সময় বয়ে যায় by শেখ হাফিজুর রহমান সজল

মহাজোট সরকারের দুই বছর পূর্তিতে সরকারের সাফল্যের কথা হচ্ছে সর্বত্র। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিগুলোও সাফল্য বলে প্রচার করা হচ্ছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খুবই ভাগ্যবান। কারণ তাঁর সামনে অনেক উদাহরণ আছে, যাতে তিনি সতর্ক হতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সামনে তেমন কোনো উদাহরণই ছিল না।


মমতা এত অল্প আসন নিয়ে বাম ফ্রন্ট সরকারকে এমন নাজুক অবস্থায় ফেলবেন, তা তিনি ভাবতে পারেননি। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী ও প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পরাজয়ও শেখ হাসিনার জন্য একটি সংকেত। তার ওপর যোগ হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে মহাজোটের বিপর্যয়। মহাজোটের বিশাল জয়ের পর জনগণের প্রত্যাশাও বেড়ে গেছে বহুগুণ। আর এ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে বর্তমান সরকারের ভাগ্যেও বিপর্যয় সুনিশ্চিত। জনপ্রত্যাশা পূরণে দুই বছর কম সময় নয় বা আগামী তিন বছরও কম নয়। তবে এ সময়ের মধ্যে জনপ্রত্যাশা বুঝে অগ্রাধিকারমূলক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া তেমন কোনো প্রাপ্তি নেই। জ্বালানি উপদেষ্টা জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ ছাড়া কিছু দিতে পারেননি। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তরই হচ্ছে, কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে না। উপরন্তু গ্যাস ও কয়লার ব্যাপারে সরকার গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধান দিতে পারেনি। অন্যদিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা বক্তৃতাতেই সীমাবদ্ধ। তা ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুচালিত বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করা উচিত। এদিকে সরকারের প্রথম দিকে দ্রব্যমূল্য কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্তমানে তা অসহনীয় পর্যায়ে পেঁৗছেছে। বিগত সরকারের আমলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো হয়েছিল ধারণা করা হতো। এখন কেন দাম বাড়ছে? টিসিবিকে কার্যকর করে নিত্যপণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও কার্যকর করার ব্যাপারে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজারব্যবস্থা তত্ত্বাবধান করার জন্য একটি স্থায়ী এবং চৌকস পেশাদারি টিম দরকার, যার সদস্য পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। তা ছাড়া বাজার তত্ত্বাবধানের জন্য বাস্তবমুখী গবেষণার ব্যবস্থা রাখা উচিত। শুধু ওএমএস, ভিজিএফ বা দুস্থদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বিতরণ করলেই এর স্থায়ী সমাধান হবে না; পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার স্থাপন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ, সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করার মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ঢাকার সড়কপথের যানজট দূর করা কঠিন বলে আকাশপথের যোগাযোগকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। তাই প্রস্তাবিত এলিভেটেড এঙ্প্রেসওয়ে ও মেট্রো রেল স্থাপন করে দ্রুত যানজট নিরসন করা উচিত। আমাদের দেশের সরকার তার মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ করে বাহবা নিতে চায়_এমন ধারণাও অমূলক নয়। তা ছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিতে কিছুটা স্থবিরতার জন্য দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের অবস্থা এখন বেশ নাজুক। মহাজোটের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, প্রতিটি বাড়ি থেকে কর্মক্ষম বেকারদের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। তা ছাড়া দেশের বিশাল যুবশক্তিকে বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী বহুমুখী প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে প্রেরণ করে বেকার সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। এ ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়াতে পর্যটন শিল্পের বিকাশ, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, রেমিট্যান্সকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এবং ইংরেজি ভাষা শিক্ষাদানে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এদিকে দুর্নীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বর্তমান সরকারের আমলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন ও সর্বস্তরে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ হতাশাব্যঞ্জক। উপরন্তু আইন করে দুদককে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। পুঁজিবাজার আওয়ামী লীগের জন্য একটি আতঙ্ক। ১৯৯৬ সালের শেয়ার বিপর্যয়ের খেসারত আওয়ামী লীগকে দিতে হয়েছে। শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করার পদক্ষেপগুলো অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে আলোর মুখ দেখছে না। তা ছাড়া ১৯৯৬ সালের খলনায়করা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এ অভিযোগ যথেষ্ট পুষ্ট। