শ্রদ্ধাঞ্জলি-কলিম শরাফী: এক কিংবদন্তি by আসমা আব্বাসী

মেঘের পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে\
কাজের দিনে নানা কাজে থাকি নানা লোকের মাঝে,
আজ আমি যে বসে আছি তোমারি আশ্বাসে\


নীলফামারীর ঢেউ খেলানো ধানের সোনালি বিস্তার, সবুজ কলাগাছের বাউরি বাতাস ও হলুদ চারার সবুজের মায়াময় পথ দিয়ে ঢাকায় ফিরে আসতে আসতে আব্বাসী সাহেব বললেন, ‘আমার মনটা কেমন যেন করছে, চলো কালই আমরা কলিম শরাফীর বাড়ি যাই। তারপর একদিন আশরাফ সিদ্দিকী ও মেহের কবীরকেও দেখে আসব। এঁদের তিনজনই আজকাল বাইরে বেরুন না, বয়সের কারণে। চলো, আমরা দেখা করে দোয়া নিয়ে আসি।’ ভাবতে ভালো লাগছিল আমার সদাহাস্য কলিম ভাই ও নাওশাবা ভাবির বাড়ি যাব একগুচ্ছ রজনীগন্ধা নিয়ে।
কত যুগ আগের কথা। মেজো দুলাভাই আবদুল কাদিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে কলিম ভাইয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গতার সোপান বেয়ে উঠেছিলাম। মেজো বোন সালমার রথখোলার বাড়ির সরু সিঁড়ি দিয়ে সন্ধেবেলা দোতলায় উঠতে শোনা যেত দরাজ কণ্ঠের বিস্তৃতি:
‘বঁধু, তোমায় করব রাজা তরুতলে,
বনফুলের বিনোদমালা দেব গলে\
সিংহাসনে বসাইতে হূদয়খানি দেব পেতে,
অভিষেক করব তোমায় আঁখিজলে\
একছুটে ঘরে ঢুকে মাটিতে পাতা শতরঞ্জিতে আসন নিয়ে ফরমাশ করতাম একটার পর একটা গান। পুরো গীতবিতানই যেন খোলা তাঁর মুদ্রিত নয়নের সামনে।
বুবু আসতেন সোনালি বর্ডার দেওয়া সাদা কাপে ধূমায়িত চা, ঢাকাই বাখরখানি ও অষ্টগ্রামের পনির নিয়ে, কখনো বা মরণচাঁদের গরম গরম শিঙাড়া ও লালমোহন। পানদানিতে পান, চুন, খয়ের, জর্দা।
আড্ডা চলছে জোর কদমে। কলিম শরাফী, কামরুল হাসান, সুলেমান ভাইসহ চারজনে বেজায় দোস্তি, যেন জানে জিগর। আমার কাছে তিনি ভাই, আব্বাসী সাহেব ডাকেন চাচা সম্বোধনে।
আসলেও অগ্রজের স্নেহ নিয়েই বিনি সুতোয় অন্তরে বেঁধে নিলেন তিনি ও আমার মায়াবতী ভাবি নাওশাবা। নাকে হীরের নাকফুলটি জ্বলজ্বল করত, সে হাসিরই বিচ্ছুরণ ভাবির মায়াবী হাসিতে। নানা অনুষ্ঠানে তাঁদের পেয়েছি। সব সময়ই একসঙ্গে, যেন যুগলবন্দী। যত দূরেই বসি না, সম্মোহিতের মতো ছুটে যেতাম তাঁদের পাশে।
কলিম ভাইয়ের কথা বলি। ১৯২৪ সালের ৮ মে বীরভূমের খয়েরাডি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হয় তাঁর। মা আলিয়া বেগমের কোলে হাসছে তাঁর নয়নের ধন, বাবা সামিহ আহমেদ ছুটে গেছেন বাজারে আকিকার জন্য দুটো তরতাজা খাসি কিনে আনতে। শিশুটি কাঁদলে বাজত সুরেলা বাঁশি। কলিম ভাই যখন ছাত্র, বন্ধুদের শোনাতেন গান। তাঁরা মন্ত্রমুগ্ধ। ভাবতেন, এ হবে বিশ্বজয়ী শিল্পী। রবীন্দ্রসংগীতে তাঁর তুলনা মেলা ভার, যেন নদীর পানির মতো অবারিত তাঁর ছুটে চলা, নীলাকাশে সাদা বিহঙ্গের পাখা মেলা, ভোরের শিশিরে শিউলির আলপনা। কণ্ঠটি তাঁর দরাজ, ভরাট, গম্ভীর, মধুর ও প্রাণকাড়া। আমি ও আব্বাসী সাহেব কলিম ভাইয়ের গানের টানে ছুটে ছুটে যেতাম সেসব বাড়িতে বা অনুষ্ঠানে, যেখানে গেলে পাওয়া যাবে এই দুর্লভ সোনা। মন ভরে যেত, প্রাণ জুড়িয়ে যেত, বিধাতার কী অকৃপণ দান এই অনির্বচনীয় কণ্ঠ!
আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ, যেন ঘরের মানুষ। ঠাট্টা করতেন, গল্প করতেন, কন্যা সামিরাকে কোলে তুলে নিতেন। শারমিনীকে জন্মের পর ফোন করে দোয়া জানালেন। কলিম ভাই, আমাকে দেখলেই সিলেটি ভাষায় কথা বলা শুরু করতেন, যেন সিলেট তাঁর মাতৃভূমি। উর্দুতে দখল, বাংলাতে অনন্য, বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাও তাঁর আয়ত্তে। মনে করতে পারি, যখন তিনি রেডিওতে গান করতেন, আমরা রেডিওর সামনে থেকে নড়তে পারতাম না। এ যে মনের মুক্তি, হূদয়ের খাদ্য, এ যে সঞ্জীবনী সুধা।
কলিম শরাফী নাম নয়, প্রতিষ্ঠান। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ব্যক্তিগত জীবনে বা কর্মক্ষেত্রে যে অবিচার, তাঁর কথায় ক্ষোভ প্রকাশ পায়নি। তাঁর সহনশীলতা ও ঔদার্যই সোনালি বিভায় প্রকাশিত। সৌজন্য ও ভদ্রতা তাঁর স্বভাবে। যিনি কাছে যাচ্ছেন তিনি বুঝতে পারবেন এই মিষ্টি-মধুর ব্যবহারের বিভাস। বোঝার উপায় নেই ইনিই সংগীত ভুবনের মহান সম্রাট।
ঢাকা লেডিস ক্লাবের পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে প্রতিবছরই আসতেন তাঁরা। সামনের সারিতে আজিজুস সামাদ, ফওজিয়া সামাদের পাশে উপবিষ্ট তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু কলিম ভাই ও ভাবি। মঞ্চ থেকে তাঁর সস্নেহ দৃষ্টি দেখে বুঝতাম, তিনি খুশি হয়েছেন। একবার আমাদের ক্লাবের একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে হঠাৎ করেই ডাক দিলাম ভাইকে, ‘লক্ষ্মী ভাইটি, আসুন আমাদের মঞ্চে। বাংলার রমণীকুল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আপনার দুটো গানের জন্য। তাঁদের আপনি বঞ্চিত করবেন কীভাবে?’ কলিম ভাই প্রথমে একটু ইতস্তত করলেন, তারপর তাঁর স্বভাবজাত মিষ্টি হাসি দিয়ে এগিয়ে এলেন ফুলে ফুলে সুশোভিত স্টেজে। হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল ছোঁয়াতেই হলভর্তি সানন্দ করতালি। দুটো নয়, পর পর চারটে গান গাইলেন, আমাকে ছোট বোনের আদর দিয়ে যেকোনো আবদারের সাহস দিয়েছেন তিনিই।
এমন গলা তো দ্বিতীয়টি আর নেই। যেমন ভরাট তেমনি গাম্ভীর্য, তেমনি মাধুর্য। মনে হলো ঝরনার পানির মতোই স্বতঃস্ফূর্ততায় বয়ে চলেছে, সরোবরের গভীরে ডুব দিয়ে কুড়িয়ে নিলাম সজীব মুক্তো।
২ নভেম্বর ২০১০, বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে কলিম ভাই চিরতরে বিদায় নিলেন চিরশান্তির দেশে, তাঁর প্রাণাধিক প্রেয়সীর কোলে মাথা রেখে। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে আছেন। বড় আরামের সেই ঘুম। যেন বেহেশত থেকে পারিজাতরা ডাকছে।
কিন্তু আমার যে বড্ড নিঃস্ব মনে হচ্ছে নিজেকে। শত ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেল, একটিবার তাঁর বাড়ি গিয়ে বসব একগুচ্ছ সুরভিত রজনীগন্ধা নিয়ে। বেদনার মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে দুই নয়ন থেকে, সাদা কাপড়ে আবৃত ভাই, সাদাকালো শাড়ি পরা ভাবি—সবই যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সত্যিই কি তিনি বলছেন,
মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।
মোনাজাত করলাম আল্লাহর কাছে, তুমি আমার কলিম ভাইকে রেখো চিরতরে আনন্দিত উজ্জ্বল শান্ত সমাহিত। তিনি তোমারই গান গেয়েছেন, তোমাকেই স্মরণ করেছেন, লাখ লাখ মানুষের হূদয়ে এনেছেন প্রশান্তি। এর সবই তোমার জানা। যা আমরা জানি না তুমি তা জানো, হে প্রভু।
আসমা আব্বাসী: কবি, লেখক, অধ্যাপিকা।
mabbasi@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.