শ্রদ্ধাঞ্জলি-‘এত ভালোবাসা আমায় দিস নে’ by তপন মাহমুদ

মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি তাঁকে চিনত শিল্পী, সংগঠক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। কিন্তু ছোট-বড়, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন সূর্যস্নান ছবির গান ‘পথে পথে ছিলাম ছড়াইয়া’র গায়ক। এর মাধ্যমে সব শ্রেণীর মাঝে তিনি নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।


তিনি মূলত গণসংগীতের শিল্পী ছিলেন এবং শেষে নিজেকে সঁপেছেন রবীন্দ্রসংগীতে। হ্যাঁ, বাংলাদেশে রবীন্দ্রসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী কলিম শরাফীর কথাই বলছি।
সাতচল্লিশের আগে রবীন্দ্রসংগীতে তাঁর হাতেখড়ি কলকাতায় বিখ্যাত সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘দক্ষিণী’তে শুভ গুহঠাকুরতার কাছে। কলিম শরাফীর জন্ম পীর বংশে হলেও তৎকালীন বাঙালি সমাজে যে অসাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণা ছিল, তা-ই তাঁর অসাম্প্রদায়িক মনন তৈরিতে সহায়ক হয়েছিল। কৈশোরোত্তীর্ণ কালে কলিম শরাফী নিজেকে বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। তিনি একটি সুন্দর সমাজের স্বপ্ন লালন করতেন, চাইতেন সমাজে সবাই সুন্দর থাক, সুখে থাক।
কলিম শরাফী বলতেন, ‘জীবনের অর্থ শুধু এই না—টাকা-পয়সা রোজগার করলাম, বাড়ি-গাড়ি করলাম, খেলাম, মরে গেলাম। দেশের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করে পরপারের ডাকে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারলেই শান্তি।’
মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকে তিনি আজীবন নিজেকে বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রাখেন। এসবের মধ্যে অন্যতম ১৯৪২ সালের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। এতে সম্পৃক্ত থাকার কারণে কারাবরণ করেন তিনি। ১৯৪৩ সালে বেঙ্গল কালচারাল স্কোয়াডের সঙ্গে যুক্ত থেকে শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বিখ্যাত শিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ান। ১৯৪৪ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন এই শিল্পী। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান নাট্যসংগঠনগুলোর অন্যতম ‘বহুরূপী’র তিনি একজন প্রতিষ্ঠাতা।
১৯৫০-এ কলিম শরাফী ঢাকায় আসেন। কিন্তু পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার কুনজরে পড়ায় তাঁকে চট্টগ্রামে চলে যেতে হয়, এবং সেখানে গড়ে তোলেন নবনাট্য আন্দোলন সংস্থা ‘প্রান্তিক’। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর রেডিওতে তাঁর গান প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তান টেলিভিশনে ঢাকা কেন্দ্রের প্রথম অনুষ্ঠান পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন। কর্তৃপক্ষের একগুঁয়েমির কারণে ১৯৬৭ সালে পদত্যাগ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি ব্রিটিশ রেকর্ডিং কোম্পানির ঢাকা শাখার জেনারেল ম্যানেজার নিযুক্ত হন। তিনি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকা থেকে লন্ডনে গিয়ে সেখানে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সংগীত শিক্ষালয় ‘সংগীত ভবন’।
১৯৮৮ সালে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থা’। আমৃত্যু তিনি এ সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সৌভাগ্য হয়। বয়সে অনেক বড় হলেও আমাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। ফলে দীর্ঘ ২২ বছরের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে এক দিনের জন্যও তাঁর সঙ্গে আমার কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়নি। এটা সম্ভব হয়েছে কেবল তাঁর অসাধারণ মানবিক গুণ ও মহত্ত্বের কারণে।
প্রসঙ্গক্রমে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। সংস্থার একটি অনুষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের বেশ আগে তিনি অনুষ্ঠানস্থলে এসে সংগঠনের কাউকে পাননি। এটা ছিল তাঁর জন্য অপ্রত্যাশিত। ফলে অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই অভিমানের বশে তিনি বাসায় চলে যান। তাঁর মনোভাব আন্দাজ করতে পেরে অনুষ্ঠান শেষে আমি তাঁর বাসায় গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, ‘কার সঙ্গে অভিমান করে আপনি চলে এলেন? অনুষ্ঠানটা তো আপনারই ছিল।’
সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বীকার করলেন, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে।’
এমনি প্রাণখোলা ও আত্মভোলা মানুষ ছিলেন কলিম শরাফী। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন খুবই আবেগপ্রবণ। মনে আছে, ১৯৯৯ সালে তাঁর ৭৫তম জন্মবার্ষিকী জাতীয় জাদুঘর ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থার পক্ষ থেকে যৌথভাবে উদ্যাপন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে তাঁকে ব্যাপক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনা শেষে সংগীতানুষ্ঠান চলার সময় মঞ্চের পেছনে কলিম ভাইকে আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদতে দেখে আমি জড়িয়ে ধরি। এ সময় তিনি বলেছিলেন, ‘এত ভালোবাসা আমাকে তোরা দিস নে, আমি সইতে পারব না।’ আজ বারবার কানে তাঁর সেই কথাটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রবীন্দ্রসংগীতের জন্য, এ দেশের মানুষের জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়।
শিল্পীদের কল্যাণার্থে কলিম শরাফী সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন। সে কারণে মান-সম্মানের পরোয়া না করে তিনি কারও দ্বারস্থ হতে দ্বিধা করতেন না। তবে নিজের জন্য কারও কাছে কখনো কিছু চাননি।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর ছিল অন্য রকম অনুরাগ। তিনি বলতেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে তো কোনো কিছু ভালোভাবে চিন্তা করা যায় না। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, এ যুগে ভালো কিছু করতে গেলেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আসতে হবে। ওঁর গান আমার কেন এত ভালো লাগে? রবীন্দ্রনাথের গানে এমন একটা জীবনদর্শন আছে, যেটা যেকোনো সভ্য মানুষ অনায়াসে গ্রহণ করতে পারে। যত আধুনিক গান শুনেছি, এত যুক্তিবদ্ধ কথাবার্তা আর নেই। প্রেম বলো, পূজা বলো, স্বদেশ বলো—কোথাও অযৌক্তিক কিছু নেই—“তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই”—এ গান নাস্তিককেও নাড়া দেবে।’ রবীন্দ্রনাথের প্রতি কলিম শরাফীর এই অনুরাগই তাঁকে বাংলাদেশের রবীন্দ্রসংগীতের কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল।
 তপন মাহমুদ: রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী।

No comments

Powered by Blogger.