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের প্রথম দিকে ভালো থাকলেও বর্তমানে খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, গুম ইত্যাদি বেড়েই চলছে। তা ছাড়া কিছু চিহ্নিত অপরাধীর মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। বহুল প্রত্যাশিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে কম কঠিন নয়। তাই সরকারের কাজে সুষ্ঠু সমন্বয় এবং দেশের সিনিয়র আইনজীবীদের যুক্ত করা উচিত। এদিকে কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট অপরাধ যথা_পর্নোগ্রাফি, হ্যাকিং ও অন্যান্য সাইবার অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। তাই এ অপরাধ রোধে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সামাজিকভাবে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। নইলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের প্রধান সমস্যা হবে এই সাইবার অপরাধ। এদিকে নদী ও খাল দখলমুক্ত করে ড্রেজিং করা এবং ঢাকা রক্ষা প্রকল্প ড্যাপ বাস্তবায়নে কোনো বলিষ্ঠ উদ্যোগ নেই। তা ছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলায় আশানুরূপ কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ফলে হতাহতের সংখ্যা শুধু বাড়ছে। তাই আধুনিক উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতি আমদানি করে দুর্যোগ রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। মহাজোট দিনবদলের কথা বললেও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। সাংগঠনিক দুর্বলতা, প্রবীণ নেতাদের নিষ্ক্রিয় ভাব, নবীন নেতাদের লাগামহীন বক্তব্য ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ইত্যাদি কারণে আওয়ামী লীগের রাজনীতি সমস্যাগ্রস্ত রয়েছে। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কিছু উপদেষ্টার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞজনরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর সহকর্মীদের কথা কম বলে কাজে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তো থামানোই যাচ্ছে না। এর খেসারত তো চট্টগ্রাম সিটি ও সাম্প্রতিক পৌর এবং উপনির্বাচনে দিতে হয়েছে। তার ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সোনার ছেলেরা তো আছেই। এসব ব্যাপারে নতুন কমিটির সম্পাদকরা কোনো সাফল্যই দেখাতে পারেননি। তাই প্রবীণ নেতাদের অভাব স্পষ্টই পরিলক্ষিত হচ্ছে। অপরদিকে বিরোধী দলকে মোকাবিলার জন্য ১৪৪ ধারাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে অন্য পথ খুঁজতে হবে। এখানো সব সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীকেই দিতে হয়। মনে রাখা দরকার, একা সবদিক সামলাতে গেলে ভুলের আশঙ্কা বেশি থাকে। আমলা ও গোয়েন্দা-নির্ভরতা কমিয়ে রাজনৈতিকভাবে সমাধান খুঁজতে হবে এবং পরীক্ষিতদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান সরকার গত দুই বছরে বেশ কিছু ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে, যা পূর্ববর্তী কোনো সরকার চিন্তাও করেনি। তবে দুই বছরে আরো বেশি কিছু কাজ করা যেত। বেশ কয়েকজন অদক্ষ মন্ত্রী ও সাংগঠনিক দুর্বলতার জন্য দুই বছরে মহাজোট সরকার জনপ্রত্যাশা পূরণে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। তবে এবারের শেখ হাসিনা গত আমলের চেয়ে বেশ পরিপক্ব, বলিষ্ঠ, উদ্যমী ও সতর্ক। আগামী দিনগুলোতে শেখ হাসিনা বর্ণচোরা নেতা, আমলা এবং অন্যদের কিভাবে মোকাবিলা করেন, এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা চাটুকাররা সঠিক তথ্য প্রধানমন্ত্রীকে না দিয়ে বিভ্রান্ত করে থাকে। সাধারণ জনগণ সস্তায় দুবেলা খেতে চায় এবং দৃশ্যমান উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ক্ষমতায় থাকলে বেশি আত্মবিশ্বাসী হওয়ার প্রবণতা সরকারপ্রধানদের মধ্যে দেখা যায় এবং এর খেসারতও দিয়েছে বিগত সরকারগুলো। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
লেখক : প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ,
ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়
sajall13@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.