকে ফেলা দরকার। ‘অমর্ত্য, কোনো ভুল করা যাবে না’ মাইকেল বলেন আমাকে, ‘এই রোগ আমাকে মারতে পারবে না। আমার কাজে নামার জন্যই আমার সুস্থ হওয়া দরকার। আমার সু চি এবং আমার বার্মার পাশে আমাকে দাঁড়াতেই হবে।’ সেটা ছিল সম্ভবত ২৪ মার্চ। ২৭ মার্চ খবর পেলাম, মাইকেল মারা গিয়েছেন। ওই তারিখই ছিল তাঁর জন্মদিন।
মাইকেল হ্যারিস আর আমাদের এসে বলবেন না, কোথায় আমাদের নজর দেওয়া দরকার। কী আমাদের করা দরকার। কিন্তু তাঁর বিদায়বার্তাটি এখনো সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সম্মিলিত পদক্ষেপের এমন প্রয়োজন অতীতে আর আসেনি। বার্মার দানবীয় শাসকেরা এখনো দেশটাকে নরক বানিয়ে রেখেছেন। এ মুহূর্তে ভুয়া নির্বাচনের প্রহসনে ভুললে চলবে না। এ মুহূর্তে বার্মার জনগণের পাশে দাঁড়ানোর উপায় হাতড়ানোরও আর সময় নেই। যা করার, এখনই করতে হবে। আর করতে হবে স্পষ্টভাবে, যুক্তির ভিত্তিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বার্মা বিষয়ে দেওয়া বক্তৃতা।
ভারতের দি আউটলুক থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ
অমর্ত্য সেন: নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ ও লেখক।

No comments

Powered by Blogger.